logo
রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬

  রেজা মাহমুদ   ২২ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

ঢাকার বস্তিতে করোনা আতঙ্ক

ঢাকার বস্তিতে করোনা আতঙ্ক
রাজধানীর একটি বস্তি -ফাইল ছবি
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বেশকিছু দিন আগেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা রিতা আক্তারের ৫ বছর বয়সি ছেলের স্কুলে যাওয়া বন্ধ। ভাইরাস নিয়ে গণমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণা, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য ও প্রতিবেশীদের এ সংক্রান্ত আলোচনায় আতঙ্কমুক্ত হতে পারছেন না তিনি। বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বহুলোকের একত্রে বসবাস কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

রিতা আক্তার বলেন, আক্রান্ত একজনের মৃতু্যর খবরের পর তিনি তার ছেলেকে বস্তির অন্য ছেলেদের সঙ্গে খেলতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু বস্তির অন্যান্য পরিবার এ ব্যাপারে সচেতন না। তারা তাদের বাচ্চাদের ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করছে না। তিনি জীবাণুমুক্ত থাকার জন্য সাবান ব্যবহার করলও অনেকেই কিছুই ব্যবহার করছে না।

ঢাকার বস্তির বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তাদের তথ্যমতে রাজধানীতে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বস্তিতে বাস করে। এই কড়াইল বস্তিতে বাস করে প্রায় ১ লাখ মানুষ। দুস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ডা. দিবালোক সিংহ বলেন, যদি কোনো বস্তির একজন ব্যক্তিও এই ভাইরাসে আক্রন্ত হয় তাহলে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়বে পুরো বস্তি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে বৃদ্ধ ও শিশুরা।

কড়াইল বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দাই গরিব। কেউ সিএনজি অটোরিকশা চালক, কেউ রিকশা চালক, কেউ বা সিকিউরিটি গার্ড। অন্যদিকে বেশির ভাগ মহিলাই বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে। ৪৬ বছর বয়সি নাজনীন বেগম জানান, তিনি গুলশানে যে বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে কাজ করতে হয়। কাপড় ধোয়া থেকে মেঝে সব কিছুতেই জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমরা এখানে ভাইরাস থেকে বাঁচতে কিছুই ব্যবহার করি না। এ সময় তার স্বামী মনু হাজী জানায়, আমরা এসব কিভাবে ব্যবহার করব, ১৯ পরিবারের জন্য মাত্র একটা টয়লেট এবং দুটি চুলা রান্না করার জন্য।

এখানকার ঘরগুলোতে একসঙ্গে অনেক মানুষের বসবাস। ফলে কেউ আক্রান্ত হলে আলাদা করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে উদাসীনতা রয়েছে বাড়ির মালিকদেরও। কড়াইল বস্তির ৮টি ঘরের মালিক আনসার আলি বলেন, দিনে তিনি কতবার হাত পরিষ্কার করবেন যেখানে পুরো বস্তির পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর আর এত মানুষের বাস। আনসার আলির তথ্যমতে, বর্তমানে বস্তির অধিকাংশ বৃদ্ধ শ্বাসকষ্ট ও শিশুরা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনাভা ক্যাম্পে ৫ ফিট বাই ৩ ফিটের এক একটি রুমে প্রায় ৫ থেকে ৬ জন লোক বাস করে। সারাদেশে এসব ক্যাম্পে ২ লাখ ৩৫ হাজার স্কয়ারফিটে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ বাস করে। প্রত্যেকেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান বিশ্বের যেসব জায়গায় করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে তার তথ্যউপাত্ত থেকে দেখা যায়, খোলা মার্কেট ও বেশি জনবহুল এলাকাতেই এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি।

ক্যাম্পগুলোতে খোঁজ

নিয়ে দেখা যায়, সেখানকার ওষুধের ফার্মেসিগুলোতে কোনো হ্যান্ড স্যানিটাইজার নেই। তবে ফার্মেসি মালিকরা বলছেন, তাদের কাছে কেউ হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে আসে না। তাই দোকানে এই জাতীয় কোনো পণ্য নেই। জেনেভা ক্যাম্পের সেক্রেটারি জেনারেল সাওকাত আলি বলেন, আমরা মসজিদের মাইকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সবাইকে সচেতন থাকার জন্য বলে আসছি। কিন্তু কাউকেই এ ব্যাপারে সচেতন মনে হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের কোনো সহযোগিতা এখানে আসেনি। কোনো পরিচ্ছন্নতা কর্মীও আমরা লক্ষ করিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এসব বস্তিতে বিশেষ নজর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, যদি এসব জনবহুল জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। যারা বিভিন্ন গণপরিবহণে ও বাসাবাড়িতে কাজ করে তাদের সবার মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। এছাড়া খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোর ঘরেফিরে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার নিশ্চিত করা দরকার যদি তারা তাদেরে পরিবারের বাকি সদস্যদের নিরাপদ রাখতে চায়।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে