logo
মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬

  পাবর্ণী দাস   ২১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

টেলিযোগাযোগের উন্নয়নে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

টেলিযোগাযোগের উন্নয়নে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে দীঘির্দন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে
বাংলাদেশে বেসরকারি মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়াকর্ দেশব্যাপী বিস্তৃত রয়েছে। চিকিৎসাসেবার দিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান তেমন ভালো নয়, চিকিৎসকের সংখ্যাও কম যার কারণে গ্রামের দরিদ্র লোকজনের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা যাচ্ছে না। তাই গ্রামাঞ্চলে উন্নত সেবা পেঁৗছে দিতে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের সব সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালকে একটি কেন্দ্রীয় কম্পিউটার নেটওয়াকের্র আওতায় আনতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্যাথলজি, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় ডাটাবেজ কম্পিউটার দ্বারা সংগৃহীত রাখা হয়। আমরা এ ডাটাগুলো একটি সাভাের্র জমা রাখতে পারি যাতে প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যে কোনো স্থানে বসেই রোগীর ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। এতে যে কোনো রোগী তার চাহিদামতো উন্নত সেবা পাবেন। মোট কথা, আমাদের স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। থ্রিজি প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেলিমেডিসিন ও কম্পিউটারাইজড হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি তৈরি করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান অনেক উন্নত হতে পারে।

দেশের কল্যাণে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ইতিবাচক পরিবতের্নর মাধ্যমে সুষম আথর্-সামাজিক উন্নয়নে দেশীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রচার চালাচ্ছে বেশ ব্যাপকভাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একীভ‚ত হয়ে দেশে প্রযুক্তি খাতে বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতেও কাজ করে যাচ্ছে। অথার্ৎ দক্ষ জনগোষ্ঠী এবং সচেতন নাগরিক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক পরিবতর্ন আনতে চায় বতর্মান সরকার। পরপর দুবার ক্ষমতায় এসে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় এ সরকার দেখাচ্ছে তাতে অনেক পরিকল্পনা আছে ঠিকই, কিন্তু সঠিক বাস্তবায়ন নেই। এটা তার পূবর্বতীর্ সরকারের ক্ষেত্রেও একইভাবে সত্য। অথচ জনগণের প্রত্যাশা বরাবরই ছিল পরিমিত। তাও সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এমনকি বেসরকারি উদ্যোগগুলোকেও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়নি। এ জন্য দেশের বাইরে থেকে উদ্যোক্তা আনার দিকে ঝুঁকেছে তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অনেক প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী বাঙালিরা এগিয়ে এলে ভালো। তবে বিদেশিরা এলে শতর্গুলো ভালোভাবে বিবেচনা করা দরকার। কারণ দেশের অথর্নীতি সচল ও স্বয়ংসম্পূণর্ রাখা বেশি জরুরি। আর সময়ের দাবী ফোরজি প্রযুক্তির সম্প্রসারণেরও কাজ করে যেতে হবে।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং যুগোপযোগী প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বিগত পঁাচ বছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ যথোপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের নীতি নিধার্রণীতে অসাধারণ দক্ষতা অজর্ন করেছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে একটি দেশের সরকারি কমর্কতাের্দর প্রশিক্ষণ দিয়ে নেতৃত্বদানের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অবস্থার অগ্রগতি আনা সম্ভব। এ চিন্তা থেকে জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের আইসিটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (ইউএন-এপিসিআইসিটি) ‘একাডেমি অব আইসিটি এসেনশিয়ালস ফর গভনের্মন্ট লিডারস’ প্রোগ্রাম চালু করে। বিশ্বের অনেক দেশেই আইসিটি প্রশিক্ষণবিষয়ক প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি গত দশকের একটি উল্লেখযোগ্য অজর্ন।

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) সহযোগিতায় ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে দীঘির্দন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, আইসিটি বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম খান, বিসিসির কাযির্নবার্হী পরিচালক এস এম আশফাক হুসাইন সম্প্রতি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য থেকে একটি আভাস পাওয়া যায় তা হলো গত ৪৪ বছরে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বেশ উন্নতি হয়েছে এবং পরবতীর্ এক দশকে আরো চমক অপেক্ষা করছে।

লিঙ্কেজ বিটুইন আইসিটি অ্যাপ্লিকেশনস অ্যান্ড মিনিংফুল ডেভেলপমেন্ট, ই-গভনের্মন্ট অ্যাপ্লিকেশনস এবং ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রাইভেসি এ তিনটি একাডেমিক মডিউল মাথায় রেখে গত পঁাচ বছরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে কাযর্ক্রম চলছে তা বিগত সময়ের গবেষণার ফল, এটা বলাই বাহুল্য।

সফটএক্সপো, ই-গভনর্্যান্স প্রদশর্নী, মোবাইল ইনোভেশন এক্সপো, ই-কমাসর্ জোন, বিপিও ফোরাম, ডেভেলপারস ফোরাম, আউটসোসির্ং ফোরাম প্রভৃতি বিষয় বিভিন্ন সময় যে তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত মেলা হয় সেগুলোয় থাকে। এগুলো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জনগণকে সচেতন করতে ভ‚মিকা রাখছে। এখানে একটি গুরুত্বপূণর্ বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, তথ্য ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ডিজিটাল দেশ গঠনের লক্ষ্যে তৈরি করা প্রায় ২৫ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট (ন্যাশনাল পোটার্ল) যে কোনো সময় চালু করা হবে।

ন্যাশনাল পোটাের্লর এসব সাইটে জনগণের সেবা ও তথ্য সমৃদ্ধ করার কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনের পরই এ সেবা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাযার্লয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রকল্প একসেস টু ইনফরমেশনের (এটুআই) আওতায় তৈরি হয়েছে এসব ওয়েবসাইট। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রাকৃতিক সৌন্দযর্, পুরাকীতির্, ঐতিহাসিক স্থানগুলোর ৪ লাখের বেশি ছবি সংযোজন করা হয়েছে এগুলোয়।

১৫ লাখের বেশি কনটেন্টে ন্যাশনাল পোটাের্ল তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ও কমর্কতাের্দর তালিকা উন্মুক্ত করা হচ্ছে। রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ ও পে-কমিশনের তথ্যও। এ অজর্ন আসলে এক দিনে হয়নি। দীঘির্দনের পরিকল্পনার ফল এটি।

এ পোটার্ল থেকে জনগণ অনলাইন সেবার প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য যে কোনো স্থান থেকে সাচর্ করে নিতে পারবে। এ জন্য তাকে কোনো ফি দিতে হবে না। সরকারের সব ধরনের সেবা কাযর্ক্রমকে ডিজিটালাইজেশন করতে তৈরি করা হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইট।

ন্যাশনাল পোটার্ল বাস্তবায়নের জন্য ঈড়হঃবহঃ এঁরফবষরহব, ঞৎধরহরহম এঁরফবষরহব ও ঠরফবড় এঁরফবষরহব তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য জেলা প্রশাসক, উপজেলা নিবার্হী কমর্কতার্, সহকারী কমিশনার (আইসিটি) ও সকল পযাের্য়র সরকারি কমর্কতার্, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশন ওয়াকর্শপ করা হয়।

ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র, উদ্যোক্তা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, সহকারী কমিশনার (আইসিটি), উপজেলা নিবার্হী কমর্কতার্ ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, জেলা-উপজেলা পযাের্য়র সব অফিস প্রধান এ পোটাের্লর বিশাল কমর্যজ্ঞের অংশীদার।

একই প্ল্যাটফমের্ ৫ হাজারের বেশি ডোমেইনে রয়েছে সরকারি অফিসের ওয়েবসাইট। সরকারি দফতরের সেবা দিতে প্রায় ৫০ হাজার কমর্কতার্-কমর্চারীকে ইউনিকোড, ফটো এডিটিং, ইন্টারনেট আপলোড, ডাউনলোড, পিডিএফ সম্পাদনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

ন্যাশনাল পোটার্লকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য বিসিএস প্রশাসন একাডেমি ও এনআই এলজি কোসর্ গাইডলাইনে অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে। মাঠ পযাের্য় যোগদানকৃত কমর্কতাের্দর প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তত্ত¡াবধানে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ও বেসিসের সহায়তায় এক বছরের বেশি সময়ে এ পোটার্ল তৈরি করা হয়েছে। জেলা পযাের্য় প্রদত্ত সেবাগুলোর লিংক উপজেলা ও ইউনিয়ন পযাের্য়র পোটাের্লর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। জনগণের কাক্সিক্ষত সেবা হাতের নাগালে পেঁৗছে দেয়াই এর একমাত্র লক্ষ্য। এ অগ্রগতি গত এক দশকের তথ্যপ্রযযুক্তি খাতে উন্নয়নের ফল।

সহজ কথায় বলতে গেলে, টেলিকমিউনিকেশন বা মোবাইল কমিউনিকেশনের একটি অত্যাধুনিক সংস্করণ এবং একই প্রযুক্তির মধ্যে জিএসএম, ইডিজিই, ইউএমটিএস ও সিডিএমএ-২০০ প্রযুক্তি অন্তভুর্ক্ত।

যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, রিয়েল টাইম রেসপন্স এবং প্রক্রিয়াগত দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য খাতের উন্নয়ন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ইউনিয়ন পযার্য় পযর্ন্ত আইসিটি সুবিধা সম্প্রসারণ, পল্লীবাংলায় বিভিন্ন আইসিটি সাভির্স প্রদানের মাধ্যমে মেধা, কমর্সংস্থান তৈরি এবং দারিদ্র্য উপশম করা, অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে ৩ হাজার ৫০০ ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের নিজ নিজ উপজেলার সংযোগ স্থাপন, লক্ষাধিক ওয়াইফাই হটস্পট তৈরি করা প্রভৃতি কাযর্ক্রমের মধ্য দিয়ে পুরনো গবেষণাকে বাস্তবে প্রতিফলিত করতে সরকার সচেষ্ট।

আমরা কী চাই, তা জানার আগে আমাদের আগে যেতে হবে গত ৪৪ বছরে আমরা কী পেয়েছি। আর এ চাওয়া নিধার্রণ করে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে পারলে ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম যুক্ত হবে। অথার্ৎ অতীতের যে অজর্ন তাকে কাজে লাগিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মোস্তাফা জব্বারের বিজয় সফটওয়্যারের মতো বিশেষ অজর্নগুলোকে মূল্যায়ন করে নতুন নতুন অজের্নর দিকে ধাবিত হতে হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে