logo
রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  জোবায়ের আলী জুয়েল   ২২ মে ২০২০, ০০:০০  

ধর্মীয় উৎসব ও বাঙালির সামাজিক প্রেক্ষাপট

আমরা ঈদের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকি। বাঙালিরা ঈদকে দেখি একটা সামাজিক ধর্মীয় বড় উৎসব হিসেবে। ঘরে ঘরে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদ।

মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সারা বিশ্বে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত জাঁক-জমক ও ধুমধামের সঙ্গে এই ধর্মীয় দিবস দুটি পালিত হতে দেখা যায়। বাংলাদেশে এখন যেভাবে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে, ১০০ বছর আগেও কি এভাবে হতো? সাধারণ মানুষ কি আজকের মতো অধীর আগ্রহ, উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন ঈদের চাঁদের দিকে? ঈদের ধুমধামের দিকে? ইতিহাস বলে 'না'। তবে সে আমলে কীভাবে বাংলাদেশে ঈদ উৎসব পালিত হতো? প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বিশ্বাসের সঙ্গে জিজ্ঞাসা মেলে না। জ্ঞানের উৎস জিজ্ঞাসা। আর রাসূল (দ.) নিজেও বলেছেন জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন হলে সুদূর চীনেও যেতে। সুতরাং বর্তমান আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কারও ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আঘাত দেওয়ার জন্য আমার এ লেখা নয়। প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার জন্য আমার এই অবগাহন। আমি একজন মুসলমান হয়ে নিজেকে অত্যন্ত গৌরবান্বিত মনে করি। রমজান মাস মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র মাস এবং কোরআনে একমাত্র এ মাসের কথাই উলেস্নখ করা হয়েছে। এ মাসেই নাজিল হয়েছিল কোরআন, প্রথম অহি পেয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা.), গিয়েছিলেন তিনি মেরাজে। মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার আগে রমজানের সঙ্গে পরিচয় ছিল না মুসলমানদের। এর সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল হিজরতের পরেই। ইসলাম প্রচারের শুরুতে অর্থাৎ আদি বাঙালি মুসলমানরা কীভাবে ঈদ উৎসব পালন করত তা রীতিমতো গবেষণার বস্তু। উৎসব হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ শতবর্ষ আগে ঈদের দিনটি কীভাবে পালন করতেন সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এদেশের হিন্দু, মুসলমান যিনিই আত্মজীবনী লিখে গেছেন তাদের রচনায় আমরা দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, মোহাররম, এমনকি রথযাত্রা, দোলপূর্ণিমা, দীপাবলি উৎসব এরূপ বিভিন্ন পূজা-পর্া্বণ সম্পর্কে বিস্তর উলেস্নখ দেখতে পাই। শুধু পাওয়া যায় না ঈদুল ফিতর সম্পর্কে। এ থেকে যদি বলি ঈদুল ফিতর সেকালে বাংলাদেশে তেমন কোনো বড় উৎসব হিসেবে পালন হয়নি তবে কি তা ভুল বলা হবে? মনে হয় নিশ্চয়ই না।

আমরা ঈদের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকি। বাঙালিরা ঈদকে দেখি একটা সামাজিক ধর্মীয় বড় উৎসব হিসেবে। ঘরে ঘরে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে ঈদ।

ব্রিটিশ আমলে যে উৎসব সবচেয়ে ধুমধামের সঙ্গে এ বাংলায় প্রচলিত ছিল এবং ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি ছুটি বরাদ্দ ছিল তা হলো খ্রিষ্ট সম্প্রদায়ের 'ক্রিসমাস ডে'। ব্রিটিশ আমলে বিদ্যার দিক থেকে মুসলমানরা তুলনামূলকভাবে হিন্দুদের থেকে ছিল অনেক পিছিয়ে। ফলে 'ক্রিসমাসের' পরেই সরকারিভাবে তো বটেই সম্প্রদায়গত আধিপত্য এবং ঐতিহ্যের কারণে এই অঞ্চলে হিন্দুদের 'দুর্গা পূজা' হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়, জাঁকালো এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। অফিস-আদালতে ইংরেজ আমলে সরকারি ছুটির পরিমাণ ঈদের থেকে পূজার জন্য ছিল অনেক বেশি। সে আমলে সরকারি নথিপত্রেও পূজা সম্পর্কে আছে পর্যাপ্ত তথ্যাদি। শাসক ইংরেজরা স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের ঈদকে গুরুত্ব দেয়নি। এজন্য সরকারি ছুটিও বরাদ্দ ছিল কম। ঈদ মুসলমানদের প্রধান উৎসব হিসেবে পালিত না হওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ ছিল বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা। ফরায়েজি আন্দোলনের আগে (১৮১৮ খ্রি.) গ্রামাঞ্চলে মুসলমানদের কোনো ধারণা ছিল না বিশুদ্ধ ইসলাম সম্পর্কে। ইসলাম ধর্মে লোকজ উপাদানের আধিপত্য ছিল প্রায়ই ক্ষেত্রেই হিন্দু রীতি-নীতির ওপর। ১৮৮৫ সালে জেমস ওয়াইজ তার 'ঘড়ঃবং ড়হ :যব জধপবং ঈধংঃড়ৎং ধহফ ঞৎধফবং ঊধংঃবৎহ ইবহমধষ্থ বইতে লিখেছেন 'বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা সরল অজ্ঞ কৃষক। ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে ঈদের দিনে গ্রামবাসীরা জমায়েত হয়েছে ঈদের নামাজ পড়বেন বলে, কিন্তু সে সময়ে দুর্ভাগ্য এই যে, জমায়েতের একজনও জানতেন না কীভাবে ঈদের নামাজ পড়তে হয়। পরে ঢাকায় নৌকাযোগে এক যুবক যাচ্ছিলেন তাকেই ধরে নিয়ে এসে পড়ানো হয়েছিল ঈদের নামাজ'। ঐতিহাসিক মুনতাসীর মামুন উলেস্নখ করেছেন তার পিতার সহকর্মী যিনি ছিলেন সে আমলে একজন নামজাদা পীর, তাকে বলেছিলেন 'মুসলমান ছিলাম বটে [তার জন্ম ১৮৯৮ সালে] কিন্তু ছেলেবেলায় রোজা বা ঈদ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। মসজিদ ছিল হয়তো কয়েক গ্রাম মিলে একটি। স্থানে স্থানে দরগা ছিল। মুসলমানরা তহবন্দ বা লুঙ্গি পরতেন না। কোঁচা দিয়া ধুতি পরিধান করতেন। তাদের অনেকেরই নাম ছিল যেমন গোপাল, ঈশান, ধীরেন ইত্যাদি। আবুল মনসুর আহমেদ তার আত্মজীবনীতে আরও লিখেছেন তাদের গ্রামাঞ্চলে ছিল না কোনো মসজিদ। সে সময় বয়স্করাও সবাই রোজা রাখতেন না। দিনের বেলা তারা তামাক ও পানি খেতেন। শুধু ভাত খাওয়া থেকে বিরত থাকতেন। পানি ও তামাক খাওয়ায় রোজা নষ্ট হতো না। এই বিশ্বাস ছিল তখন তাদের মনে। রোজার মাসে মাঠে যাওয়ার সময় একটা বাঁশের চোঙ্গা রোজাদাররা সঙ্গে রাখতেন। পানি বা তামাক খাওয়ার শখ হলে এই চোঙ্গার খোলা মুখে মুখ লাগিয়ে খুব জোরে দম ছাড়া হতো। মুখ তোলার সঙ্গে সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি গামছা, নেকড়া বা পাটের ঢিপলা দিয়ে চোঙ্গার মুখ কষে বন্ধ করা হতো, যাতে বাতাস বের হয়ে আসতে না পারে। তারপর আবশ্যক মতো পানি ও তামাক পান করে চোঙ্গাটা আবার মুখের কাছে ধরা হতো। খুব ক্ষিপ্ত হাতে চোঙ্গার ঢিপলাটা খুলে মুখ লাগিয়ে চুষে চোঙ্গায় বন্ধ রোজা মুখে আনা হতো এবং ঢোক গিলে একেবারে পেটের মধ্যে ফেলে দেয়া হতো। ঈদের জামাতেও লোকেরা কাছা, ধুতি পরিধান করে যেতেন। অজ্ঞতা ও কুসংস্কার তখন বাঙালি মুসলমান সমাজকে নিদারুণভাবে গ্রাস করে। মুসলমানদের এই অধঃপতন দেখে সে সময় ফরায়েজি আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরিয়তুলস্নাহ (১৭৮১-১৮৪০ খ্রিঃ) স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। হাজী শরিয়তুলস্নাহ দীর্ঘকাল ধরে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজ থেকে বহু অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করেন। আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে সত্তর, আশি বছর আগেও ঈদুল ফিতর বাংলাদেশে বড় কোনো ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়নি এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যেতে পারে। সে আমলে জীবনের আধুনিক প্রাপ্যতা, জটিলতা, কৃষিজ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি গ্রামে তখন সহজলভ্য ছিল না। তাই সেকালের বাংলার রোজা ও ঈদ একালে এখন অবশ্যই ভিন্নতর রূপ পেয়েছে। বছর ঘুরে আসে গ্রামে রোজা, রমজান মাস, গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে পরম বিশ্বাস চাঁদ দেখে রোজা শুরু, চাঁদ ওঠা দেখে রোজার শেষ। চাঁদই তাদের লক্ষ্য স্থল। রমজানের ঈদের চাঁদ দেখার জন্য একালে পাড়ায় পাড়ায় ধুম পড়ে যায়। পবিত্র ঈদের চাঁদ দেখে তারা সালাম করে। সালাম করে বাড়ির গুরুজনদের। কখনো বা বাজি ফোটায়। বন্দুক মেরে দশ গ্রামের লোককে জানিয়ে দেয়। রাত্রিতে আতশবাজি ও আলোকমালায় সজ্জিত করে আবাসগৃহ। সাইরেন বাজায়। ছেলেমেয়েদের মধ্যে ধুম পড়ে যায় রোজা রাখার জন্য। বিশেষত ভোর রাতে সেহরি খাওয়ার সময় তাদের ঘুম থেকে না ডাকলে ভীষণ কুরুক্ষেত্র বেঁধে যায় পরদিন। রোজা থাকতে দাও আর না দাও অন্তত শেষ রাতে উঠে সবার সঙ্গে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেহরি খায়। এতে অনাবিল আনন্দ-ফুর্তি ও প্রতিযোগিতা চলে কে বেশি রোজা রাখতে পারে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগেও আমরা গ্রাম-বাংলার এরূপ স্বচক্ষে রমজান মাসে দেখেছি। এখন মনে হয় রমজানের রোজার শেষে যে ঈদ তা নিছক আনুষ্ঠানিকতা না মুসলিম তথা বিশ্বমানবতার একটা দিক দর্শন এ প্রশ্ন আজ আমাদের সবার মধ্যে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আগেও যেমন বঞ্চিত ছিলেন ঈদের আনন্দ থেকে এখনো বঞ্চিত আছেন তদ্রূপ প্রতিনিয়ত। মোগল আমলের ইতিহাসে আমরা দেখেছি ধনী বিত্তবানরা ঈদের দিন ছুড়ে দিচ্ছেন রেজগি পয়সা আর সাধারণ নিরণ্ন, বঞ্চিত মানুষ তা কুড়িয়ে নিচ্ছেন কাড়াকাড়ি করে। এখনো তার এ আমলে কোনো হেরফের হয়নি, বরং বঞ্চনা আরও বেড়েছে। আমরা চোখের সামনে দেখেছি বাংলাদেশে ধনী, বিত্তবানদের জাকাতের শাড়ি নেওয়ার জন্য দুস্থ গরিব মানুষের হুটোপুটি, লাইন তা আমাদের হতভাগ্য, বঞ্চিত, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের চেহারাই তুলে ধরে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের আনন্দ সাধারণ মানুষের মনে আজ আর কোনোই রেখাপাত করে না। ঈদুল ফিতরের জামাতের আগে থেকেই বিত্তবানদের ফেতরার অর্থ ও সাহায্য নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় শত শত ছিন্নমূল মানুষকে। উৎসব সর্বাঙ্গীন আনন্দময়, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে তখনই যখন আসে বিত্ত বণ্টনের সামঞ্জস্য। তা না হলে ধর্মীয় উৎসবের (ঈদুল ফিতর) মূল আবেদন হ্রাস পায়। ফরায়েজি আন্দোলন এবং পরবর্তী ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনগুলো পাল্টে দিতে পেরেছিল বাংলাদেশের এই মুসলমানদের মন-মানসিকতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও লৌকিক, স্থানীয় উপাদানগুলো বিভিন্ন সময় যুক্ত হয়েছে ঈদের সঙ্গে।

এ শতকের শুরু থেকেই যখন রাজনৈতিকভাবে মুসলিম স্বাতন্ত্রবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই গুরুত্ব পেয়েছে ঈদ। বাংলাদেশের দুটি ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। এদেশে স্বাধীনতার পরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে ঈদ এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে আগের অজ্ঞতা ও তেমন নেই এখনকার মুসলমানদের মধ্যে। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকভাবেই মুসলমান প্রধান দেশে ঈদ এখন নিজের গৌরবোজ্জ্বল, ঐতিহ্যমন্ডিত, স্থান করে নিয়েছে এবং আমাদের বাংলাদেশেও তা বিরাট গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। মুসলমানদের ধর্মীয় তামুদ্দনিক জাগ্রত করেছে এই ঈদুল ফিতর, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কবির ভাষায় বলতে গেলে-

'এসো মুসলিম তসলিম নাও,

নাও এ' তৌহফা বেহেস্তের

তশতরী ভরে শিরনি বিলাও

নির্মল ইনসানিয়াতের'

জোবায়ের আলী জুয়েল: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে