logo
বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ০৫ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০  

করোনার হানা

ভারতে ইসলামবিদ্বেষের বিস্তার

দিলিস্নর তাবলিগ-কান্ড

ভারতে ইসলামবিদ্বেষের বিস্তার
দিলিস্নর তাবলিগের জমায়েতে অংশ নেওয়া লোকজন

ভারতের রাজধানী দিলিস্নতে তাবলিগ জামাতের একটি জমায়েতে যোগ দেওয়া ছয় শতাধিক মানুষের শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ওই ঘটনাটিকে ঘিরে দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে। দেশটির সংবাদমাধ্যমের একটা অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলমানবিদ্বেষী হ্যাশট্যাগ তৈরি হয়েছে, ছড়িয়ে পড়েছে নানা ভুয়া খবর। 'করোনা-জিহাদ' বা 'নিজামুদ্দিন ইডিয়টস' নামে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগও ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও ভারতের মুসলমান নেতৃত্ব স্বীকার করছেন, তাবলিগের ত্রম্নটি নিশ্চয়ই হয়েছে, কিন্তু দিলিস্নতে পুলিশ আর সরকারই বা কেন এই সময়ে ওই সম্মেলন (মারকাজ) হতে দিলো? দিলিস্নর নিজামুদ্দিনে তাবলিগ জামাতের মারকাজে যোগ দিয়ে নিজেদের রাজ্যে ফিরে যাওয়া কয়েকজনের শরীরে করোনা সংক্রমণ প্রমাণিত হওয়ার পর ভারতের গণমাধ্যমে ওই ঘটনা খুবই গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ওই ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে 'অল ইনডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের' সদস্য জাফরিয়াব জিলানি বলেন, 'ভুল দুই তরফেই হয়েছে। ওই জমায়েতে যারা গিয়েছিলেন, তাদের উচিত ছিল নিজে থেকেই পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসকদের আর সরকারের পরামর্শ নেওয়া। উল্টোদিকে, সরকারই বা ব্যবস্থা নেয়নি কেন? জমায়েতটি তো হয়েছে, যখন ভারতে কোনো লকডাউন ছিল না, সেই সময়। তারপর যারা ফিরতে পারেনি, লকডাউনের ফলে তাদের জন্য তো সরকারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল।' জিলানি বলেন, 'এ রকম একটা কঠিন সময়ে বিষয়টাকে যেভাবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে, সেটা একেবারেই কাম্য নয়। মুসলমানদের প্রায় সবাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদির কথা মেনেই চলছে, আলেমরা নির্দেশ দিয়েছেন আর জমায়েত না করতে।' এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী এবং রাজ্যের মুসলমান সমাজের অতি পরিচিত নেতা সিদ্দিকুলস্না চৌধুরীও একই প্রশ্ন তুলছেন, তাবলিগ জামাত যদি ভুল করে থাকে জমায়েত করে, তাহলে সরকার কী করছিল? তিনি বলেন, 'মারকাজে নিজামুদ্দিনের পাশেই থানা আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশ আছে দিলিস্নতে। তারা কি জমায়েতে হাজির মানুষকে কোনোভাবে সচেতন করেছিল? একবারও মাইকিং করেছিল এলাকায়? সেটা করলেই তো এ রকম পর্যায়ে যেত না বিষয়টা। আবার মওলানা সাদও কার সঙ্গে কী পরামর্শ করেছিলেন, জানি না, তাদেরও একগুঁয়ে মনোভাব নেওয়াটা উচিত হয়নি। এ রকম একটা ঘটনার ফলে গোটা দেশের মুসলমান সমাজকে একটা পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছেন তারা।' পশ্চিমবঙ্গ থেকেও অনেকে গিয়েছিলেন ওই জমায়েতে। সিদ্দিকুলস্না চৌধুরী বলেন, 'কারা গিয়েছিলেন সেখানে, সেটা জানা গেছে। আমি বলব, তারা নিজের থেকেই এগিয়ে এসে পরীক্ষা করিয়ে নিন। ডাক্তারি পরীক্ষা করানো ইসলামবিরোধী কাজ তো নয়।' অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো অবশ্য তাবলিগ জামাতের জমায়েত নিয়ে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানোর তত্ত্ব খারিজ করে দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের বাংলা পত্রিকা 'স্বস্তিকা'র সম্পাদক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বলেন, 'এটা মুসলমান বিদ্বেষ কখনোই নয়। তবে যেটা হয়েছে, সেটা তো ভয়াবহ। তাবলিগ জামাত যে ঘটনা ঘটিয়েছে, এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বড় সমাবেশ করলেন, সেখান থেকে তারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেন। এ রকম একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ কী করে করলেন তারা? ধর্মান্ধতা আর পশ্চাৎপদতা যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়, কীভাবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন তারা, সেটাই প্রমাণ করল তাবলিগ জামাত।' ছড়িয়ে পড়ছে মুসলিমবিদ্বেষী ভুয়া ভিডিও, খবর মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে হিন্দু আর মুসলমান দুই পক্ষের মধ্যে বিতর্কের মধ্যেই ওই ঘটনার পর মুসলমানদের লক্ষ করে নানা ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভুয়া খবর যাচাই করে দেখে, এমন একটি ওয়েবসাইট 'অল্টনিউজ'র সম্পাদক প্রতীক সিনহা বলেন, 'নিজামুদ্দিনের ঘটনাটির পর থেকে এ রকম অনেক ভিডিও আর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যেগুলোর টার্গেট মুসলমানরা।' সিনহা বলেন, 'আমরা একটা ভুয়া ভিডিও খুঁজে পেয়েছি, যেখানে একদল মুসলমানকে থালা-বাটি চাটতে দেখা যাচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, এভাবেই মুসলমানরা করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যাচাই করে দেখি, সেটি আসলে 'বোহরা' মুসলমানদের একটি রীতি- খাওয়ার পরে যাতে থালায় একটিও খাদ্যকণাও অবশিষ্ট না থাকে, সেজন্য তারা চেটে পরিষ্কার করে দেন।' তিনি আরও বলেন, 'দুই দিন আগে আরেকটি ভিডিও আসে আমাদের কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি মসজিদের ভেতরে একদল মুসলমান কোনো একটা শব্দ করার চেষ্টা করছেন। ভুয়া পোস্টটিতে বলা হয়, এভাবেই হাঁচি দিয়ে নাকি মুসলমানরা করোনা ছড়াচ্ছে! অথচ এটি আসলে একটা সুফি আচার, যেখানে তারা শ্বাস-প্রশ্বাসের একটা অভ্যাস করেন-সেটাই তারা করছিলেন।' তার কথায়, এসব ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ভারতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার জন্য মুসলমানরাই দায়ী, এ রকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে একটি মুসলমান অধু্যষিত এলাকায় করোনা পরীক্ষা করতে গিয়ে স্থানীয়দের হাতে এক নারী চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্যকর্মীর ওপরে ইটবৃষ্টি এবং তাদের তাড়া করে এলাকা ছাড়া করার ঘটনার যে ভিডিও সামনে এসেছে, সেটির সত্যতা গণমাধ্যম যাচাই করে দেখেছে। আবার হিন্দুদের বড় উৎসব রামনবমীর দিন বৃহস্পতিবার যে অনেক মানুষ লকডাউন উপেক্ষা করেই মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিতে ভিড় জমিয়েছিল, সেই খবর আর ছবিও দিয়েছে পিটিআইসহ নানা সংবাদ এজেন্সি এবং গণমাধ্যম। সংবাদসূত্র : বিবিসি নিউজ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে