logo
শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬

  যাযাদি রিপোর্ট   ১৯ মে ২০১৯, ০০:০০  

ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না ঢাকা মহানগর বিএনপি

ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না ঢাকা মহানগর বিএনপি
পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে এক মাসের সময় বেঁধে দিলেও দুই বছরে তা করতে পারেনি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি। এরমধ্যে সংসদ নির্বাচন বিপর্যয় মহানগর বিএনপির কার্যক্রমে স্থবিরতা আরও বাড়িয়েছে। সংগঠনের বেহাল অবস্থার কারণে দিনে দিনে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ অসন্তোষ বাড়ছে। মূলত ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকায় দক্ষিণের পাশাপাশি উত্তরেরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া একেবারে থমকে গেছে। শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতির কারণে দক্ষিণে শাখার কার্যক্রম নেই বললেই চলে। অন্যদিকে একযোগে উত্তর-দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের কারণে থানা, ওয়ার্ড কমিটি গঠনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্র জমা দিয়েও উত্তরের কমিটি আলোর মুখ দেখছে না।

২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত করে আংশিক কমিটি দেয় বিএনপি। উত্তরে এমএ কাইয়ুম এবং দক্ষিণের শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব পান হাবিব উন নবী খান সোহেল। মামলার কারণে উত্তরের শীর্ষনেতা বিদেশে থেকে দল পরিচালনা করলেও নগর নেতাদের সমন্বয়ে আংশিক কমিটি গঠন হওয়ার কারণে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে দক্ষিণের চেয়ে সর্বক্ষেত্রেই উত্তর এগিয়েছিল। কমিটি গঠন এবং কর্মসূচি সফল করা ক্ষেত্রে উত্তর যতটা সফলতা দেখিয়েছে দক্ষিণ এর ধারে কাছেও যেতে পারেনি। হাবিব উন নবী খান সোহেল দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে এ শাখার সাংগঠনিক অবস্থা একেবারে বেহাল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সর্বস্তরের কমিটি গঠন সম্পন্ন করেছে উত্তর বিএনপি। পূর্ণাঙ্গ কমিটিও জমা দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে সোহেল মুক্তি পেলে একযোগে উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটির ঘোষণা করা হবে। সঙ্গত কারণে বলা যায়, সোহেল মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির কার্যক্রম স্থবিরই থাকছে।

সাংগঠনিক কার্যক্রমের অবস্থা প্রসঙ্গে মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে একটি মুহূর্তের জন্য উত্তর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে থাকেনি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব

\হকার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালের পরে যেসব কমিটি গঠন একবারেই সম্ভব হয়নি সেসব কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে। এক নেতার এক পদের বিধান একমাত্র উত্তর বিএনপিতে কার্যকর করা হয়েছে। ২৬টি থানার ১২১ সদস্যের এবং ৭১ সদস্যের ৫৬টি ওয়ার্ডের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০১ সদস্যবিশিষ্টি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রে জমা দেয়া হয়েছে। সর্বমোট ৭ হাজার ৩শ ২৩ সদস্যের মহানগর উত্তর কমিটি তালিকা প্রস্তুত আছে। এরমধ্যে একজন নেতাও দুটি পদে থাকছে না। কেন্দ্রীয় কমিটিতে যারা আছে তাদেরকেও এক পদে রাখার ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে।

কমিটি গঠনে উত্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অসন্তোষ ও কোন্দলের বিষয়ে প্রবাস থেকে সংগঠন চালানো এই নেতা বলেন, কোনো কোন্দল বা অসন্তোষ নেই। কয়েকজন নেতা আছেন যারা একাধিক পদে থাকতে চান। কিন্তু দলের বিধান অনুযায়ী তা সম্ভব নয়। এজন্য কয়েকজন নেতার মধ্যে সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি আছে। এর বেশি কিছু নয়।

সব প্রক্রিয়া সম্পন্নের পরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন আলোর মুখ দেখছে না জানতে চাইলে কাইয়ুম বলেন, কমিটি গঠনের কেন্দ্রের নির্দেশনা তারা পালন করেছেন। এবার অনুমোদনের দায়িত্ব কেন্দ্রের। এ বিষয়ে কেন্দ্র ভালো বলতে পারবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারা শিগগিরই এসব বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

উত্তর বিএনপির অসন্তোষের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি ও অঙ্গ দলের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ৭ হাজারের বেশি পদ দিয়ে এক নেতার এক পদের বিধান কার্যকর করা হয়েছে। এজন্য থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে অসন্তোষ না থাকলেও ক্ষোভ আছে সিনিয়র নেতাদের মাঝে। কারণ, নগরের সিনিয়র নেতাদের রাখা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকায়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দিচ্ছে না কেন্দ্র। ফলে পদহীন অবস্থায় থাকা প্রায় দেড় শতাধিক নেতা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে অসন্তোষ আছে। মূল দলের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন হলেও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলেরও উত্তরের কোন পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। ফলে দলকে শক্তিশালী করতে মূল দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি দ্রম্নত গঠনের দাবি উঠেছে।

এদিকে উত্তরের সাংগঠনিক কমিটি গঠনের কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন হলেও দক্ষিণ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খানকে ( সোহেল) সভাপতি ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজী আবুল বাসারকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা বিএনপির ৭০ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। ২৬ জনকে সহসভাপতি, ১৯ জনকে যুগ্মসম্পাদক, ১৮ জনকে সহসাধারণ সম্পাদক, তিনজনকে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দপ্তর সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষের নাম ঘোষণা করা হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কমিটি অনুমোদন করে এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু আজো তা গঠিত হয়নি।

দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব উন নবী খান সাত মাস ধরে কারাগারে আছেন। নেতাকর্মীদের কাছে সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসারের খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা নেই। বলতে গেলে এই শাখার কার্যকম কার্যত স্থবির। কর্মসূচিগুলোতেও ঘোষিত কমিটির ৭০ জনের মধ্যে মাত্র ৪/৫জনকে অংশ নিতে দেখা যায়।

দক্ষিণের সাংগঠনিক অবস্থা বেহাল হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছেন, সাবেক ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হাবিব উন নবী ঢাকা মহানগর দায়িত্ব পাওয়ার আগে মহানগরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কমিটি গঠনে নগরের শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতাও পাননি। নিজেও যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। দক্ষিনের প্রভাবশালী দুই নেতা সাদেক হোসেন খোকা ও মির্জা আব্বাসের অনুসারীদের সহযোগিতাও পাননি সোহেল। এছাড়া দক্ষিণের মহানগরের প্রভাবশালী আরও কয়েকজনের নেতার ভিড়ে সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তার কথায় কর্মীরা পর্যন্ত সাড়া দেননি।

মহানগর দক্ষিণের ঘুরে দাঁড়াতে না পাড়ার কারণ প্রসঙ্গে কমিটির একাধিক নেতা বলেন, ঘুরে না দাঁড়ানোর পেছনে অনেক কারণ আছে। এক. মহানগরের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস, সাদেক হোসেন খোকা, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সালামের অনুসারীরা মহানগর রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ সোহেলকে মেনে নেননি। দুই. কাজী আবুল বাশারের কারো কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পাননি। তিন. মহানগর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে অর্থের প্রয়োজন হয় কিন্তু এই শীর্ষ দুই নেতা কোথাও কোনো অর্থের যোগান দেননি। চার. নগরীর নেতাকর্মীদের মামলা নিষ্পত্তির কোনো খবর রাখেনি। পাঁচ. থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম বকুলের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ছয়. অনেকগুলো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যির অভিযোগ আছে।

সংগঠনের বেহাল অবস্থার কারণ জানাতে গিয়ে দক্ষিণ কমিটির প্রভাবশালী এক নেতা জানান, মহানগর দক্ষিণের শীর্ষ দুই নেতার কোনো অনুসারী মহানগরে নেই বললেই চলে। নগরীর সুনির্দিষ্ট কোনো আসনে পর্যন্ত তাদের কোনো নেতাকর্মী নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আগ্রহের আসনে নিজদের কর্মী তৈরি করতে অযোগ্য কিছু নেতাকে নেতৃত্বে এনে কমিটি দিয়েও স্বার্থ হাসিল হয়নি। সঙ্গত কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনে কোনো আসন থেকে তাদের মনোনয়ন দেয়নি হাইকমান্ড। এনিয়ে প্রতিবাদ করার মতো কর্মীও তারা পাননি। মোটকথা কর্মীদের কাছে শীর্ষ নেতাদের গ্রহণযোগ্যতা না থাকার কারণেই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি।

\হখোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগর দক্ষিণের অধীনে থাকা ২৪টি থানার মধ্যে একটি কমিটিও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। তবে আংশিক কমিটি করা সম্ভব হয়েছে ১৮টি থানার। ওয়ার্ড কমিটি গঠনও সম্ভব হয়নি বললেই চলে। নগরের দায়িত্বশীল নেতাদের বেশির ভাগই বলছেন, দক্ষিণ শাখা বিএনপির সভাপতি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনপ্রক্রিয়া থমকে গেছে। অনেক নেতার দাবি, এই কমিটির মধ্যে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের রেখে নতুন করে কমিটি করা উচিত।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ শাখা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার বলেন, সভাপতি কারাগারে থাকার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে