logo
  • শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

  রেজাউল করিম খোকন   ১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য হতে পারে ওষুধ

দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তজাির্তক মানের ওষুধ তৈরি করছে। নতুন নতুন কোম্পানির ওষুধ প্রস্তুতকারী হিসেবে আসার পথও তৈরি হয়েছে। উন্নত বিশে^র দেশগুলোর সাটিির্ফকেশন সনদও পেয়েছে প্রায় ১২টি কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ আরও দেশে ওষুধ রপ্তানি পযার্য়ক্রমে বাড়ছে।

ওষুধ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দিন দিন আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। স্বাধীনতার পর যেখানে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি হতো এখন সেখানে দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে বিশে^র ১২৭টি দেশে বাংলাদেশে প্রস্তুত ওধুষ রপ্তানি হচ্ছে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই বতর্মানে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে এদেশের ওষুধের। আর দেশের বাইরে রপ্তানি করে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৯.০০ কোটি টাকা। রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হারও ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ওষুধ রপ্তানি খাতটিকে ইতিমধ্যে দারুণ সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছেও। এক সময়ে এদেশের মানুষ বিদেশি আমদানিকৃত ওষুধের ওপর প্রচÐভাবে নিভর্রশীল ছিল। এ দেশে তখন তেমন ভালো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তখনও ভাবা যায়নি আমদানিমুখী ওষুধ খাত রপ্তানি বাজারে শক্ত অবস্থান দখল করে নিতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ থেকে এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। প্রতি বছরই বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ বাড়ছে আশাব্যঞ্জকভাবে। প্রতি বছর ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন নতুন দেশ যোগ হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ আমদানিকারক দেশের তালিকায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু জাপানসহ উন্নত বিশে^র শতাধিক দেশে যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রস্তুত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। গত বছরে বাংলাদেশের ওষুধের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণে পেঁৗছেছে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী দেশের দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠান ওষুধ উৎপাদন করছে। এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। যার মধ্যে বড় ১০টি কোম্পানি দেশের চাহিদা ৮০ শতাংশ মিটিয়ে থাকে। বতর্মানে মাকির্ন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জামাির্ন, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, ইতালি, কানাডা, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, মরক্কো, আলজেরিয়াসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা যায়, চলতি-২০১৬-১৭ অথর্বছরে প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মাচর্) দেশের ৬ কোটি ৯৬ লাখ ডলারের ওষুধ রপ্তানি হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। দেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা। গত অথর্বছরের একই সময়ের চেয়ে এ আয় সাড়ে ৯ শতাংশ বেশি। ওই সময়ে (২০১৫-১৬ অথর্বছরের জুলাই-মাচর্ মাসে) আয় ছিল ৬ কোটি ১৬ লাখ ডলার। গত বছর পুরো সময়ে আয় হয়েছে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলার বা ৬৫০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন গত অথর্বছরে (২০১৫-১৬) বাংলাদেশ থেকে ৫৪টি কোম্পানির ওষুধ বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। দেশের উন্নতমানের ৫৪টির বেশি কোম্পানি ৩০৩টি গ্রæপের ওষুধ রপ্তানি করে।

পৃথিবীর অনেক দেশের ওষুধের চেয়ে বাংলাদেশের ওষুধের মান অনেক ভালো। পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এমনকি ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ওষুধের মান ভালো। মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর আমাদের চেয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নত দেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও তাদের বিদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করতে হয়। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয় তাদের। আমাদের অথর্নীতি দিনে দিনে ঊধ্বর্মুখী হচ্ছে। এখন আমাদের প্রায় শতকরা সাতানব্বই ভাগ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের এখন আর ওষুধ আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান আইএমসি ফামাির্সউটিক্যাল সেক্টর নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা বিশ^ব্যাপী। আই এমসির গত বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ফামাির্সউটিক্যাল সেক্টরে অথার্ৎ ওষুধ শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শতকরা বত্রিশ ভাগ। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এটি সম্ভব হয়েছে।

২০১৬-১৭ অথর্ বছরে বিদেশে ওষুধ রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ডলার। বতর্মানে দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধের কঁাচামাল পৃথিবীর ১২৭ টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ ও দেশের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে ওষুধ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে বিশ^ব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, স্কয়ার, ইনসেপ্টা, এক্মি, এসিআই, রেনেটা প্রভৃতি। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে আরও দেখা যায়, গত ৫ বছরে ওষুধের রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণে পেঁৗছেছে। ২০১১-১২ অথর্বছরে ওষুধ রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৮২ লাখ ডলার। ২০১২-১৩ অথর্বছরে তা ছয় কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছে। ২০১৩-১৪ অথর্বছরে প্রায় সাত কোটি ডলারের, ২০১৪-১৫ অথর্বছরে ৭ কোটি ২৬ লাখ ডলারের, ২০১৫-১৬ অথর্ বছরে ৮ কোটি ২১ লাখ ডলারের ওষুধ বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রস্তুত ওষুধের প্রতি বিভিন্ন দেশের আগ্রহ বাড়ছে ক্রমেই। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক, কুয়েত, শ্রীলংকা, রেলারুশ, দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আমদানির জন্য চুক্তি করেছে। লাইসেন্সিং চুক্তি করে বাংলাদেশের কারখানায় উৎপাদন করে ওষুধ নিতে চান জাপানি উদ্যোক্তারা।

বিশে^র ওষুধের রপ্তানি বাজার প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে ৪ থেকে ৫ শতাংশ ধরা সম্ভব হলে রপ্তানি আয় ৭-৮ বিলিয়ন ডলার হবে। এ দেশীয় মুদ্রায় যার রপ্তানির মূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। নীতি সহায়তাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়া গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে আন্তজাির্তক এ বাজার ধরা সম্ভব হবে আশা করা যায়।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রার মূল কারণ আমাদের ওষুধ নীতির যথাথর্ বাস্তবায়ন। ১৯৮২ সালে এদেশে যে ওষুধ নীতি করা হয় তার সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে এখানকার ওষুধশিল্প সামনেই অগ্রসর হয়নি বরং এ দেশের মানুষকে কম দামে ওষুধ কিনে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তা না হলে এদেশের অনেক গরিব মানুষকে ওষুধের অভাবে মৃত্যুবরণ করতে হতো অকালে। আমাদের ওষুধনীতি দিনে দিনে অনেক সংশোধিত এবং পরিমাজির্ত হচ্ছে। যে কারনে আমাদের ওষুধ শিল্প আগামীতে আরও ভালো অবস্থানে পেঁৗছে যাবে সন্দেহ নেই। এখন যেভাবে ওষুধ বিক্রি হয় তার ধরনও বদলে যাবে সময়ের পালাবদলে। বাংলাদেশে যত পণ্য তৈরি হয় তার মধ্যে ওষুধের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো সবাির্ধক সতকর্তা অবলম্বন করে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে শতভাগ মান নিশ্চিত করা হয়। নতুন ওষুধ নীতিমালায় অনেক কিছুই সংযোজন হচ্ছে। যে কারণে আরো বেগবান হবে আমাদের ওষুধ শিল্প, আরও বেশ এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। এখন আমাদের এখানে ভালো ভালো উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী, গ্রæপ ওষুধ শিল্পে আসছেন। অনেক নতুন উদ্যোক্তা আসছেন ওষুধ শিল্পে। আমাদের ওষুধ শিল্পে অনেক দক্ষ অভিজ্ঞ মেধাবী লোকজন প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছেন। আগামীতে তাদের দক্ষতা ও নিরলস পরিশ্রমের কারণ আমাদের ওষুধশিল্প আরও উন্নত হবে।

সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্পে একটি বড় বাধা হলো কঁাচামাল আমাদানি। উৎপাদনের বড় একটা অংশ ব্যয় হয় উচ্চ মূল্যের কঁাচামালের পেছনে। দেশে ওষুধ প্রস্তুতের কঁাচামাল উৎপাদন বাড়াতে পারলে উৎপাদন ব্যয়ও কমবে, ওষুধের দামও মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্য থেকে জানা যায় বতর্মানে দেশের অধিকাংশ ওষুধের কঁাচামালের বাজার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। আজকাল দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ওষুধের কঁাচামাল উৎপাদন করছে। মুন্সীগঞ্জের এপিআই ওষুধ শিল্প পাকর্ পুরোদমে চালু হলে কঁাচামাল উৎপাদন বাড়বে। ফলে আমাদানি খরচ শতকরা ৭০ ভাগ কমে আসবে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য ২০৩৩ সাল পযর্ন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ^বাণিজ্য সংস্থার ছাড়ের সুযোগ বাংলাদেশের জন্য বড় আশীবার্দ বয়ে এনেছে।

দেশের অনেক কোম্পানিই এখন আন্তজাির্তক মানের ওষুধ তৈরি করছে। নতুন নতুন কোম্পানির ওষুধ প্রস্তুতকারী হিসেবে আসার পথও তৈরি হয়েছে। উন্নত বিশে^র দেশগুলোর সাটিির্ফকেশন সনদও পেয়েছে প্রায় ১২টি কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ আরও দেশে ওষুধ রপ্তানি পযার্য়ক্রমে বাড়ছে।

রেজাউল করিম খোকন: ব্যাংকার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে