logo
  • Sun, 18 Nov, 2018

  জহির চৌধুরী   ১২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

আরএসএস-প্রণব মুখাজির্র ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে

মহাত্মা গান্ধী হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৪৮ সালে নিষিদ্ধ হওয়া কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস-এর সুহৃদ-প্রশংসাকারী প্রণব মুখাজির্ বিনাস্বাথের্ হয়েছেনÑএটা মনে করার সুযোগ কোথায়? ‘অচ্ছুত’ আরএসএসকে নাগপুরে গিয়ে মান্যতা দিয়ে প্রণব মুখাজির্ যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক মহলও যা বোঝার বুঝেছে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ও ভারতের ভ‚তপূবর্ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখাজির্ ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলে ঝড় তুলেছেন। প্রণব মুখাজির্র উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস-এর তৃতীয় বষর্ ভাগার্ অনুষ্ঠানে যোগদান-প্রশংসা, আরএসএস প্রতিষ্ঠাতার বাসভবনে গমন, আরএসএস প্রতিষ্ঠাতাকে ‘ভারতমাতার মহান সন্তান’ মন্তব্য ভারতের রাজনীতি বিশ্লেষকদের ঝড় তোলা আলোচনার খোরাক হয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলে বলাবলি হচ্ছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গোপন স্বপ্নপূরণে তলে তলে বিকল্প দল গড়ছেন প্রণব মুখাজির্। ২০১৯ সালের সাধারণ নিবার্চনকে সামনে রেখে আরএসএস-এর কানপড়ায় কংগ্রেসও নয়, বিজেপিও নয়Ñ এমন নেতাদের নিয়ে থাডর্ পাটির্ গড়ছেন ৮২ বছর বয়সী এ নেতা। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন হলে আরএসএস-এর নামাবলি জড়াতেও প্রণব মুখাজির্ আপত্তি করবেন কিনা সে প্রশ্নও উঠেছে। সঙ্গত কারণেই প্রণব মুখাজিের্ক নিয়ে কথাগুলো উঠেছে। একজন রাজনীতিবিদের রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ নিবার্হী পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ দূষণীয় কিছু নয়। ভারতীয় রাজনীতিতে ৬০ বছর আছেন প্রণব মুখাজির্। পঁাচ যুগ রাজনীতির মাঠে বিচরণকারী প্রণব মুখাজির্ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন। প্রণব মুখাজির্ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেনÑএটা বহু আগে নিজেই ব্যক্ত করেছেন। ১৯৮৪ সালে শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর কাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করা যায় তা নিয়ে যখন কংগ্রেসের মধ্যে আলোচনা চলছিল, তখন প্রণব মুখাজির্ নিজেই নিজের নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েশ ব্যক্ত করেছেন। কংগ্রেস তাকে প্রধানমন্ত্রী করেনি। প্রণব মুখাজির্র ২০০৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আবারো সুযোগ হয়েছিল। এবারো তার স্বপ্ন অপূণর্ রয়ে গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েশ পূরণ না হওয়ার ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রণব মুখাজির্ তার জীবনী গ্রন্থ ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়াসর্’-এ অকপটে উল্লেখও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী না করে কংগ্রেস অবিচার করেছেÑএমন অভিযোগ প্রণব মুখাজির্ সরাসরি না আনলেও পরোক্ষভাবে এনেছেন।

প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে বা বিদেশ সফরে থাকাবস্থায় প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব প্রণব মুখাজির্র ওপর এককভাবে ন্যস্ত করা হতো না। ড. মনমোহন সিংয়ের অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব এককভাবে প্রণব মুখাজির্র হাতে অপর্ণ না করে পি চিদম্বরম এবং এ কে এন্টনির মধ্যে ভাগ করে দেয়ার নজির রয়েছে। প্রণব মুখাজিের্ক প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসানোর ক্ষেত্রে কংগ্রেসের আস্থায় কমতি দৃশ্যমান। ভবিষ্যতে প্রণব মুখাজির্ কংগ্রেসের টিকেটে প্রধানমন্ত্রী হবেন তার ন্যূনতম সম্ভাবনাও নেই। রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস নেতৃত্বে আবিভার্ব সে সম্ভাবনা চিরতরে তিরোহিত করেছে। কংগ্রেসের মনোনয়নে এ জীবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন নাÑএটা চাণক্য খ্যাত প্রণব মুখাজির্ ভালোভাবেই জানেন। বিজেপির মনোনয়নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন প্রণব মুখাজির্ দেখে থাকলে তা হবে ঘুমের ঘোরে দিল্লির লাড্ডু খাওয়ার মতো। প্রণব মুখাজিের্ক প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য বিজেপির নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প ভাববার চিন্তা অবান্তর। কংগ্রেস বা বিজেপির টিকেটে প্রণব মুখাজির্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যৎসামান্য সুযোগ-সম্ভাবনা না থাকা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ভারতের প্রধানমন্ত্রী না হয়েই ধরাধাম ত্যাগ করতে হবেÑএটা ভাবা প্রণব মুখাজির্র জন্য মৃত্যুযন্ত্রণার কষ্টের চেয়ে কম নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জীবন সায়াহ্নে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েশ পূরণের কোনো সুযোগ যদি আসে তা কাজে লাগাতে নীতি-আদশের্র নিকুচি করতে হলেও প্রধানমন্ত্রী হতে না পারার দুঃখে দুমড়ে-মুষড়ে পড়া প্রণব মুখাজির্ করবেন তা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে বলা যায়। প্রণব মুখাজিের্ক সুবিধা সন্ধানী মানুষ হিসেবে চেনেন সবাই। প্রবীণ কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ২০১২ সালের ১৫ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়তে লিখেছেন, ‘তিনি (প্রণব মুখাজির্) একজন বড় মাপের নেতা হতে পারতেন। যদি নিজের চরিত্রের সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী অংশটুকু বজর্ন করতে পারতেন।’ জ্ঞানীরা বলেন, মোহ মানুষকে মূল্যবোধ-নীতি-নৈতিকতাশূন্য করে, মোহ মানুষের বিবেকের মৃত্যু ঘটায়। সুযোগসন্ধানী-সুবিধাবাদী প্রণব মুখাজির্ সুযোগ-সুবিধা, পদ-পদবির স্বাথের্ মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। আরএসএস-এর সাহায্য-সহযোগিতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খোয়াব প্রণব মুখাজির্ দেখছেনÑএমন ধারণার ভিত্তি দেয় প্রণব মুখাজির্Ñআরএসএস ঘনিষ্ঠতায় ।

রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। প্রণব মুখাজির্ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লালিত বাসনা চরিতাথের্ আরএসএস-এর রথে আরোহণ করতে পারেন, আবার প্রয়োজনে প্রণব মুখাজিের্ক আরএসএস তাদের রথে উঠাতেও পারে। কারণ, উভয়ের জন্যই লালিত বাসনা চরিতাথের্র সুযোগ নষ্ট করা আত্মঘাতী। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণের জন্য মুখিয়ে আছে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই। ভারতের উদার মনোভাবাপন্নদের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারায় আরএসএস আজতক ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার ধারেকাছে ভিড়তে পারেনি। ভারতের বৃহৎ উদার জনগোষ্ঠীর মন-মানসিকতা, চিন্তাধারার কারণে আরএসএস-এর ব্যানারে জনরায় নিয়ে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ এ যাবৎ কঠিন হলেও ভবিষ্যতে অবস্থার পরিবতর্ন হবে নাÑএমন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। কারণ, এক সময় যা অসম্ভব মনে হয়েছে পরবতীের্ত তা সম্ভবের ভূরিভূরি নজির রয়েছে। ভোটের রাজনীতিতে আরএসএস এখন সুবিধাজনক অবস্থানেÑএটা আরএসএস মনে করলেও করতে পারে। এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ধমির্নরপেক্ষ ভারতে উগ্রবাদী হিন্দুদের বেপরোয়া অপতৎপরতা এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদের উন্মাদনা কল্পনাতীত বেড়েছে। এটা বেড়েছে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদ উন্মাদনা নানাভাবে উসকে দেয়ার ফলশ্রæতিতে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নিবার্চনে বাম ও উদারপন্থী দলগুলোর চরম ভরাডুবি, বিজেপির অভাবনীয় সাফল্যে ভারত জুড়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদ উন্মাদনা বেগবানের আভাস মেলে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ উন্মাদনার বেনিফিট চ‚ড়ান্তভাবে আরএসএস-এর ঘরে জমা হবেÑএটা সহজেই অনুমেয়। উগ্র হিন্দুত্ববাদের নবোত্থিত জোয়ার এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে কট্টর হিন্দু ভোট একেবারে কম নেই বিবেচনায় নিয়ে আরএসএস নেতৃত্ব ক্ষমতার স্বপ্ন দেখলেও দেখতে পারে। ইংরেজি প্রবাদ বলে, ‘হিট দ্য রড হোয়েন ইট রেড’। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার গুরুত্ব বোঝাতেই ইংরেজি এ প্রবাদ। সময়-সুযোগ অনুক‚লে হলে তা নষ্ট না করে কাজে লাগানো বুদ্ধিমানের কাজÑএটা আরএসএসের না বোঝার কথা নয়। আরএসএস যদি মনে করে বিজেপির ওপর নিভর্র করে ভারতমাতাকে রামরাজ্যে পরিণত করা সময়সাপেক্ষ, ভারতমাতাকে রামরাজ্য বানাতে আর সময়ক্ষেপণের প্রয়োজন নেই, হিন্দু উন্মাদনা কাজে লাগিয়ে বিজেপি এবং কংগ্রেসকে আসন্ন জাতীয় নিবার্চনে পরাজিত করা সম্ভব, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার এখনই সময় তাহলে আরএসএস ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নিবার্চনে আটঘাট বেঁধে নামার সম্ভাবনা থাকে। আরএসএস তাদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত তৃতীয় শক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর সুযোগ হাতছাড়া যেন না হয় সেজন্য যাকে আবশ্যক মনে করবে তাকে সংগঠনে ভিড়াতে এবং কংগ্রেস-বিজেপির বিকল্প শক্তির অভ্যুদয় ঘটাতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা স্বাভাবিক। প্রণব মুখাজির্ আরএসএস-সহ কয়েকটি দল নিয়ে বিজেপি এবং কংগ্রেসের বিকল্প থাডর্ পাটির্ গড়ছেনÑএমন খবরে কংগ্রেস-বিজেপির বিকল্প শক্তির অভ্যুদয় ঘটানোর প্রাথমিক তৎপরতা আরএসএস-এর তত্ত¡াবধানে শুরুর ইঙ্গিতই দেয়।

প্রণব মুখাজিের্ক ব্যবহারের সুযোগ আরএসএস-এর রয়েছে। প্রণব মুখাজির্র সুযোগসন্ধানী-সুবিধাবাদী চরিত্র আরএসএসের অজ্ঞাত নয়। প্রধানমন্ত্রিত্বের মুলো প্রণব মুখাজির্র নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর প্রণব মুখাজির্ দিগি¦দিকশূন্য হয়ে ছুটে আসবেন তা আরএসএস বিলকুল অবগত। কট্টর হিন্দুবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের (আরএসএস) মতাদশের্র আজন্ম বিরোধী প্রণব মুখাজির্র ভারতের অসাম্প্রদায়িক মহলের কড়া সমালোচনা গায়ে না মেখে, দীঘির্দনের সতীথের্দর অনুরোধ না রেখে আরএসএস-এর তৃতীয় বষর্ ভাগার্ অনুষ্ঠানে যোগদান, আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলরাম হেডগেওয়ারের বাসভবনে গমন, সেখানে রক্ষিত ভিজিটরস বুকে ‘ভারতমাতার এক মহান সন্তানকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে আজ এখানে এসেছি’ মন্তব্য (রাজনীতির ৬০ বছরের জীবনে এমন কথা প্রণব মুখাজির্র মুখে কখনো শোনা যায়নি), আরএসএস-এর প্রশংসা ভারতের রাজনৈতিক মহলের জন্য বাতার্ ধরা যায়। প্রণব মুখাজির্ আরএসএস গৃহে অতিথি হতে পেরে খুশিতে গদগদ করছেন তা তার শরীরের ভাষাই বলে।

মহাত্মা গান্ধী হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৪৮ সালে নিষিদ্ধ হওয়া কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস-এর সুহৃদ-প্রশংসাকারী প্রণব মুখাজির্ বিনাস্বাথের্ হয়েছেনÑএটা মনে করার সুযোগ কোথায়? ‘অচ্ছুত’ আরএসএসকে নাগপুরে গিয়ে মান্যতা দিয়ে প্রণব মুখাজির্ যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক মহলও যা বোঝার বুঝেছে।

জহির চৌধুরী: কলাম লেখক

পযড়ফিযঁৎুুধযরৎ@ুধযড়ড়.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে