logo
বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬

  আহম্মেদ পিন্টু   ০৪ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০  

মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযোদ্ধা
জমির আইল কোপাতে কোপাতে হঠাৎই নেছার উদ্দিনের মনে পড়ে পুরনো কথা। একদিন সে আইলের উপর ফেলে তিন-তিনজনকে কুপিয়েছিল। বসে পড়ে আইলের উপর। স্মৃতির ভারে মাথাটা টলমল করছে। মাজার গামছা খুলে কপালের ঘাম মুছে বিড়ি ধরায়।

১৯৭১ সাল। এপ্রিল মাস। যুদ্ধ চলছে। বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ। নেছার যুদ্ধ প্রশিক্ষণের জন্য ঢুকলো ভারতে। এ গ্রাম ও গ্রাম মিলে তারা মোট তেরো জন এলো। তার পাশের গ্রামের একজন ছিল কমান্ডার। প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যখন তারা ফিরে এলো শত্রম্ন নিধন করতে, ততক্ষণে শত্রম্নরা তাদের অনেকেরই মা-বাবা-ভাইবোনকে খতম করেছে, কাউকে ধর্ষণ করেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।

নেছার উদ্দিনের পরিবারেরও হলো একই হাল। একমাত্র ধর্ষিত বোন ছাড়া কেউই আর জীবিত রইলো না। রাজাকাররা হানাদারদের নিয়ে এসেছিল। লক্ষ্য ছিল নেছার। তারা আন্দাজ করেছিল, নেছার সম্ভবত যুদ্ধে গেছে। ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যই তারা এসেছিল। তারা তার বাবা-মার কাছে জানতে চাইলো, নেছার কোথায়? প্রথমে চায়নি বলতে। তখন তারা হাত বাড়ায় তার বোনের দিকে। তখন মুখ খুলে বাবা।

\হ'শোরের বাচ্চা, তুরকেরোক খতম করার জন্য গেছে।' রাজাকাররা উর্দুতে অনুবাদ করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে এক পশ্চিমা সেনা হাতের কাছে পড়ে থাকা কুড়াল দিয়ে কোপ বসিয়ে দেয় তার বাবার মাথায়। পরের কোপটি তার মায়ের বুকে। তারপর গুলি চালিয়ে সমস্ত দেহ ঝাঁজরা করে মৃতু্য নিশ্চিত করে। এবার তার বোনের পালা। তারা কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করে তাকে। শেষ পর্যন্ত জানে মারে না। একজন রাজাকারের বুদ্ধি বিবেচনায় এনে তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়। হানাদাররা অবশ্য মেরেই ফেলতে চেয়েছিল; কিন্তু সে বলে, স্যার, নেছারও তো মরবে যুদ্ধে। বংশের একজন বেঁচে থাকা দরকার, নইলে গল্প শুনাবে কে পরের বংশধরদের? তারা যে ওই মালাউনদের চক্রান্তে ভুল করেছে এটা তো তাদের জানতে হবে।

হঁ্যা, ঠিক তাই। হানাদাররাও বুঝলো, মেনে নিল।

নেছার আলীর সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, বুকটা চৌচির হয়ে যায় বোনটার জন্য। হোক ধর্ষিত, তবু তো বেঁচে ছিল। কিন্তু তাকে সে রক্ষা করতে পারেনি। যেদিন তার সঙ্গে দেখা হলো সেদিনই রাতে সে মারা গেল। ওই একই রাতে বোনের কাছ থেকে সবকিছু শোনার পর সিদ্ধান্ত নিল, অন্য এক গ্রামে তার পরিচিত একজনের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখবে। বোনের সঙ্গে কথাও ঠিকঠাক ছিল। গভীর রাতে সে এসে নিয়ে যাবে। সে যাওয়ার পরপরই এলো দু'জন রাজাকার। তারা তাকে ভোগ করতে চাইল। সে বাধা দিল। শেষমেশ পা জাড়িয়ে ধরলো। তারা বাধা মানলো না, করুণাও করল না। ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে প্রতিরোধ গড়ে তুললো। কুড়াল দিয়ে কোপ বসিয়ে দিল একজনের গলায়। অর্ধেক পর্যন্ত বসে গেল। পরের বার কোপ তুলতেই ধরে ফেলল আরেকজন। কুড়ালটা কেড়ে নিয়ে তাকে কুপিয়ে সহযোগীকে নিয়ে চলে গেল।

\হনেছার ফেরা অব্দি প্রাণটা ছিল। 'ভাই, আমার আর কুনো দুখ্‌খু নাই- তুর দ্যাকা পানু, তুক মা-বাবাক ম্যারা ফ্যালার কথা বুলবার পারিছি। আমিও একজনাক কুপ দিছি। শোরের বাচ্চার বাঁচার কথা লয়। অ্যাকুন আমার খুব ভালো লাগিচ্ছে।' কথা বলতে বলতে চলে গেল প্রাণটা। এই দৃশ্য সারাক্ষণ তাকে কাঁদায়, ভেতরে পোড়ায়। বোনের দেখা পেয়েও তাকে রক্ষা করতে পারল না- এ কষ্ট, এ জ্বালা, এ যন্ত্রণা সে সহ্য করতে পারে না। বেসামাল হয়ে পড়ে।

তারা তাদের এলাকা শত্রম্নমুক্ত করার জন্য দৃঢ় শপথ নিল। নেছার উদ্দিনের গ্রাম থেকে কিলো পাঁচেক দূরেই হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। এক ভোরবেলা তারা ঠিক করল দিবাগত রাতেই তারা ক্যাম্পেই আক্রমণ চালাবে। কিন্তু ঠিক সেদিন বিকালে তারা সংবাদ পেল, রাতেই একদল হানাদার ঢুকবে বৈতি গ্রামে। সেখানে তারা রাজাকার মুন্সি তৈবর আলীর বাড়িতে ভুঁড়িভোজ করবে, শেষে তাদের মুন্সী দু'জন সুন্দরী বাঙালি নারী উপহার দেবে। বৈতি গ্রামটি তাদের অবস্থান থেকে সাত-আট কিলোমিটার ফাঁকে। তারা সিদ্ধান্ত পাল্টালো, সেখানেই তীব্র আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্তে সবাই স্থির হলো।

হানাদাররা সংখ্যায় মোট আট জন। দুইজন অফিসার, বাকি ছয়জন সৈনিক। অফিসার দুইজন খাওয়ায় মত্ত। সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। ঠিকঠাক পরিকল্পনা মাফিক শুরু হলো অভিযান। প্রথম ধাক্কাতেই তিন জন খালাস হয়ে গেল। বাকি তিন জনও বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। অবস্থা বেগতিক দেখে তৈবর আলী দুইজন অফিসারকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে নেমে এলো বিলের ভেতর। মুন্সীর সহযোগীরা যে যার মতো পালালো। এরা এসে ঘিরে ফেললো তিন জনকে। এখানেও যুদ্ধ চললো কিছু সময়। একটা পর্যায়ে এ তিন জন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। নেছার চিৎকার দিয়ে উঠলো, কেউ গুলি করবু না। আমি আসি। এক দৌড়ে গ্রামের ভেতর এলো। কুড়াল খুঁজতে লাগলো। না, কুড়াল মিললো না। শেষে এক বাড়িতে একটা কোদাল পেল। নিয়ে এলো এক দৌড়ে। তিন জনকে আইলে ফেলে কুপিয়ে মারল।

শরীরের ভেতরটাতে ঝাঁকি মেরে উঠলো। পা দিয়ে সজোরে মাটিতে কয়েকটা আঘাত করল। শোরের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা, কুপাছি, ইচ্ছা মতন কুপাছি! এই বঁ্যাচা থাকা হারামজাদা রাজাকারগুলাক যদি কুপাবার পারননি! খাড়া হয়ে মাজায় গামছা বাঁধে শক্ত করে। রাগের মিছিলে শরীরটা গিজগিজ করছে। এক নাগাড়ে কোপাতে থাকে আইল আর বিড়বিড় করে বলতে থাকে- শালা রাজাকারের বাচ্চারা! কুত্তার বাচ্চারা!

কী নেছু, কাক্‌ গ্যালা গ্যালি করিস?

কোদাল থামে। দাঁড়িয়ে যায়। সামনে হাত পাঁচেক ফাঁকে দাঁড়িয়ে গোলাম জোয়াদ্দার আর লতিফ শাহ্‌।

কী কবেন, কন? আমার কাম আছে। গম্ভীর গলায় বলল নেছার। রাগের প্রতিফলন চোখেমুখে স্পষ্ট।

তে তুই কাক্‌ গ্যালি দিচ্ছু শুনিদিনি?

ওডা জানার দরকার নাই আপনার। কী কবার চান, কন্‌।

এমনিতেই রাগে-তাপে শরীরটা কাঁপছে, তার মাঝে এসে পড়ল আর এক আপদ! এই গোলাম জোয়াদ্দারকে সে একদম সহ্য করতে পারে না। ওই রাজাকার আর এর মাঝে সে কোনো পার্থক্য খুঁজে পায় না। তাই রাগের মাত্রা বেড়ে মাথাটা অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল।

য্যাগ্‌গা! যাক গ্যাল দিচ্ছু দে। তুই বুলে আমার বিরুদ্ধে জোট পাকাচ্ছু? আমি ভুয়া মুক্তিযুদ্ধা, সার্টিফিকেট কিনা লিছি- এগলা কয়া ব্যারাচ্ছু? আবার আমার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানোত কুনো মুক্তিযুদ্ধাক অ্যাসপার দিবু না- কীরে?

ক্যা, মিছা কছি নাকি?

যুদ্ধ না করলে কি সার্টিফিকেট পাওয়া যায় নাকি? অঁ্যা? সার্টিফিকেট কিনা পাওয়া যায়?

মুক্তিযুদ্ধ লিয়া আপনার সাতে কতা কওয়ার উচিত নাই আমার। আপনে যান এটি থ্যাকা।

দ্যাক, তুর সাতে তো আমার কুনো শত্রম্নতা নাই, আমার পাছে লাগুছু কিসোক?

আপনার পাছে লাগিনি। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধা, আমাকেরে মান-ইজ্জত বাঁচাবার চাচ্ছি আমরা। ভালো মানুষ ককুনোই এই কাম করবার পারবে না। আপনার মুতন সুদখুর, পোতারক, মামলাবাজ, ডাকাত, অত্যাচারী ম্যানষের পক্কেই ভুয়া মুক্তিযুদ্ধা সাজা সম্ভব।

খিকখিক করে হেসে উঠে গোলাম।

তুই তো আমাক চিনিসিই নেছু। এমন কুনো কাম নাই আমি করবার পারি না। আরে শুন, ক্ষমতা লিয়া যদি বঁ্যাচা থ্যাকপার না পারিস, ওই বঁ্যাচা থ্যাকা লাভ কী? আমার ম্যালা ক্ষমতা। আমার পাছে লাগিস না। তুই কিন্তু হারায়্যা যাবু। তুই কামলা মানুষ, তুর অ্যাতো ফটফটানি ক্যারে? আবারও খিকখিক করে হেসে উঠলো।

অজগরের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে রাগ মাথায় উঠে এলো নেছারের। সমস্ত রাগ এসে ভর করেছে মাথায়। এখনই একটা কান্ড না ঘটালে রাগ আর থামবে না। মনের মাঝে ব্যাপক তোলপাড়, কোদালটা এখনই বসিয়ে দিবে তার ঘাড় বরাবর। শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলালো, অনেক কষ্টে।

তালে নেছু, যা করুছু করুছু, আর বাড়াবাড়ি করিস না। তুই না য্যাস না যা, অন্য মুক্তিযোদ্ধাকেরোক বাধা দিস না।

না, কুনো মুক্তিযোদ্ধা যাবে না। এডা আমি ঠ্যাকামুই।

তুই মরবুরে নেছু, তুই মরবু। তুর মরার কামড় উটিছে। তুই কিসের মুক্তিযোদ্ধা! কয় পয়সার মুক্তিযোদ্ধা! তুক ম্যারা ফেললে কী হবে! কিচ্ছু হবে না!

একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এত বড় কথা বলবে! মুক্তিযোদ্ধকে হেয় করবে! আর স্থির থাকতে পারল না নেছার। কোদালটা তুললো গোলামের মাথার উপর।

মুক্তিযুদ্ধা লিয়া যুদি তুই আর একটা কতা কোস্‌ তুক এটিই কুবায়্যা মারমু।

ভয় পেয়ে গেল গোলাম। রকমসকম দেখে আর কোনো শব্দ বের করল না। বড় বড় ভয়ার্ত চোখে চেয়ে আছে। লতিফ শেখ তাকে টেনে নিয়ে দ্রম্নত চলে গেল। আবারও বসে পড়ল নেছার। রাগের তোপে অস্থির। ভূমিকম্পের মতো গোটা দেহ কাঁপছে। ক্ষোভের তোড়ে বিড়বিড় করে যাচ্ছে- শোরের বাচ্চা, আমার হাতোতই তুর মরণ আছে! আমার হাতোতই তুই মরবু! হারামজাদা! তুই মুক্তিযোদ্ধাক ম্যাপিস! তুই মরবু! তুই মরবু!

\হগোলাম জোয়াদ্দার আর নেছার আলীর বসবাস একই গ্রামে। ধন-সম্পদ-টাকা-পয়সার বিচারে দু'জনার মাঝে ফারাকটা অনেক বড়ো। নেছার আলী গরীব। কামলা দিয়ে খায়। আর গোলাম জোয়াদ্দার গ্রামের সবচেয়ে ধনী মানুষ। আরেকটা দিকে অবশ্য নেছার আলী আকাশে, আর গোলাম মাটিতে। নেছার আলী ভালো মানুষ হিসেবে পুরো এলাকায় এক নামে পরিচিত। আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তো শ্রদ্ধা-ভালোবাসা গগনচুম্বী। ওদিকে গোলাম সুদখোর, প্রতারক, মামলাবাজ, ডাকাত, অত্যাচারী হিসেবে গোটা এলাকায় তাকে মানুষজন এক নামে চেনে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার বিষয়টিও কারো জানার বাইরে নয়। তবে একমাত্র এই নেছার ছাড়া আর কেউই তার মুখের ওপর তার কু-খ্যাতির কথা উচ্চারণ করতে পারে না। দুই একজন করেছিল বটে কিন্তু চরম বিপদে পড়েছিল। তার অনুগত ক্যাডার বাহিনী দিয়ে প্রথমে পিটিয়েছিল। তারপর থানায় টাকা-পয়সা দিয়ে একটা ডাকাতি কেসে ফাঁসিয়ে কয়েক বছর জেলের ঘানি টানিয়েছিল। এই ভয়ে কেউ আর মুখ খুলে না। সবাই মনে মনে গাল-মন্দ করে, অভিশাপ দেয়। সে নেছারকে এ রকম বিপদে ফেলার কম চেষ্টা করেনি কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠেনি। পাছে কিনা সব মুক্তিযোদ্ধা আবার জোট বেঁধে ক্ষেপে গিয়ে তাকেই বিপদে ফেলে! চ্যালেঞ্জ করে তার সার্টিফিকেটটা বাতিল করে! মূলত এই ভয়ে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গোলাম জোয়াদ্দার গ্রামের কয়েকজন হিন্দু লোকের সঙ্গে ভারতে গিয়েছিল। যুদ্ধের পুরো সময়টা সেখানেই ছিল। দেশ স্বাধীন হলে ফিরে এসে একটা ডাকাত দল গঠন করে। হিন্দুদের বাড়িতে ডাকাতি দেয়। শুধু আশপাশের গ্রামেই নয়, নিজ গ্রামেও সে লুটপাটের তান্ডব চালায়। সেখান থেকেই তার টাকা-পয়সার উত্থান। আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সেই টাকা-পয়সা সুদে বিভিন্ন কারবারিতে খাটিয়ে এখন সে অনেক টাকার মালিক। এ ছাড়াও মামলাবাজি করে, প্রতারণার ফাঁদে মানুষকে ফেলে অনেক আয় করে। সম্প্রতি বৃহৎ অঙ্কের টাকা খরচ করে মুক্তিযোদ্ধার সনদ কিনেছে। সেই সনদের বদৌলতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংবর্ধনা দেয়া হবে। টাকার বিনিময়ে গ্রামেরই একটা ক্লাব এই সংবর্ধনার আয়োজন করেছে। ক্লাবটিতে প্রচুর টাকা অনুদান দিয়ে সে বলতে গেলে সব সদস্যকে কিনে নিয়েছে। অনুষ্ঠানে স্থানীয় এমপি থাকবেন, আরো থাকবেন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানসহ বেশ কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি। উপজেলা ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারও উপস্থিত থাকবেন। এই দুই মানুষও তার টাকার কাছে মাথা নত করেছে। আর এমপি-চেয়ারম্যানদের তো সে ভোটের সময় ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করে। তাই তারা শুধু শুধু তার বিরুদ্ধে যাবে কেন? আপন স্বার্থের ওপর আর কী আছে?

উলেস্নখ করা প্রয়োজন, যে তের জন একসঙ্গে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের মধ্যে ছয় জন যুদ্ধে নিহত হয়েছে, বাকি সাত জনের মধ্যে একজন মারা গেছে বছর দুয়েক আগে, আর অবশিষ্ট আছে এরা ছয়জন। নেছার এই পাঁচজনকে নিয়ে প্রথমে গেল এমপির কাছে, তারপর চেয়ারম্যানদের কাছে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারদ্বয়ের কাছে- প্রতিবাদ জানালো গোলামের প্রতারণার বিষয়ে কিন্তু কোনো ফল এলো না; সবারই যেন এক উত্তরই মুখস্থ করা, তোতা পাখির মতো ফড়ফড় করে বলল। গোলাম একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। যুদ্ধ না করলে কেউ এমনিই সার্টিফিকেট পায়? গোটা দেশের যুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা আছে? তালিকায় নাম আছে তার। আপনারা অ্যাতো ছোটো মনের কেন? মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বড় মন থাকা দরকার। অন্যের পেছনে অযথাই লাগতে যাচ্ছেন কেন? এরা বলল, হিন্দু কয়জন লোক সাক্ষী আছে, অরা একসাতেই আছলো। তারা বললেন, ওরা মিথ্যা বলেছে, এখন ওদের কাছে যান, দ্যাখেন কী বলে।

হঁ্যা, ঠিক তাই। গ্রামে ফিরে এদের জিজ্ঞাসা করতেই এরা বলল, উঁই মাঝখানে দ্যাশোত আলছিল। যুদ্ধ শ্যাষ হওয়ার কয়াকদিন আগে ভারতোত গেছলো আবার। এই সুময়ের মধ্যে যুদ্ধ করলেও করবার পারে।

তালে তুরা মিছা কছলু ক্যা? উঁই তুরকেরে সাতে গেছে, সাতে থাকিছে, আবার সাতেই অ্যালছে?

লজ্জায় কছি। আমরাও তো অ্যাসপার পারনুনি অর সাতে। দ্যাশোত অ্যাতো বড়ো যুদ্ধ হয়া গ্যালো, আর আমরা পালায়্যা থাকনু, অর সাতে কিসোক আসলু না! তুরা মুক্তিযোদ্ধারা শুনলে লজ্জা দিবু, তাই মিছা কছি।

তালে উঁই সত্যি কয়নি ক্যা অ্যাতোদিন?

তা আমরা জানি না। ওডা অর ব্যাপার।

না, তুরা মিছা কচ্ছু। ট্যাকা খাছু। তুরকেরে কতার ওপর ভিত্তি ক্যোরা ব্যাবাক মানুষ জানে গোলাম যুদ্ধ করেনি। উঁই কুনোদিন পতিবাদও করেনি। যুদ্ধ করলে কেউ কুনোদিন কবে না?

\হনেছাররা আরো কয়েকদিন দৌড়াদৌড়ি করল। ফলাফল যা, তাই- শূন্য। কিন্তু এরা কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। বিশ্বাস করতে পারছে না, মেনে নিতে পারছে না যে গোলাম যুদ্ধ করেছে। অবশ্যই এটি একটা গন্ডগোল আছে। ওই হারামজাদা হিন্দুরাই কতা লুকাচ্ছে। অরকেরোক চার্জ করা লাগবে। ভয় দ্যাকান লাগবে, তালেই অরা সত্যি কতা কবে। ছয় জন মিলে এই ভাবনায় এসে স্থির হলো।

রাতের বেলা এরা ওই কয়জন হিন্দুর একজনকে ডেকে খোলা মাঠের মধ্যে নিয়ে এলো।

বিষ্টু, অ্যাকুনো সত্যি ক্‌, গোলাম যুদ্ধ করিছে কি না? না কলে কিন্তু এটিই তুক খতম ক্যোরা ফেলমু।

কণ্ঠ তার রাগে ভরা। দৃষ্টির মাঝে ক্ষিপ্রতা।

বাকি পাঁচজনও একই ঢঙে বলে উঠলো, বিষ্টু, সত্যি ক্‌, তাছাড়া তুক গলা টিপা ম্যারা ফেলমু।

যা সত্যি তাই কমু। আমাকেরে সাতে ভারতোত যায়্যা বাংলাদেশোত চ্যোলা আলছিলো। যুদ্ধ শ্যাষ হওয়ার কয়দিন আগে ভারতোত গেছলো আবার। তারপর আমরা একসাতে বাংলাদেশোত অ্যালছি।

কতা কোতে অর গলা কাঁপিচ্ছে, উঁই মিছা কচ্ছে। ধর অক। গলা টিপা ধর, ম্যারা ফ্যালামু। নেছারের হুঙ্কারে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো। বিষ্টুকে চিৎ করে ফেলে পাঁচজন চেপে ধরলো। নেছার গলা চেপে ধরতেই সে হাউমাউ করে উঠলো।

ভাই...ভাই... মারিস না, কচ্ছি...কচ্ছি...। এরা তাকে তুলে দাঁড় করাল।

\হগোলাম যুদ্ধ করেনি। আমাকেরে সাতে ভারতোত গেছলো, আমাকেরে সাতেই দ্যাশোত ফিরা অ্যালছে। কথা শেষ করেই সে খচমচ করে নেছারের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।

কীরে কান্দুচ্ছু ক্যা, উট্‌?

ভাই, আমি কছি এডা পোকাশ হলে গোলাম আমাক ম্যারা ফেলবে। তুরা তো গোলামক চিনিস, উঁই কতো খারাপ! আমাকেরোক কয়জনাকই ম্যারা ফ্যালার হুমকি দিয়া গেছে। আমাক বাঁচা ভাই, আমাক বাঁচা।

তুই তো বেঈমান, বিশ্বাসঘাতক। তুর আর গোলামের মদ্ধে কুনো পাথ্র্‌থক্য নাই। তুর আর রাজাকারের মদ্ধে কুনো পাথ্‌থক্য নাই। তুই তো দ্যাশের শত্রম্ন। তুক ম্যারা ফ্যালা দরকার। কিন্তু তুর থ্যাকাও ম্যালা বড় শত্রম্ন দ্যাশের নেতারা। তাই তুক ম্যারা আর কী হবে! যা, তুর কতা পোকাশ হবে না। বিষ্টু চলে গেলো।

চিন্তা করবার প্যারিস, কী একটা দ্যাশ যেটি মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট বিক্রি হয়! একটা দীর্ঘশ্বাসের পর শব্দগুলো বের হয়ে আসে নেছারের মুখ থেকে।

মনে হয় আত্মহত্যা করি। এই লজ্জা কুন জাগাত থুমু! অ্যাকুন মুক্তিযোদ্ধা কোতেই লজ্জা লাগে। বাকি পাঁচজনের একজন বলল।

কী আর করার আছেরে! ধোয্‌য ধর। একদিন এডার বিহিত হবেই। এই দ্যাশের মানুষ অরকেরোক ছেড়া দিবে না। একদিন ঠিকিই ধরবে। আরেকজন বললো।

চল, বাড়িত যাই। নেছার বলল।

সবাই যে যার বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।

আজ সেই সংবর্ধনার দিন। মঞ্চে বসে আছে স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার, দুই-তিনজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। মঞ্চের সামনে বাইর থেকে আমন্ত্রিত অতিথিবর্গ, কয়েকজন বাইরের মুক্তিযোদ্ধা আর গ্রামের কিছু লোকজন। নেছাররা আসেনি। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আয়োজন করা হয়েছে অনুষ্ঠানের।

বিদ্যালয়ের আঙ্গিনা ঘেঁষেই নেছার উদ্দিনের বাড়ি। মাইকের শব্দ খুব সাবলীলভাবে তার বাড়ি অব্দি বিচরণ করছে। নেছার বাড়ির আঙ্গিনায় একটা টুলে বসে বিষণ্ন মনে বিড়ি টানছে। শুনতে না চাইলেও তাকে শুনতে হচ্ছে। ভেতরটা জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই সে করতে পারছে না। একবার ভাবছে, বিষ্টুকে মঞ্চে টেনেহেঁচড়ে তুলে জোর করে স্বীকারোক্তি করাবে কি না। পরক্ষণেই ভাবছে, যদি সে না বলে তখন কী করবে? সে তো আর গোলাম নয় যে, অত্যাচার করবে কিংবা মেরে ফেলবে। আবার এও ভাবছে, যদি বলেই ফেলে সে, গোলাম তার ব্যাপক ক্ষতি করবে। এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। ওরা গরীব মানুষ, অসহায় মানুষ। দুটো পয়সা হয়তো দিয়েছে কিন্তু প্রাণনাশের ভয়েই চুপচাপ আছে। ওদের ক্ষতি করে কী লাভ! শেষমেশ সে হাল ছেড়ে দিয়ে ক্ষোভ-যাতনায় পুড়তে পুড়তে নিশ্চুপ বিড়ি টানতে লাগল।

এক পর্যায়ে ভেসে এলো সেই শব্দ- এখন গোলাম জোয়াদ্দারকে সংবর্ধনা দেয়া হবে, প্রাণবাজি রেখে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করার জন্য। এটা শোনা মাত্রই নেছারের ভেতরে ধক করে আগুন জ্বলে উঠলো। উঠে দাঁড়ালো। গোটা শরীর তার কাঁপছে। ভেতরে দহনের তীব্রতা। আঙ্গিনার এ-মাথা ও-মাথা পায়চারি করছে আর ঘন ঘন বিড়িতে টান দিচ্ছে।

সংবর্ধনা দেয়া হলো। মুহুর্মুহু তালির শব্দে চারপাশ ফেটে পড়ছে। নেছার উদ্দিনের কানের পর্দা ফেটে যেন তালির শব্দ ঝড়ো গতিতে এপার-ওপার দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। মাইক স্তুতি-ধ্বনিতে ফেটে পড়ছে- এই বীরকে আজ আমরা সংবর্ধিত করতে পেরে আনন্দিত, গর্বিত। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান তিনি।

আর ঠিক থাকতে পারল না নেছার। আর নিজেকে ঠেকাতে পারল না। উন্মাদ হয়ে উঠলো। ট্রাঙ্ক থেকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট বের করে এক দৌড়ে মঞ্চে এলো। বক্তার হাত থেকে মাইক্রোফোনটি এক ঝটকানিতে টেনে নিলো নিজের হাতে। গোলাম জোয়াদ্দারের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।

ভাইয়েরা আমার, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার কতা আপনাকেরে শুনা লাগবে। এই গোলাম জোয়াদ্দার একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। ইঁই যুদ্ধ করেনি। আবার উই ক্যামুন মানুষ, এই এলাকার ব্যাবাকে জানে। আপনারা যারা ব্যারে থ্যাকা অ্যালছেন তারা জানেন না। উই একজন ডাকাত, সুদখুর, মামলাবাজ, পোতারক, অত্যাচারী। এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা দ্যাওয়ার জন্য আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে লজ্জা-জ্বালা-যন্ত্রত্মণা আর থুবার পারিচ্ছি না। তাই আমার এই মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ছিঁড়্যা ফেলনু।

সার্টিফিকেটটি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে বেরিয়ে গেল।

একমাত্র গোলাম জোয়াদ্দারের চোখ ছাড়া সব চোখ স্তিমিত, বিস্মিত।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে