logo
  • Mon, 16 Jul, 2018

  শাহ মো. জিয়াউদ্দিন   ১১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ও মধ্যম আয়ের দেশ প্র্রসঙ্গে

দেশের বিদ্যমান আথির্ক ব্যবস্থাপনা বা জাতীয় অথর্নীতির এই লুটপাট বন্ধ করতে না পারলে এ দেশকে মাধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা যাবে না।

বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি জনবহুল দেশ। দেশটির সব সম্পদের চেয়ে বড় সম্পদ হলো জনসম্পদ। এই জনসম্পদই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক সময় বাংলাদেশ ছিল পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশ। তবে বতর্মানে দরিদ্রতার প্রভাব অনেকটাই কমেছে। মানুষ দুবেলা আহার পাচ্ছে এটা ঠিক, তবে অন্য বিষয়গুলোয় দরিদ্রতা বিদ্যমান রয়েছে। কারণ এ দেশের সরকারি কমর্চারী ছাড়া অন্য কারও শ্রমের মূল্যায়ন নেই। দেশের ভিতরে এবং বাইরে যে পরিমাণ শ্রমশক্তি তাদের শ্রম বিনিয়োগ করছে, সেই বিনিয়োগকৃত শ্রমের তুলনায় যে পারিশ্রমিক তারা পাচ্ছে তা খুবই নগণ্য। এ দেশের শ্রমিকের শ্রম নিয়ে রয়েছে দক্ষ-অদক্ষতার প্রশ্ন। আন্তজাির্তক পরিমÐলে এ দেশের অধিকাংশ শ্রমিককেই অদক্ষ বলা হয়। দেশীয় এবং আন্তজাির্তক পুঁজিবাদী ও লুুটেরা মুনাফাখোরীচক্র এ দেশের শ্রম সম্পদকে দক্ষ করতে দেয় না নানান কৌশলে। তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে হারে অনিয়ম চলছে তাতে ভবিষ্যতে এ দেশে দক্ষ জনসম্পদের মারাত্মক অভাব দেখা দেবে। আমাদের দেশের জনসম্পদকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করার উদেশ্যেই শিক্ষাব্যবস্থায় দুনীির্ত ও অনিয়ম ঢুকানো হয়েছে। একটি চক্র চায় এ দেশে দক্ষ জনসম্পদ না গড়ে উঠুক। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় দুনীির্ত অনিয়মের এই কাজটি সুনিপুণ কৌশলে করে যাচ্ছে আন্তজাির্তকচক্র এ দেশীয় দোসরদের দিয়ে। মানসম্মত শিক্ষা না পেয়ে এ দেশের জনসম্পদ দক্ষ হয়ে উঠতে পারছে না, বেকারত্বের হার বাড়ছে। এই বেকারত্ব থেকে বঁাচার জন্য ও জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের জনসম্পদরা কায়িক শ্রম বিনিয়োগ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে যাচ্ছে। এই বাংলাদেশি শ্রমশক্তির মেধা এবং শ্রম বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিরাট অঙ্কের রেমিট্যান্স বিদেশ থেকে নিয়ে আসছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, বিশ্বের রেমিট্যান্স প্রাপ্তির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান অষ্টম। ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ দুই অঙ্ক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে বতর্মানে বিদেশ থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পায় তা মোট জাতীয় আয়ের ১১ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের বিদেশি রেমিট্যান্স প্রাপ্তির গতি এখন অনেকটা মন্থর হয়ে পড়ছে তার কারণ জনসম্পদ দক্ষ না হওয়া। দেশে বা বিদেশ অদক্ষ শ্রমশক্তির পারিশ্রমিক অনেক কম। প্রথম আলোর একটি তথ্য থেকে জানা যায় যে, ২০১৬-১৭ সালে প্রবাসীদের আয় কমেছিল আগের অথর্বছরের তুলনায় অথার্ৎ ২০১৫-১৬ অথর্বছরে বৈদেশিক আয় ছিল ২০১৬-১৭ এর চেয়ে বেশি। ২০১৬-২০১৭ অথর্বছরে প্রবাসীদের আয় কমেছিল আগের অথর্বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অথর্বছরে প্রবাসীরা বাংলাদেশে যে অথর্ পাঠান তার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। অথচ ২০১৪-১৫ সালে প্রবাসীদের আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ। যদিও ২০১৭-১৮ অথর্বছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশিদের আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ (দেশে টাকা পাঠানোর হিসাবে)। তবে এই হঠাৎ প্রবৃদ্ধি বাড়ার মূল কারণ ছিল ঈদ। ঈদের কারণে ওই মাসে প্রবাসীরা স্বজনদের কাছে বেশি টাকা পাঠান। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৬-১৭ অথর্বছরে উপসাগরীয় দেশগুলোয় বাংলাদেশি যাওয়ার হার বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। বাংলাদেশ থেকে বেশি লোক উল্লিখিত অথর্বছরে কাজ করতে গিয়েছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এই দেশগুলোয় যে বাংলাদেশিরা গেছেন তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশই নারী। এই দেশগুলোয় কমর্রত বাংলাদেশিদের বেতন অন্যদেশের চেয়ে কম দেয়া হয় বতর্মানে। তাই বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির পরিমাণ দিন দিন কমেছে। এই দেশগুলোয় একই কাজ করে এমন চাকরিতে বাংলাদেশের একজন শ্রমিকের চেয়ে বেশি বেতন পেয়ে থাকেন ভারতীয় একজন শ্রমিক। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবে ২৬ লাখ ৭৭ হাজার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৩ লাখ ৪৯ হাজার, কুয়েতে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬২১ জন, বাহরাইনে ৩ লাখ ১৫ হাজার, ইরাকে ৩৬ হাজার, লেবাননে ১ লাখ ৩৬ হাজার ও জডাের্ন ১ লাখ ৩ হাজার ২৭০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন, এ ছাড়া আফ্রিকার লিবিয়ায় ১ লাখ ২২ হাজার, সুদানে ৮ হাজার ৫২২, মিসরে ২১ হাজার ৬৯০, মরিশাসে ৪০ হাজার ৯৮৫ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ১০ হাজার ৭০ জন, ইতালিতে ৫৫ হাজার ৫১৪ জন বাংলদেশি শ্রমিক কাজ করে থাকেন। এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ায় ৭ লাখ ১০ হাজার, সিঙ্গাপুরে ৫ লাখ ৮৫ হাজার, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৩ হাজার ১১৫ , জাপানে ১০ হাজার ৩৮৬ , ব্রæনাইয়ে ৫১ হাজার ৩৩৪ জন, এ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ১ লাখ ১০ হাজার ২০৩ জন বাংলাদেশি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। একটি তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে এ পযর্ন্ত ৯৫ লাখ ৭৬ হাজার ১১২ জন শ্রমিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রম বিনিয়োগ করছে। এই বিপুল শ্রমশক্তি বিনিয়োগের পরও দিন দিন বিদেশি রেমিট্যান্স কমছে তার অন্যতম কারণ বাংলাদেশিরা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূণর্ শিক্ষা পাচ্ছে না। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে জানা যায়, ২০১৫ সালে এ দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৫,৩১৬ বিলিয়ন মাকিনর্ ডলার, ২০১৬ সালে তা কমে দঁাড়ায় ১৪,৯৩১ বিলিয়ন মাকির্ন ডলারে ২০১৭ সালে তা আরও কমে দঁাড়ায় ১২,৭৬৯ বিলিয়ন মাকিন ডলারে। পক্ষান্তরে এই আসা রেমিট্যান্স নানাভাবেই আবার বিদেশ যায়। বাংলাদেশে পাশ্বর্বতীর্ দেশ ভারত, এই দেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে। জিএফআইর তথ্যানুসারে গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি ডলার। শধু ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বিলিয়ন ডলার। যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পযর্ন্ত জিএফের তথ্যানুসারে জানা গেছে প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলার এ দেশ থেকে পাচার হয়েছে। তা ছাড়া একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, এই দশকের আগের দশকে বাংলদেশ থেকে সরাসরি ৭-১২ শতাংশ অথর্ পাচার হয়ে গেছে। এক কোটি মানুষ তাদের কায়িকশ্রমের বিনিময়ে যে বৈদেশিক মুদ্রাটা দেশের অভ্যন্তরে আসছে তাদের কিন্তু বাস্তবতাথের্ দেশের অভ্যন্তরে কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। অন্যদিকে দেশের কথিত বিশিষ্ট জন হিসেবেখ্যাত গুটিকয়েক মানুষ এক কোটি মানুষের শ্রমে আহরিত বৈদেশিক মুদ্রা এক নিমিষেই পাচার করে দিচ্ছে। আর এই অথর্ পাচারকারীরাই দেশের কতার্ব্যক্তির ভ‚মিকায়। তারাই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীষর্ ব্যক্তি হয়ে দেশের নীতি-নিধার্রণী করে থাকে। দেশের সাবির্ক অথর্নীতির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের অথর্নীতিতে পঁুজিবাদী ব্যবস্থাটাও নেই দেশের অথর্নীতির ব্যবস্থাটা পরিণত হয়েছে লুটেরা অথর্নীতিতে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত করতে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, ২০৪১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। অঙ্কটি ছিল এমন, একটি চৌবাচ্চায় ৫০০০ গ্যালন পানি ধরে। চৌবাচ্চাটির দুটি নল আছে। একটি নল দিয়ে চৌবাচ্চাটিতে ঘণ্টায় ১০ গ্যালন পানি আসে অন্য নলটি দিয়ে ঘণ্টায় সাড়ে নয় গ্যালন পানি চৌবাচ্চাটি থেকে বের হয়ে যায়। এখন অঙ্কটির রেজাল্ট বের করতে হবে যে, চৌবাচ্চাটি পূণর্ হতে কত ঘণ্টা সময় লাগবে। বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষ দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসে গিয়ে নিজেদের কায়িক শ্রম বিনিয়োগ করে দেশের রিজাভের্র পরিমাণ বাড়াচ্ছে। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সব সেবাগুলো থেকেও নানাভাবে বঞ্চিত। অন্যদিকে গুটিকয়েক মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈকট্য পেয়ে এবং নীতির নিয়মের কারণে দেশ থেকে এই জীণর্কার মানুষের শ্রমের আহরিত অথর্ পাচার করে দিচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশ অথর্নীতিতে স্বয়ম্বরতা অজর্ন করতে পারছে না। তাই দেশের চলমান অথর্নীতির যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তার পরিবতর্ন আশু জরুরি।

দেশের বিদ্যমান আথির্ক ব্যবস্থাপনা বা জাতীয় অথর্নীতির এই লুটপাট বন্ধ করতে না পারলে এ দেশকে মাধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা যাবে না।

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন: কলাম লেখক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

উনিশ বিশ
নন্দিনী

উপরে
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near 'WHERE news_id=2866' at line 3