logo
রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬

  ফয়সাল খান   ২২ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

করোনা ঝুঁকিতে গণপরিবহণযাত্রী

করোনা ঝুঁকিতে গণপরিবহণযাত্রী
রাজধানীর একটি গণপরিবহণে মাস্ক পরিহিত যাত্রী -ফাইল ছবি
চীন-ইতালির মতো মহামারি আকারে না ছড়ালেও রোগী শনাক্তের পর থেকে করোনা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এর ওপর করোনাভাইরাসে দুইজনের মৃতু্য এবং দিন দিন আক্রন্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় তা আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের। তবে ভাবনা-শঙ্কা আর চিন্তা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোয় করোনা মোকাবিলার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে গণপরিবহণগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। এখনই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আর করোনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে গণপরিবহণের মাধ্যমে এই ভাইরাস আরও ভয়ঙ্কর আকারে বিস্তার লাভ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের উহান শহর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পরে করোনাভাইরাস। এই ভাইরাস মানুষের মাধ্যমেই ছড়িয়েছে। ফলে গণপরিবহণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে করোনাভাইরাস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে গণপরিবহণে করোনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। পরিবহণ চালক-শ্রমিক বা ও যাত্রীদেরও সচেতনতা তেমন বাড়েনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ সচিবালয়ে ১৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সর্দি-কাশি-জ্বর নিয়ে যানবাহনে চলাচল না করতে আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। পাশাপাশি যাত্রীদের জন্য ব্যবহৃত পাবলিক পরিবহণগুলোয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাতে রেলপথ এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এরপরও করোনা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের। গোটাকয়েক ভিআইপি সার্ভিস ছাড়া বেশিরভাগ যাত্রীরাই অপরিচ্ছন্ন বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যাতায়াত করছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, যাত্রী উঠানোর আগে সুস্থতা যাচাই করা হচ্ছে না অধিকাংশ পরিবহণেই। যাচাই করার মতো যন্ত্রপাতি বা সময়ও তাদের হাতে নেই। আগের মতোই ডেকে ডেকে যত্রতত্র যাত্রী উঠাচ্ছে ঢাকায় চলাচলকারী নগর পরিবহণগুলো। বেশ কয়েকটি নগর পরিবহণে ঠান্ডায় কিংবা জ্বরে আক্রান্ত ও সাধারণ যাত্রী একসঙ্গে চলাচল করতে দেখা গেছে। যাত্রীরা হাচি-কাশি দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম মানছেন না। একজন মুখের সামনে হাত রেখে হাচি দিলেও নেমে যাওয়ার সময় ওই হাত দিয়ে বিভিন্ন সিট ও হ্যান্ডেল ধরে ধরে নামছেন। এসব সিট বা হ্যান্ডেল ধরে অন্য যাত্রীরাও উঠানামা করছেন।

পরিবহণ শ্রমিকরা বলছেন, এমনিতেই যাত্রীর সংখ্যা কম। দীর্ঘক্ষণ স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকেও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো যাত্রী আসলেই তাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। দিন শেষে মালিককে জমার টাকা বুঝিয়ে দিতে হয়। যাত্রী কম থাকার কারণে মালিককে টাকা দিয়ে নিজেদের তেমন থাকে না। তাই যাত্রী আসলে সবার আগে নিজের গাড়িতে তুলতে চান তারা।

এক হেলপারের ভাষ্য, কারো জ্বর কি না, তা বুঝব কিভাবে। আমরা তো আর কোনো যাত্রীর গায়ে হাত দিয়ে জ্বর আছে কি না তা পরীক্ষা করতে পারি না। আর কাউকে অসুস্থ মনে হলে তাকে গাড়িতে না তুললে অন্য কেউ ঠিকই তুলে নেবে। আবার অনেক যাত্রীকে তুলতে না চাইলে অনেকেই খারাপ ব্যবহার করেন।

এদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর বেশকিছু পরিবহণ নামকাওয়াস্তে পরিষ্কার করা হলেও তা করোনা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। কিছু কিছু বাসের ফ্লোরে পানি আর সাবানের গুঁড়া দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবহণ শ্রমিকরা। তবে বসার সিট বা অন্য কোনো কিছু তেমন পরিষ্কার করা হয়নি। পরিবহণে উঠার আগে হাত পরিষ্কার করারও কোনো ব্যবস্থা নেই। চালক-হেলপারের সুরক্ষারও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দিনে কখন হাত পরিষ্কার করেছেন তাও বলতে পারেনি অনেক হেলপার।

ঢাকায় চলাচলকারী মিডলাইন পরিবহণের আনিসুর রহমান নামের এক হেলপার যায়যায়দিনকে জানান, কোনো কিছু খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে নেন। আর ট্রিপ শেষ করে দরকার হলে হাত-মুখ ধুয়ে নেন।

মনজিল পরিবহণের চালক শফিউদ্দিন জানান, মালিকের নির্দেশে গাড়ি পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু যাত্রী উঠানোর আগে হাত

ধোয়া বা অসুস্থ কি না তা যাচাই করতে তাদের কিছু বলা হয়নি।

প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহণের সুমন মিয়া জানান, ভাইরাসের কথা সব দিকে শুনতেছি। কিন্তু পেটের দায়ে গাড়িতে আসতেই হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিস্ক তো আছেই। কিন্তু গাড়িতে না আসলে পরিবারের সবাই না খেয়ে থাকবে।

এরফলে ডাকঢোল পিটিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবিলার কথা বলা হলেও গণপরিবহণ অরক্ষিতই রয়ে গেছে। করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন গণপরিবহণে চলাচল করছেন যাত্রীরা। শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও ঢাকায় মানুষ কম থাকার কারণে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে গণপরিবহণের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যাত্রীরা বলছেন, তারাও বাধ্য হয়েই গণপরিবহণ ব্যবহার করছেন। যাদের চাকরি বা ব্যবসায় রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই গণপরিবহণ ব্যবহার করছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যায়যায়দিনকে বলেন, দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ গণপরিবহণ ব্যবহার করেন। তারা চাইলেও গণপরিবহণ ব্যবহার বন্ধ করতে পারবেন না। ফলে গণপরিবহণগুলো জীবাণুমুক্ত রাখতে সরকারকে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন ও লঞ্চঘাটে থার্মাল স্ক্যানার বসিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে