logo
শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ২০ চৈত্র ১৪২৫

  তারার মেলা রিপোর্ট   ২৬ মার্চ ২০২০, ০০:০০  

মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধ

মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধ
'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' নাটকের একটি দৃশ্য
অনেক সংগ্রাম আর ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও সিনেমা। সে সময়ে সাংস্কৃতিককর্মীরা নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মুক্তিকামী বাঙালিকে জুগিয়েছিল অদম্য সাহস আর শক্তি দিয়ে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল নাটক। মঞ্চনাটককে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে মঞ্চনাটক একটি আন্দোলন হিসেবে শুরু হয় যুদ্ধপরবর্তী নাট্যাঙ্গনের রথী-মহারথীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতাপরবর্তী নাট্যকাররা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত করে নাটক রচনা শুরু করেন। এ সময়ে নাটকে স্থান পায় মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা, রোমান্টিকতা এমনকি কমেডি। এভাবেই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাটকে একটি বৈপস্নবিক পরিবর্তন আসে মুক্তিযুদ্ধের নাটকের মধ্য দিয়ে।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে অর্ধশতাধিক নাটক রচিত হয়েছে। এসব নাটকে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, পাকদের হাতে নারী ধর্ষণের কাহিনি, ধর্ষিত ও নির্যাতিতদের আর্তনাদ, বাঙালির অকুতোভয় পথচলা আর বীরত্বগাথা। এমনকি রাজাকার, আল বদর, আল শামস তথা পাক নরপশুদের অমানবিক নিষ্ঠুরতার লোমহর্ষক নানা চিত্র। যার অনেক নাটকই এসেছে মঞ্চে। আবার কিছু কিছু নাটক থিয়েটারে আলোর মুখ দেখেনি। মঞ্চের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে নির্মিত হয়েছে বহু পথনাটকও। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মঞ্চায়িত হয় শেখ আকরাম আলী রচিত নাটক 'সংগ্রাম চলবেই' ময়মনসিংহ টাউন হল মাঠে এম এন আলম তোতার নির্দেশনায়। ময়মনসিংহ শত্রম্নমুক্ত হয় ১০ ডিসেম্বর, আর নাটকটি মঞ্চায়িত হয় ১৯৭১-এর ১৮ ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রথম সফল মঞ্চনাটকক 'কিংশুক যে মেরুতে', এটি রচনা করেন আহসান উলস্নাহ। 'সারথী' নাট্যগোষ্ঠী এই নাটকটি মঞ্চায়ন করে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত নাটকগুলোর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য নাটকের নাম 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়'। সৈয়দ শামসুল হকের এ কাব্য নাটকটি মঞ্চে নিয়ে আসেন নাটকের দল থিয়েটার। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাটকটির সূচনা এবং পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা অর্জন, এই দুই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে নাট্যকার প্রবেশ করেছেন জীবনের মৌল জিজ্ঞাসার অন্তরে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর এমন সাহিত্য-শিল্পমানসম্পন্ন নাটক বা সাহিত্যকর্ম চোখে পড়েছে খুব কমই। এখানে নাট্যকার সফলভাবে ব্যবহার করেছেন উপমা, রূপক, চিত্রকল্প ও প্রতীকীব্যঞ্জনা। নাটকের শেষ দৃশ্যে নাট্যকার আলোর নির্দেশনা দিয়েছেন- যা বিশেষ ইঙ্গিতবাহী। সব শেষে আলো স্থির হয় পতাকার ওপর। এই পতাকার জন্যই যুদ্ধ আর যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়েই এই অমর নাটক। সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরেকটি নাটক 'যুদ্ধ এবং যুদ্ধ'। এই নাটকটির চরিত্র ভিন্ন। যদিও বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু পরিবেশ এবং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ এতে। 'যুদ্ধ এবং যুদ্ধ' শহুরে পরিবেশ এবং 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' গ্রাম্য জীবনভিত্তিক। আগের নাটকে মাতবর নিজের মেয়েকে তুলে দেয় পাকিস্তানিদের হাতে আর এ নাটকে শহিদের স্ত্রী বিয়ে করে রাজাকারকে। ঘৃণার মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনাকে জাগানোর চেষ্টা মূলত এটি। নাগরিক নাট্যাঙ্গন প্রযোজিত সৈয়দ শামসুল হক রচিত 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর', প্রত্যক্ষভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত নাটক। তার উপন্যাস 'নীল দংশন'-এর ওপর ভিত্তি করে এই নাটকটি রচনা করেছেন। সৈয়দ শামসুল হক রচিত 'নুরুলদীনের সারাজীবন' ও এক অর্থে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামেরই নাটক।

মমতাজ উদ্দীন আহমেদ তার 'স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা' 'এবারের সংগ্রাম' 'স্বাধীনতার সংগ্রাম' এবং 'বর্ণচোর' এ সব নাটকে পাকিস্তানি শোষকদের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা তুলে ধরেছেন। 'বর্ণচোর' নাটকে তিনি রাজাকার, আলবদরদের বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র এঁকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবক্ষয়কে কেন্দ্র করে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ রচিত অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটক 'সাতঘাটের কানাকড়ি'। একইভাবে আবদুলস্নাহ আল মামুনের 'তোমরাই', 'দ্যাশের মানুষ' ও 'বিবিসাব' মূলত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। তিনি নাটকে বিপথগামী তরুণদের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের বিরুদ্ধে সচেতন মানুষের আরেকটি সংগ্রামের আহ্বান করেছেন। তার নাটকের বিষয়বস্তু এখনও দর্শককে উদ্বুদ্ধ করে। এদিকে মামুনুর রশীদের 'সমতট' ও 'জয়জয়ন্তী'তে মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎকালীন প্রেক্ষাপটের চিত্র আছে তবে পরিপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক বলা যাবে না। তিনি নাটকে শ্রেণি বৈষম্যের কথা বলতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন '৭১ পরবর্তী জনজীবনে নানাবিধ ঘটনা, বামপন্থি কোনো রাজনৈতিক ভাবধারার ইঙ্গিত এতে আছে। আরণ্যক প্রযোজনা করেছে তার নাটকগুলো। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ রচিত 'একাত্তরের পারা' একটি পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক। বিষয় বস্তুগত দিক দিয়ে এটি জনগণকে সচেতন করার জন্য যথেষ্ট। তার আরেকটি নাটক 'ঘুম নেই'। এতে তিনি শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বর্ণনা দিয়েছেন, শহিদদের জাগিয়ে তোলার কথাই বলেছেন। নাটকটি প্রযোজনা করেছে 'মহাকাল'।

গোলাম সরোয়ারের 'ক্ষেতমজুর খইমুদ্দিন' নাটকে ঘুরেফিরে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। খইমুদ্দিন সহজ সরল মানুষ, স্বাধীনতার অর্থ পুরোপুরি জানে না, তবে বুঝতে পারে এতে সবার মুক্তি হবে। তাই সে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাবতে থাকে, ফলে তাকে শান্তি কমিটির হাতে প্রাণ দিতে হয়। এ নাটকটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং পরে পদাতিক নাট্যসংসদ প্রযোজনা করেছে। একই সংগঠন মঞ্চে এনেছে এস এম সোলায়মান রচিত 'এই দেশে এই বেশে'। এ ছাড়াও নাট্যকার সেলিম আল দীন, আবদুলস্নাহ হেল মাহমুদ, মান্নান হীরা, মাসুম রেজা একাধিক প্রতিবাদী নাটক লিখেছেন যেসব নাটকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিভাত হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

শহিদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান তার ছোটগল্প 'সময়ের প্রয়োজনে' তুলে ধরেছেন একটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের নানা ইতিহাস। '৭১-এর সেই উত্তাল সময়ের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের ঘটে যাওয়া নানা বিষয় অবলম্বনে মোহাম্মদ বারীর নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় 'সময়ের প্রয়োজনে' নাটকটি মঞ্চায়ন করেছে নাটকের দল থিয়েটার আর্ট ইউনিট।

নাট্যকার মোহাম্মদ বারী 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা 'সময়ের প্রয়োজনে' নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সেই সোনালি সময় নাটকটিতে স্থান দেয়া হয়েছে।'

দেশের গৌরবময় ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি নিয়ে নির্মিত, মোমেনা চৌধুরীর একক অভিনীত 'লাল জমিন' নাটক। মান্নান হীরার রচনায় নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন সুদীপ চক্রবর্তী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে 'লাল জমিন' নাটকের কাহিনি। অসাধারণ অভিনয়শৈলী দিয়ে মোমেনা চৌধুরী নাটকটিকে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় পৌঁছে দিয়েছেন। তার বাচিক ও আঙ্গিক অভিনয় মক্তিযুদ্ধের দৃশ্যগুলোকে বর্ণিল ও বাস্তবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের নাটক নিয়ে নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, 'সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ওইভাবে কোনো মঞ্চনাটকক হয়নি। তবে আহসান উলস্নাহর 'কিংশুক যে মেরুতে', সৈয়দ শামছুল হকের 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়', 'নুরুলদীনের সারাজীবন' নাটকগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মঞ্চের প্রথম দিকের প্রযোজনা ও সফল মঞ্চনাটকক। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু নাটক নির্মিত হয়েছে, যেগুলো মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে