logo
বুধবার ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৫ পৌষ ১৪২৫

  পাবর্নী দাস   ০৬ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০  

জলবায়ু পরিবতর্ন ও পরিবেশ

জলবায়ু পরিবতর্ন ও পরিবেশ
সব ধরনের জীবন ও জীবিকা জীববৈচিত্র্যের ওপর নিভর্রশীল। বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী কৃষি ও মৎস্যজীবী। জলবায়ু পরিবতের্নর ফলে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটছে যা মৎস্য প্রজাতির হ্রাস ও বিলুপ্তি ঘটাচ্ছে। জলবায়ু পরিবতর্নজনিত কারণে অতিথি পাখিদের আগমনের সময় ও পারিপাশির্¦ক অবস্থা পরিবতির্ত হওয়ার ফলে অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবতর্ন নিয়ে গবেষণা এখন সময়ের দাবী।বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে সিডর, নাগির্স, বিজলি ও আইলায় বিধ্বস্ত উপক‚ল এর পরিবেশ। পরিবেশের এ বিরূপ আচরণের জন্য শঙ্কিত দেশবাসী। আজ ষড়ঋতুর অস্তিত্ব অনুভব ভাগ্যের ব্যাপার। জলবায়ু পরিবতের্নর সবচেয়ে বেশি শিকার উপক‚লবাসী এবং কৃষিজীবীরা। বন্যা, খরা অতি বৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুযোের্গ প্রতিবছর ব্যাপক ফসলখানির ঘটনা ঘটে। ফলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মধ্যে রয়েছে। অথচ প্রাচীনকাল থেকে আমাদের এদেশ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ। এখানে ২৬৬ প্রজাতির অভ্যন্তরীণ মৎস্য, ৪৪২ প্রজাতির সামুদ্রিক মৎস্য, ২২ প্রজাতির উভচর, ১২৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩৮৮ প্রজাতির স্থানীয় পাখি, ২৪০ প্রজাতির অতিথি পাখি, ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং ৫০০০-এর অধিক উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। এদেশে বিভিন্ন ধরনের বনভূমি রয়েছে। পত্রঝরা বনাঞ্চল, চিরহরিৎ বনাঞ্চল ও প্যারাবন বা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এদেশে অবস্থিত। আমাদের এদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এদেশে অসংখ্য নদীনালা, খালবিল, হাওর-বাওর ইতাদি বিভিন্ন জলবৈচিত্রসমৃদ্ধ।

উত্তরাঞ্চলে অত্যধিক কুয়াশার কারণে আম ও অন্যান্য ফসলের মুকুল নষ্ট হচ্ছে এবং সামগ্রিক উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পরিবতির্ত আবহাওয়া পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক দুযোর্গ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যার পর গ্রামাঞ্চলের অনেক গতর্বাসী জীববৈচিত্র্যের সংখ্যা কমে গেছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণের দ্বীপ সমূহ ও সুন্দরবনের ২০ শতাংশ পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণী ও উদ্ভিত প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ ভূমি খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং কৃষি প্রতিবেশ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অংশে দেখা যায়। কৃষি প্রতিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবতের্নর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, বিস্তৃৃত ও বৈচিত্র্যময়। দ্রæত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে কৃষিতে সনাতনী পদ্ধতির পরিবতের্ আধুনিক পদ্ধতি চালু হয়েছে। ১২,০০০ বছর আগে যখন থেকে কৃষিকাজ শুরু হয়েছে তখন থেকে খাদ্যের জন্য প্রায় ৭০০০ উদ্ভিদ প্রজাতি চাষ করা হচ্ছে। এমনকি আজকের মাত্র ১৫টির মতো উদ্ভিদ ও ৮টি প্রাণী প্রজাতি আমাদের খাদ্যের ৯০ শতাংশ সরবরাহ করে। এসব আধুনিক শস্যতে বিভিন্ন গুণাগুণ সংযোজন করা হয়েছে এর বন্য প্রজাতি থেকে। এর ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

খাদ্যশস্যের বন্য প্রজাতিগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিপূরণের কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয় কারণ নতুন প্রজাতি উৎপাদনে কেবল এগুলো ব্যবহৃত হতে পারে যা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারে। দুভার্গ্যবশত খাদ্যশস্যের অনেক বন্য জাত হুমকির মুখে। ধারণা করা হয় যে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমস্ত আলুর প্রজাতির এক চতুথার্ংশ বিলুপ্ত হয়ে যাবে যা ভবিষ্যতে নতুন জাত উদ্ভাবনে কঠিন হয়ে দঁাড়াবে। এসব খাদ্যশস্যের বাণিজ্যিক জাত পরিবতির্ত জলবায়ু পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারে না।

পৃথিবীর মোট স্থলভাগের এক-তৃতীয়াংশই বনভূমি। স্থলজ জীববৈচিত্র্যের দুই-তৃতীয়াংশই বনভ‚মিতে বাস করে। ৮০০০ বছরে পৃথিবীর প্রায় ৪৫ ভাগ বনভ‚মি ধ্বংস বা পরিবতির্ত হয়ে গেছে। বন প্রচুর সম্পদ ও সেবা প্রদান করে থাকে। বনে বসবাসকারী অধিকাংশ বড় প্রাণী, নরবানরের অধের্ক অংশ, প্রাণী ও জানা উদ্ভিদ প্রজাতির ৯ ভাগ বিলুপ্তির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বড় উদ্ভিদ অভিযোজন বা বিস্তৃৃত হওয়ার কোনো সামথর্্য নেই।

জলবায়ু পরিবতর্ন প্রজাতির স্বাভাবিক অভিপ্রয়াণ ও বিস্তৃৃতিকে অনেক মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রেই যা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় থাকে না এবং প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। রোগ-বালাই, আগুন, অনুপ্রবেশকারী প্রজাতি ইত্যাদির মাত্রাও জলবায়ু পরিবতের্নর ফলে বাড়তে পারে। স্থলজ উদ্ভিদকুলের কাবের্নর ৮০ ভাগ সঞ্চিত আছে বনে। বন ধ্বংস, বনভ‚মি পরিষ্কার করা ইত্যাদির ফলে প্রতিবছর ১.৭ বিলিয়ন মেট্রিক টন কাবর্ন বায়ুমÐলে যোগ হচ্ছে।

ভবিষ্যতে কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য শস্য ও পশুসম্পদের ইন সিটু এবং একস সিটু সংরক্ষণ খুব গুরুত্বপূণর্। কৃষি জীববৈচিত্র্যের ইন সিটু সংরক্ষণ করতে বোঝায় কৃষক দ্বারা বিভিন্ন শস্যের উৎপত্তিস্থলে তাদের ব্যবস্থাপনা। এটা শস্যের নিজস্ব পরিবেশে তাদের বিবতর্ন ও অভিযোজনকে সমথর্ন করে। একস-সিটু সংরক্ষণ বলতে প্রজাতি সমূহের তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে সংরক্ষণ করাকে বোঝায়। যেমন শস্য ব্যাংক ও চিড়িয়াখানা। কৃষি প্রতিবেশের বিভিন্ন উপাদান পণ্য এবং সেবা দিয়ে থাকে। যেমন- প্রাকৃতিক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ, পরাগায়ন এবং বীজের বিস্তার। পৃথিবীর শস্য উৎপাদনের ৩৫ ভাগ পরাগায়নের জন্য মৌমাছি, পাখি, বাদুড় ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণী এর ওপর নিভর্রশীল।

পরিবতির্ত আবহাওয়া পরিস্থিতিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অভিযোজনে সহায়তা করতে পারে। জীববৈচিত্র্যের আবাসভ‚মি নিরবচ্ছিন্ন রাখা। স্থানীয় জাতগুলো চাষাবাদে উৎসাহিত করা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। লবণাক্ত এলাকায় সহনীয় ধান বা শস্যের উদ্ভাবন ও আবাদের প্রসার ঘটানো। যেসব ফসল স্বল্প সময়ে বন্যার আগে তুলে ফেলা সম্ভব সেগুলো বেশি করে চাষাবাদ করা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে কচুরিপানার ভাসমান ধাপে সবজি ও বীজতলায় চাষাবাদ বাড়াতে হবে যার ফলে আগাম বন্যা ও অন্যান্য দুযোর্গ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। স্থানীয় প্রজাতির বনায়ন, কৃষি জমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সার ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো ও পতিত কৃষি জমির পুনঃসংস্কার করতে হবে। মিথেন গ্যাসের নিগর্মন কমানোর জন্য ধান চাষ পদ্ধতির উন্নতি করতে হবে। কাবর্ন শোষণের ব্যাপারেও কৃষি জমির একটি ভূমিকা রয়েছে। উন্নত ব্যবস্থাপনা কৃষি জমিতে কাবর্ন শোষণের মাত্রা বাড়াতে পারে। এজন্য শস্যের বজর্্য ব্যবহার করা উচিত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষককে আগাম দুযোর্গ তথ্য ও দুযোর্গ হ্রাসের পদ্ধতি জানাতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও পরিবেশের বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখার জন্য জৈব কৃষির প্রসার ঘটাতে হবে। জৈব কৃষির আদশর্ হিসেবে কিউবা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর কৃষি ব্যবস্থাকে অনুসরণ করা যেতে পারে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে