logo
  • Thu, 18 Oct, 2018

  মাসুমা রুমা   ২৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

গৃ হ ক মীর্ নি যার্ ত ন

প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতাবোধের অভাব

নিজেকে মানুষ দাবি করার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এ লজ্জা কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়। সমগ্র জাতির, সমগ্র দেশের। মানুষকে মানুষ ভাবার মানসিকতা লোপ পাচ্ছে আমাদের ভেতর। গৃহকমীের্দর ওপর এমন অমানবিক নিযার্তন দেখে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারেÑ গৃহকমীর্রা কি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা?

প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতাবোধের অভাব
সম্প্রতি আমাদের দেশে যে সমস্যাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার মধ্যে গৃহকমীর্ নারী বা শিশু নিযার্তন অন্যতম। বিষয়টি যে কোনো সচেতন ব্যক্তিরই নজর কাড়বে। আধুনিক পৃথিবীতে এমন ববর্র নিযার্তন কমর্কাÐ রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে আমাদের। গা শিউরে উঠছে যখন তখন। কোথায় আছি আমরা? নিজেকে মানুষ দাবি করার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এ লজ্জা কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়। সমগ্র জাতির, সমগ্র দেশের। মানুষকে মানুষ ভাবার মানসিকতা লোপ পাচ্ছে আমাদের ভেতর। গৃহকমীের্দর ওপর এমন অমানবিক নিযার্তন দেখে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারেÑ গৃহকমীর্রা কি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা? আজকের লেখায় গৃহকমীের্দর নিযার্তন সংশ্লিষ্ট নানামুখী সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান দিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

গৃহকমীের্দর নিয়ে কমর্রত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিস বিলসের পরিসংখ্যান মতে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পযর্ন্ত সারাদেশে কমর্স্থলে শারীরিক নিযার্তনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪১ গৃহকমীর্। হাসপাতালে যেতে হয়েছে ৪১৩ জনকে। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৮৭ জন। আর ১৪ মাসে নিযাির্তত ১৫৬ জনের ৯০ ভাগই কিশোরী ও শিশু। দিন দিন নিযার্তনের মাত্রা আর নিযাির্ততদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চলতি বছরে তা যেন অতীতের সব রেকডের্ক ছাপিয়ে গেছে। ২০১০ সালে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের করা জরিপের তথ্যানুযায়ী, ওই সময় শুধু রাজধানীতেই গৃহকমীর্র সংখ্যা ছিল ২০ লাখ। এরপর কোনো পরিসংখ্যান করা না হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বতর্মানে সারা দেশে অন্তত ৪০ লাখ দরিদ্র মানুষ গৃহকমীর্ হিসেবে কমর্রত। উদ্বেগজনক হলেও সত্যি, তাদের মধ্যে অন্তত ৫ লাখ শিশুও রয়েছে। যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গৃহকমীর্র কাজে নিয়োজিত।

সাবিনা আক্তার, বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। বয়স ১১ বছর। ছয় মাস ধরে মিরপুর ডিওএইচএসে লেফটেন্যান্ট কনের্ল তসলিম আহসানের বাসায় কাজ করছিল সাবিনা। সাবিনাকে প্রায়ই মারধর করতেন গৃহকত্রীর্ আয়েশা লতিফ। এক পযাের্য় মারধর করে তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। মেয়েটির শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এ বিষয়ে মামলা করা হয়। মামলা হওয়ার পর তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা সিএমএইচে নেয়া হয়। এই ঘটনাটিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? একটি শিক্ষিত, সমাজের উচ্চপদস্থ পরিবারের নিকট যদি গৃহকমীর্রা এমন দুভোের্গর শিকার হয়, তাহলে বাকিদের কাছে আমরা কী আশা করতে পারি? কতটা নিরাপত্তা বা প্রত্যাশা করতে পারি দরিদ্র, অসহায় গৃহকমীের্দর জন্য? যারা দু’মুঠো ভাতের আশায় পরিবার ছেড়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে চলেছে, ঝুঁকিপূণর্ ও অনিরাপদ কাজ করে চলেছে হরহামেশাই। আমাদের বিবেকবোধকে জাগ্রত করা আবশ্যক।

২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারা ও ডিওএইচএস তেলের ডিপোর মাঝামাঝি রেললাইন সংলগ্ন একটি ডাস্টবিনের পাশ থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় কঙ্কালসার ও মৃতপ্রায় গৃহকমীর্ আদুরিকে। উদ্ধারের সময় তার শরীরে অসংখ্য নিযার্তনের চিহ্ন ছিল। মারধর, গরম খুন্তি ও ইস্ত্রির ছ্যঁাকা, বেøড দিয়ে শরীরে আঘাত, মাথায় কোপ, খেতে না দেওয়া- কিছুই বাদ যায়নি নিযার্তনের তালিকা থেকে। চার বছরের ব্যবধানে আদুরির শারীরিক কাঠামো পরিবতর্ন হলেও নিযার্তনের ক্ষতচিহ্নগুলো এখনও রয়ে গেছে।

আদুরি পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠির কৌরাখালী গ্রামের প্রয়াত খালেক মৃধার কনিষ্ঠ মেয়ে। অভাবের সংসারে মা সাফিয়া বেগম দিশেহারা হয়ে নয় সন্তানকেই গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজে দেন। আদুরিকে এক প্রতিবেশীর সহযোগিতায় রাজধানীর পল্লবীতে নওরীন জাহান নদীর বাসায় কাজে দেয়া হয়েছিল। সেখানে নানা অজুহাতে দিনের পর দিন অমানবিক নিযার্তনের শিকার হয় আদুরি। নিযার্তনের একপযাের্য় নদী ও তার মা মৃত ভেবে আদুরিকে ডাস্টবিনে ফেলে দেন। সেখান থেকে দুই নারী কমীর্ অধর্মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন আদুরিকে। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে ভতির্ করা হয়। দেড় মাস চিকিৎসার পর সুস্থ হলে পরিবারের কাছে আদুরিকে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় আদুরির মামা এক বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী নজরুল চৌধুরী বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় নদী ও তার মা ছাড়াও নদীর স্বামী সাইফুল ইসলাম মাসুদ, তাদের আত্মীয় সৈয়দ চুন্নু মীর ও রনিকে আসামি করা হয়।

প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতাবোধের অভাব

দিন দিন শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কমে যাচ্ছে শিক্ষার মান। শিক্ষিত আর সুশিক্ষিত শব্দ দুটির পাথর্ক্য অনুধাবন করতে পারছে না বেশিরভাগ মানুষ। মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে না। গৃহকমীের্দর মানুষের চোখে না দেখে মূলত পশুর চোখে দেখা হচ্ছে। নানান অজুহাতে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নিযার্তন করা হচ্ছে। এসব নিযার্তনের বেশিরভাগই রয়ে যায় অগোচরে। মাঝে মাঝে থলের বিড়াল বেরিয়ে এলে প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। যদিও নিযাির্ততদের সবাই সঠিক বিচার পায় না। আজকাল গৃহকতার্ ও গৃহকত্রীর্রা তাদের নিজেদের সন্তানকে শৈশব থেকে এমনভাবে বেড়ে তোলেন, তাতে তারা দরিদ্র মানুষগুলোকে অনেকটা ঘৃণার চোখে দেখে। মানুষ হিসেবে মযার্দাটুকুও দিতে চায় না। আমরা বরাবরই ভুল পথে হেঁটেছি। এখনো হঁাটছি। আমাদের অধঃপতনগুলো এসব কারণেই ঘটে চলেছে। শিক্ষা মানে শুধু একটা সাটিির্ফকেট অজর্ন নয়। নিজেকে আদশর্ ও প্রকৃত মানুষ করে গড়ে তোলা। পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে এক দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা। সমাজের দরিদ্র, অসহায় মানুষগুলোকে বুকে টেনে নেয়ার মনোবৃত্তি তৈরি করা। অথচ সমাজের বাস্তবচিত্র সম্পূণর্ উলটো। এই উলটো পথ থেকে আমাদের দ্রæত সরে আসতে হবে। নইলে ধ্বংস অনিবাযর্। সেই ধ্বংসলীলার কবল থেকে আমরা কেউ-ই রেহাই পাব না।

মূলত গৃহকমীর্রা আমার আপনার মতোই স্বাভাবিক রক্ত মাংসের মানুষ। নেহাৎ পেটের দায়ে তারা অন্যের বাড়িতে ফাইফরমাশ ঘাটে। তারাও হতে পারতো আমাদের মা, বোন, সন্তান। ভাগ্যের অসহায়ত্ব আজ তাদের এমন পরিস্থিতির শিকার করেছে। একবার নিজেকে তাদের জায়গায় দঁাড় করিয়ে যদি ভেবে দেখি আমরা তাহলে সমস্যা অনেকাংশই লাঘব হবে। দেশে অমানবিক কাজের সংখ্যা কমে যাবে। সুশিক্ষিত লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। নিযার্তন শব্দটি লজ্জায় নিজেই মুখ লুকাবে। সুন্দর একটি আগামীর মুখ দেখবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ থাকবে না। বিশ্বের বুকে আমরা মাথা তুলে দঁাড়াব একদিন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে