logo
বুধবার ২৬ জুন, ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

  তারার মেলা রিপোর্ট   ২৩ মে ২০১৯, ০০:০০  

নজরুলসংগীত অনেক কারুকার্যময়

নজরুলসংগীত অনেক কারুকার্যময়
শাহীন সামাদ
বিশিষ্ট নজরুলসংগীত শিল্পী ও একাত্তরে রণাঙ্গনের কণ্ঠযোদ্ধা শাহীন সামাদ। ইতোমধ্যে তিনি সংগীত জীবনের ৫৮ বছর পার করে ফেলেছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গায়িকা। শাহীন সামাদ দীর্ঘকাল ধরে জড়িত আছেন ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের সঙ্গে। নজরুলের গান তার অন্যতম পছন্দের হলেও রজনীকান্ত সেন, ডি এল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রবীন্দ্রসংগীত, বাউলগান, ভজন ও গণসংগীতও গাইতে ভালোবাসতেন তিনি। আগামী ২৫ মে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মজয়ন্তী। নজরুলের গানের এই কিংবদন্তি শিল্পী নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুলসংগীত শেখার প্রবণতা এবং শুদ্ধভাবে তা গাওয়ার চর্চাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন, জানালেন নজরুলের গানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার নানান কথাও।

শাহীন সামাদ বলেন, 'আমাদের সময়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নজরুলসংগীত যারা গায় তাদের মূল পার্থক্য হলো সাধনায়। নজরুলসংগীত গাওয়ার জন্য অনেক সাধনার দরকার হয়। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি অনুযোগ প্রকাশ করে শাহীন সামাদ বলেন, সত্যিই নজরুলকে ভালোবাসলে তার গান গাওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের সাধনার দরকার। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই সাধনা করার প্রবণতা কম। যারা নজরুলসংগীত গায় তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তারা যেন এর জন্য কঠোর সাধনা করে। তবে আশার কথাও শোনান তিনি। বলেন, 'অনেক নতুন ছাত্রছাত্রী নজরুলসংগীত শিখছে। নজরুলসংগীত অনেক কারুকার্যময়, শেখাটা আসলে অনেক কঠিন। এ জন্য আগে ছাত্রছাত্রী কম আসতো। তবে এখন অনেকেই আসছে। তারা অনেক সুন্দর গাইছে।' নজরুলসংগীতের সুরের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের গায়কদের মধ্যে কোনো বিচু্যতি লক্ষ্য করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে শাহীন সামাদ বলেন, 'আমাদের সময়ে আমরা স্বরলিপি পেতাম। সে অনুযায়ী নজরুলসংগীত শিখতাম। সাত আট বছর ধরে নজরুল ইনস্টিটিউটে স্বরলিপি করছে। তারা তিন হাজারের মতো সংগীতের স্বরলিপি করেছে। যারা নজরুলসংগীত শেখাচ্ছেন তারা যেন এই স্বরলিপি সংগ্রহ করে তা শেখান। তা ছাড়া বিভিন্ন জেলায় নজরুলসংগীত গাওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উচ্চারণের একটা সমস্যা দেখা যায় উলেস্নখ করে তিনি বলেন, এগুলো ঠিক করে নিতে হবে।'

এবার আসা যাক নজরুলসংগীতের প্রতি নিয়ে আপনার ভালোবাসা প্রসঙ্গে। নজরুলসংগীতের প্রতি ভালোলাগা কীভাবে? উত্তরে শাহীন সামাদ জানালেন, ১৪ বছর ধরেই ছায়ানটের সঙ্গে আছেন তিনি। তখন এত চ্যানেল ছিল না। বাংলাদেশ বেতারে সকালে নজরুল সঙ্গীতের অনুষ্ঠান হতো। শুনে ভালো লাগত। এত সুরের বৈচিত্র্য, সুক্ষ্ন সুরের কাজ আমাকে খুব টানত। সেই ভালো লাগা থেকেই নজরুলসঙ্গীতের সঙ্গে পথচলা। তবে পরে তিনি গজল, গণসংগীত, আধুনিক গান, সভাসংগীত, কাব্য গীতি, দেশাত্মবোধক গান সবই শিখেছেন।

নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নজরুলসংগীতের প্রতি আগ্রহ নিয়ে শাহীন সামাদ বলেন, 'এখনকার ছেলেমেয়েরা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে খুব বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কিছুদিন নজরুলসংগীত শুরু করলে কেউ বলে তাকে দিয়ে ফোক গান ভালো হবে, কেউ বলে সে আধুনিক গানে ভালো করবে। ফলে নিজেদের মধ্যে সে আগ্রহ থাকে না। তারা দ্বিধান্বিত হয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে তাদের পথচলার রাস্তা অনেক ভাগ হয়ে যায়। তাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তবে এখনকার ছেলেমেয়েরা খুব অস্থির হলেও, তাদের মধ্যে মেধা আছে। অনেক বেশি নিজেদের ফোকাস করা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে তারা লক্ষ্যের দিকে তাদের মনোযোগ শূন্য। তবে এর মধ্যে কেউ কেউ আছেন যাদের গায়কি অসাধারণ।'

অনেকেই বলেন, নজরুল চর্চা শুধু বিশেষ দিবসে সীমাবদ্ধ। আপনিও কী তাই মনে করেন? শাহীন সামাদের জবাব, 'আমি বিষয়টিতে একমত নই। সারা বছরই নজরুল চর্চা হয়। প্রায় প্রতিটা চ্যানেলেই সকাল বা সন্ধ্যায় নজরুলের গানের অনুষ্ঠান হয়। এটি চর্চা না থাকলে সম্ভব না। আমরা এখনও গান করি। চর্চা হচ্ছে বলেই করতে পারি। তাই আমার কাছে মনে হয়, শুধু বিশেষ দিনগুলোতেই নজরুল চর্চার সীমাবদ্ধতা নেই।'

নজরুলসংগীত শিক্ষার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতেও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। আমাদের দেশে সেটা একেবারেই অপ্রতুল। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, 'অবশ্যই একজন শিল্পীকে গড়ে তোলার পেছনে একটি প্রতিষ্ঠান অনেক বড় ভূমিকা রাখে। আমি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে পারব না, তবে ছায়ানটের কথা বলতে পারি। আমাদের দেশের যত বড় প্রতিষ্ঠিত নজরুলসংগীত শিল্পী আছেন তারা সবাই ছায়ানটের ছাত্রছাত্রী। এখানে একজন শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে গানের পাশাপাশি সব ধরনের শিক্ষা দেয়া হয়।'

তিনি আরও বলেন, আরও বেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত। তবে মানসম্মত প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হলে সব নিয়ম-কানুন মেনে শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সব বিষয়ে মতামত নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান চালানো উচিত বলে আমি মনে করি।'

পাঠককে জানিয়ে দিতে চাই, শাহীন সামাদ দীর্ঘকাল ধরে জড়িত আছেন ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের সঙ্গে। ১৯৫২ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন শাহীন সামাদ। তিনি গানের তালিম নিয়েছেন রাম গোপাল, ফজলুল হক মিয়া, সানজিদা খাতুন ও ফুল মোহাম্মদের কাছে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ছায়ানটে গানচর্চা শুরু করেন তিনি। এরপর লন্ডনে চলে যান। সেখান থেকে ফিরে বরেণ্য সংগীতজ্ঞ সুধীন দাশের তত্ত্বাবধানে গান শেখা শুরু করেন তিনি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। পরে নজরুলসংগীত, শাস্ত্রীয়সংগীত, দেশাত্মবোধকসহ সংগীতের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই শিল্পী হিসেবে নিজেকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে