logo
বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

  যাযাদি ডেস্ক   ২৮ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

করোনাভাইরাস

মাস্ক সংস্কৃতির পক্ষে-বিপক্ষে

মাস্ক সংস্কৃতির পক্ষে-বিপক্ষে
হংকংয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের মাস্ক পাওয়া যায়
আপনি যদি হংকং, সিউল কিংবা টোকিওর রাস্তায় মাস্ক না পরে বাইরে বের হন, তাহলে লোকজন আপনার দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে পারে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই এটা হয়ে আসছে। এমনকি মাস্ক না পরা একজন ব্যক্তিকে অনেকেই সামাজিকভাবে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি সবখানে হচ্ছে না। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সিডনি কিংবা সিঙ্গাপুরে আপনি চাইলেই মাস্ক না পরে খোলামুখে কোনো সংকোচ ছাড়াই ঘুরে বেড়াতে পারেন। এখন যখন করোনাভাইরাস একটা ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, তখন মাস্ক নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কি বদলাচ্ছে ব্যাপারটা যে সরকারি আদেশ কিংবা উপদেশ থেকে এসেছে তা নয়, এটা সম্পূর্ণ সংস্কৃতির ব্যাপার।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যখন থেকে শুরু হয়, তখন থেকেই সংস্থাটি এই বিষয়ে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, শুধু দুই ধরনের মানুষের জন্য মাস্ক পরা আবশ্যক। এক, যারা অসুস্থ এবং যাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে। দুই, যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের দেখাশোনা করছেন। এর বাইরে কারও জন্য মাস্ক পরার খুব বেশি প্রয়োজনীয় নয় বলে জানিয়েছে ডাবিস্নউএইচও। মাস্ক সুরক্ষা দেয় এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে থাকলেও ব্যাপারটা ততটা সরল নয় বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

প্রথমত, কোভিড-১৯ রোগের ভাইরাসটি ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। দ্বিতীয়ত, এটা বাতাসে ভাসে না। মাস্ক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটা মিথ্যা বিশ্বাসও তৈরি করে। তবুও এশিয়ার একটা বড় অংশ মাস্ককে এক রকম শরীরের অংশ করে নিয়েছে। মনে করা হচ্ছে, মাস্ক ব্যবহার করাটাই একটা নিয়ম। চীনের মূল ভূখন্ডে, হংকং, জাপান, থাইল্যান্ড এবং তাইওয়ানে একটা ধারণা আছে, যে কেউ এই ভাইরাস বহন করতে পারে। এমনকি যিনি সুস্থ, তিনিও। তাই মাস্ক পরাটা সবার দায়িত্ব- এতে করে আপনি ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে একাত্মতা পোষণ করছেন। কোনো কোনো দেশের সরকার তার মানুষকে মাস্ক পরতে বলছে। এমনকি চীনের কোথাও কোথাও মাস্ক না পরলে আপনি গ্রেপ্তারও হতে পারেন।

ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে অনেকের মধ্যেই এই সন্দেহ দানা বেঁধেছে, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করা হয়নি, অর্থাৎ তারা আক্রান্ত মানুষের সঠিক সংখ্যাটি জানে না। এজন্য অন্যদের থেকে বাঁচতে এসব দেশের অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করে। আবার হংকং এমন একটি দেশ, যেখানে মাস্কের ব্যবহার তাদের সংস্কৃতিরই অংশ। করোনাভাইরাস সংক্রমণের বহু আগে থেকে তারা এটা ব্যবহার করে আসছে এবং এটা তাদের 'ফ্যাশনের' অংশ। হংকংয়ের রাস্তার পাশের দোকানে আপনি দেখতে পাবেন 'হ্যালো কিটি' মাস্ক। পূর্ব এশিয়ার অনেক মানুষ আগে থেকেই অসুস্থ হলে মাস্ক পরত। সেখানে উন্মুক্ত স্থানে কফ ফেলা বা হাঁচি দেয়াকে এক ধরনের অভদ্রতা মনে করা হয়। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই জীবাণু যেসব দেশে আঘাত হানে, তার অন্যতম হলো হংকং। ওই অঞ্চলে তখন থেকেই মাস্ক পরাটা সংস্কৃতির একটা অংশ হয়ে গেছে। তখন হংকংয়ে বহু মানুষ মারা গিয়েছিল। এক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তাদের একটা বড় পার্থক্য হলো, এই অঞ্চলের মানুষ সংক্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তাদের স্মৃতি এখনো তাজা। তারা এই কষ্ট অনুভব করেছে বলেই বাড়তি সতর্ক থাকে।

মানুষের ঘনবসতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে অনেকে কেবল দূষণ থেকে বাঁচতেই মাস্ক পরে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এশিয়ার সব জায়গায় যে মাস্ক পরতে দেখা যায়, ব্যাপারটা মোটেও এমন নয়। সিঙ্গাপুরে এখন সরকারের পক্ষ থেকে বলে দেয়া হয়েছে, সবাইকে মাস্ক না পরতে, যাতে করে স্বাস্থ্যকর্মীরা যথেষ্ট পরিমাণে মাস্ক পান। সিঙ্গাপুরে জনগণ সরকারের ওপর ভরসা করে এবং উপদেশ মেনে চলে।

মাস্ক এখন সামাজিক নিয়ম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এখানে দুটো বিষয় কাজ করে। এই যে সর্বব্যাপী মাস্ক পরার একটা হিড়িক, সেটি তৈরি হয়েছে মূলত ভাইরাস থেকে বাঁচতেই। এটা অনেকটা 'ঠেলার পর কাজ করা' ধরনের। আবার অনেকে

ব্যক্তিগত 'হাইজিন' অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে মাস্ক ব্যবহার করে থাকে।

হংকং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডোনাল্ড লো বলেন, 'মাস্ক পরাটা এখন প্রথায় পরিণত হয়েছে। এটা একটা উর্দির মতো। কিন্তু মূল বিষয়টি হচ্ছে, মুখে হাত না দেওয়া, ভিড়ের মধ্যে না যাওয়া এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।' তবে এখন এমন একটা অবস্থা যার কারণে, মানুষ নিজের সুরক্ষায় কোনো ফাঁক রাখতে চাইছে না।

মহামারি বিশেষজ্ঞ (হংকং বিশ্ববিদ্যালয়) বেঞ্জামিন কওলিনং বলেন, 'আমরা এমন বলতে পারছি না যে, মাস্কের কোনো কাজ নেই। কিছু না কিছু সাহায্য তো করেই। এজন্যই তো আমরা এটা স্বাস্থ্যকর্মীদের দিচ্ছি।' যদি সবাই মাস্ক পরে, তাহলে তা একটু হলেও সাহায্য করে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে এর নেতিবাচক দিক হচ্ছে, যাদের প্রয়োজন তারাই হয়তো এগুলো পাবে না, অন্যদিকে সুস্থ মানুষ এটা পরে বসে থাকবে। যেমন জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে মাস্কের ভয়াবহ ঘাটতি আছে। এমনও সময় আসতে পারে, যখন মানুষ একই মাস্ক পুনরায় ব্যবহার করবে, যে বিষয়টি প্রচন্ড অস্বাস্থ্যকর। আবার অনেকে ঘরে মাস্ক বানাবে, যা আসলে কোনো কাজের নয়। সংবাদসূত্র : বিবিসি নিউজ
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে