logo
রোববার ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬

  সালেহ আহমাদ   ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

যে গল্পের শেষ নেই

যে গল্পের শেষ নেই
রেবা খানের সঙ্গে আমার পরিচয় ছয় বছর আগে। তখন আমি ঠাকুরগাঁয়ে। পঞ্চগড় অফিসের দায়িত্বও আমাকে দেয়া হয়েছিল। পঞ্চগড় অফিসে আমার বসার কক্ষ থেকে সব সহকর্মীদের অবস্থান স্পষ্ট দেখা যেত। আমার অফিস জেলা তথ্যভান্ডার হিসেবে বিবেচিত। মাঠ থেকে আমরা যে তথ্য সংগ্রহ করি। সাধারণ মানুষ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সে তথ্য ব্যবহার করে।

একদিন দেখলাম বড়বাবুর সামনে একজন মহিলা বসা। উভয়ের কথা-বার্তার ধরনে মনে হলো তারা পূর্ব পরিচিত। টেবিলে ডিপার্টমেন্টের ছাপানো বেশ কটি মোটা ভলিয়মের বই। হয়তো ভদ্রমহিলা কোনো তথ্য নিতে এসেছে। কিছুক্ষণ পর আমার মনে হওয়াটা ভুল প্রমাণিত হলো। ভদ্রমহিলা কোনো তথ্য নিতে আসেনি। আমার ডিপার্টমেন্টে বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন।

বড়বাবু কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলাকে নিয়ে আমার কক্ষে এলেন। ভদ্রমহিলার আগমনের হেতু বর্ণনা করে তার ব্যক্তিগত তথ্যশিট আমার সামনে রাখলেন। তথ্যসিট দেখে আমি হিসেব মেলাতে পারলাম না। তথ্যসিট বলছে, সে এসএসসি করেছে আমার একবছর আগে। তার মানে আমার এক বছরের সিনিয়র। আমার রিটায়ার্ডমেন্ট সন্নিকটে। সে হিসেবে ভদ্র মহিলার বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই। কিন্তু তার মুখাবয়ব বলছে সে এখনো চলিস্নশের ঘরে। গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা। গোলাপি শাড়ির সঙ্গে গোলাপি স্কার্টে তাকে অপরূপা মনে হচ্ছে। স্কার্ফের দুই পাশে কানের কাছ দিয়ে নেমে আসা দুই গুচ্ছ চুল সিলিং ফ্যানের বাতাসে উড়ছে। এই দুই গুচ্ছ চুল যদি তার সব চুলের প্রতিনিধি হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত, ভদ্রমহিলার চুল রেশমের মতো ঝলমলে। নাম রেবা খান। সে একটা প্রাইভেট ফার্মে কর্মরত। বাড়তি কিছু রোজগারের প্রত্যাশায় তার এখানে আসা। রেবা বিধবা। তিন সন্তানের জননী। নিজস্ব বলে কিছু নেই। বাড়ি-ঘর, জমাজমি কিছুই নেই। সহায় সম্বলহীন একজন। অবশ্য তাকে দেখে এসব মনে হবে না কারও।

এ বয়সে রোদে পুড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা তার পক্ষে খুব কঠিন হবে- বললাম।

জবাব পেলাম- আমি জানি। এটাও জানি, প্রয়োজন কোনো নিয়ম মানে না। তাকে নেয়া হবে আশ্বাস দিলাম। দেখলাম আমার আশ্বাসে আনন্দে তার চোখ ঝলমল করে উঠল। পলক না ফেলা দৃষ্টিতে আমাকে দেখল। তারপর অনেক ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেল। রেবাকে নেয়া হলো সুপারভাইজর হিসেবে। তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে যাদের নেয়া হয়েছে, তারা সবাই কলেজে, ভার্সিটিতে পড়ুয়া। তাদের সঙ্গে সে পেরে উঠবে না- এমন ভেবে।

তাকে সুপারভাইজর হিসেবে নেয়া হয়েছে এ খবর তাকে জানানোর আগেই সে জেনে যায়। আনন্দ খুশিতে কৃতজ্ঞতা জানাতে পরদিনই অফিসে এসে হাজির। তার হাতে একটা টিফিন বক্স। ভাবলাম এটায় রেবার লাঞ্চ হবে হয়তো। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত করল রেবা। বলল, স্যার আমার হাতে বানানো গরুর গোশতের কিমা। আপনার জন্য এনেছি। না- বললে আমি খুব কষ্ট পাবো।

বাড়ি থেকে অনেক দূরে আমি। কাজের মহিলার হাতের রান্না খেতে হয়। এমন বিবেচনায় আমি জুনিয়র সহকারীকে বললাম, টিফিন বক্সটা ভেতরে রেখে আসতে। দেখলাম আবার খুশিতে রেবার দুই চোখ হেসে উঠল। ভাবলাম, সমাজে অনেক মানুষ আছে, যাদের চোখ ছোটখাটো খুশিতেই হেসে ওঠে। রেবা তাদের একজন।

প্রশিক্ষণের দিন বেশ সকালেই রেবা এলো। অফিসে ঢুকে ইমেইল চেক করা প্রথম কাজ। সেটাই করছিলাম। সালামের আওয়াজ কর্ণগোচর থেকেই বুঝতে পারলাম, এ কণ্ঠ রেবার।

আমাদের এ প্রজেক্ট ভিন্নধর্মী। চলবে দুই বছর। সপ্তাহান্তে অফিসে এসে রিপোর্ট জমা দিতে হয়। দুই মাস যেতেই রেবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ উন্নতি হলো। মাঝেমধ্যেই রেবা তার জীবনের ঘটনা বলতে চেয়েছে। আমার শোনা হয়নি। একদিন বললাম আপনার জীবনের গল্প আমাকে শুনিয়ে কী লাভ আপনার।

রেবা বলল, স্যার আপনি গল্প লেখেন এটা জেনে গেছি। আমার জীবনের গল্পে দারুণ পস্নট আছে। সে পস্নট যদি খুঁজে না পান, তাহলে কোনো লাভ নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি গল্পের পস্নট পাবেন। গল্প লেখা হবে। সে গল্প পত্রিকায় ছাপা হবে। অনেক পাঠক নিজের সম্পর্কে, নিজ পরিবার সম্পর্কে সচেতন হবে। রেবা চমৎকার করে কথা বলে। এখন কটা বাক্য উচ্চারণ করল কবিতার মতো করে। আমিও টের পেলাম, মাথার ভেতরে রেবার গল্প শোনার একটা আবহ তৈরি হচ্ছে। বললাম, আপনি কোনো এক শনিবার বিকালে আসুন। আপনার গল্প আমি শুনবো। রেবা ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যেতে থাকল। ক'কদম এগিয়ে আবার ফিরল। বলল, আগামী শনিবারই আসব।

অফিসে কিন্তু শোনা হবে না।

তাহলে কোথায়?

আমি দুটো জায়গার কথা বলব। সিলেকশনের দায়িত্ব আপনার।

বলুন।

করোতোয়া ব্রিজের ঢাল দিয়ে ছোট একটা রাস্তার মতো তৈরি হয়ে গেছে। এখন সবুজ ঘাসে ভরা। সেই ঘাসের ওপর বসে আপনার গল্প শুনব। ব্রিজের ওপর দিয়ে চলতে থাকা মানুষ দেখব। মৃত করোতোয়ার কষ্ট দেখে দেখে আপনার কষ্ট হালকা হয়ে যাবে।

আমার গল্পে কষ্ট আছে, তা জানলেন কী করে?

দেখুন, আমরা উল্টো মানসিকতাসম্পন্ন। আমরা যে মানের মানুষ, তার চেয়ে নিজেকে আরও উন্নতমানের ভাবি। আমরা যতটুকু জানি, তার চেয়ে বেশি প্রকাশ করার চেষ্টা করি। আমরা আনন্দের খবর শেয়ার করি না। দুঃখের খবর শেয়ার করতে পছন্দ করি। এর বাইরে আমরা কেউ নই- না আপনি, না আমি। আশা করি বোঝাতে পেরেছি।

হঁ্যা। নদী আপনার পছন্দ?

নদী আমাকে খুব টানে। নদীর সঙ্গে সখ্যতা আমার আদ্যিকালের। নদীর গন্ধ শুঁকতে শুঁকতেই বেড়ে উঠেছি তো!

দ্বিতীয় জায়গা?

শহরের উত্তরপ্রান্তে ব্যারিস্টার বাজারের কিছুটা পরে। চারদিকে সবুজের সমারোহ। মাঝেমধ্যে আকাশছোঁয়া ইউকেলিপটাস গাছ। এ গাছের বৈশিষ্ট্য, বড় হলে গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে বাকল উঠে যায়। বাকল উঠে যাওয়া অংশ দেখতে হোয়াইট। হোয়াইট আর ব্রাউনের সহাবস্থানে গাছগুলো দেখতে চমৎকার লাগে। এমনি গাছের কোনো একটার ছায়াতল। যদিও এ গাছগুলো পরিবেশবান্ধব নয়।

কেন?

এ গাছগুলোর শিকড় চারপাশের সব রস আস্বাদন করে। পাশের গাছগুলো রুগ্ন হয়ে যায়। আপনি বলুন, কোন জায়গাটা আপনার পছন্দ। এমন পরিবেশে আমার সঙ্গে আপনি একাকী যেতে ইচ্ছুক কিনা সেটাও ভাবুন।

কেবল একজনের সঙ্গে যে কোনো জায়গায় যাওয়া যায়। একজনকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর সেই একজন যদি আপনার মতো কেউ হয়, তাহলে আমার মতো বয়স্ক একজন শুধু নয়- একজন যুবতীও কোনো দ্বিধা করবে না।

কিছুটা বাড়িয়ে বলা হলো না!

একেবারেই না। আমার পছন্দ আপনার দ্বিতীয় চয়েজ। সবুজে ডুবে যাওয়া হয়নি অনেকদিন।

পরের শনিবার বিকালে রেবা এলো। এতদিনের দেখা রেবার সঙ্গে আজকের রেবার অনেক তফাৎ। পরনে সুতি শাড়ি। লাল টকটকে পাড়, জমি গাঢ় সবুজ। ম্যাচিং বস্নাউজ। মাথায় পেস্নন সবুজ স্কার্ফ। মনে হলো রেবা খান নয়, ছোট একটা বাংলাদেশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে। বললাম, চমৎকার!

আমি? না আমার পোশাক?

একটা বাংলাদেশ!

ইন্টারে পড়ার সময় এক স্বাধীনতা দিবসে এ শাড়ি পরে বাংলাদেশের পতাকা হয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের তিনশ ছাত্রী। এরপর আজ পরলাম।

ব্যারিস্টার বাজারে নামলাম। ড্রাইভারকে বললাম। আপনি চা খেতে থাকুন। আমরা এই সবুজে কিছুটা সময় কাটাবো।

জ্বি স্যার। ড্রাইভার চলে গেল।

গাড়ি থেকে নেমে রেবা চারদিক তাকালো- বলল, অপূর্ব। বড়ই মনোরম। বড়ই প্রাকৃতিক। আমি তো সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম!

যেমন?

হাইওয়ের দু'পাশই আমাকে টানছে। কোন পাশটাকে কাছে টানবো বুঝতে পারছি না।

মানুষের মানসিকতাই এমন। যেখানে স্বার্থের ব্যাপার-স্যাপার নেই। সেখানে মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। আর যেখানে স্বার্থ জড়িত, লাভ-লোকশানের প্রশ্ন নিহিত, সেখানে লাভের দিকে এগিয়ে যেতে মুহূর্তও নষ্ট করে না। সেখানে বাবা মেয়েকে দেখে না। ভাই বোনকে দেখে না। ভাই ভাইকে দেখে না। আবার শত্রম্নভাবাপন্ন ভাইও মিত্র হয়ে যায়।

যথাযথই বলেছেন। 'স্বার্থে শত্রম্নভাবাপন্ন ভাইও মিত্র হয়ে যায়'- আপনার বলা এই বাক্যটা প্রচন্ডভাবে সত্য। চলুন এ পাশে যাই।

হাইওয়ে থেকে নেমে জমির আল ধরে হাঁটতে থাকি। রেবা বলল, নগ্ন পায়ে হাঁটবো।

কোনোই সমস্যা নেই।

একটা ইউকেলিপটাসের ছায়ায় বসে রেবা বলল, বলেছিলেন, নদীর সঙ্গে আপনার সখ্যতা বেশ। কোন সে নদী?

তাহলে তো আপনার বুদ্ধি যাচাই করতে হয়।

মাপ করে দিন। আমি খুবই বোকা একজন।

দেখে কিন্তু তা মনে হয় না। দেখে কী সব চেনা যায়?

তা যায় না। তবে কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

আমার মতো বোকারা সেটাও পারে না। ঠিক আছে যাচাই করুন কতটা বোকা আমি। বলেই হাসলো রেবা। দুই মাস দশদিন পর তার হাসি দেখলাম। বেশ মিষ্টি হাসি। ভাবলাম, রেবা এখন প্রকৃতির সন্তান হয়ে গেছে। ভেতরের কষ্ট কিছুটা হলেও দূর হয়েছে। বললাম, সে নদী আপনার হাসির মতোই মিষ্টি এবং রূপসী।

আবার হাসলো রেবা খান। হাসতে হাসতেই বলল, পদ্মা।

বললাম, আপনি তো আমার ধারণা পাল্টে দিলেন!

কেমন করে?

জেনে এসেছি, সুন্দরীরা বোকা হয়। আপনি উল্টো।

থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ্‌

রেবার থ্যাঙ্ক ইউয়ের জবাবে হাসলাম শুধু।

বললাম চা খাবেন?

চা খাওয়া যায়। কিন্তু পাবেন কোথায়?

সে ভাবনা আমার। মোবাইলে ড্রাইভারকে বললাম, নর্থ বেঙ্গল টি-স্টলের কালামকে বলো, দুটো গ্রিন টি দিয়ে যেতে।

গ্রি টি কেন?

আমরা এখন গ্রিনের ঘেরাটোপে বন্দি। গ্রিনে গ্রিনে একাকার হই। ভেতরে সবুজ ঢুকিয়ে দিই।

আপনার এই বাক্যগুলো কবিতার মতো মনে হলো। জায়গাটা চমৎকার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এমন প্রকৃতির মাঝে নিয়ে আসার জন্য।

ধন্যবাদের জবাব না দিয়ে বললাম, উত্তরে তাকান। দেখুন তো কিছু দেখা যায় কিনা।

ও' মা! ওটা হিমালয়ের চূড়া না!

হঁ্যা। হিমালয়ের চূড়া।

পঞ্চগড় হিমালয় দুহিতা জানি। কিন্তু এমন করে দেখা হয়নি কখনো। এখানে তো শুধু আনন্দ আর আনন্দ। প্রকৃতির সব সৌরভমাখা সৌন্দর্য মিলে-মিশে একাকার! এক কথায় দারুণ!

কালাম চা নিয়ে এলো। বললাম পরে এসে কাপ নিয়ে যেও।

এমন আনন্দভরা পরিবেশে আপনার কষ্টের কথা বলতে ভালো লাগবে? রেবা নিশ্চুপ হয়ে গেল। মাথা ঘুরিয়ে আবছা দেখা যাওয়া হিমালয়ের দিকে তাকাল।

দেখলাম, পশ্চিম আকাশ লালচে রূপ ধারণ করেছে। সেই লালের প্রভাবে হিমালয়ও লালচে রূপ নিয়েছে। অপূর্ব লাগছে। হিমালয়ের অপরূপা রূপে হারিয়ে গেছে রেবা খান। হিমালয়ও বসে নেই, সে রেবা খানের অনেকটা কষ্ট নিজেই নিয়ে নিয়েছে। রেবার মুখাবয়ব সে কথাই বলছে।

আপনাকে বলেছি, আমরা উল্টো মানসিকতাসম্পন্ন। যা বলা উচিত না, তা বলি। যা বলা উচিত, তা বলি না। কৈশোরে একবার বাবা বলেছিল, আনন্দ ছড়িয়ে দাও চারদিকে। কষ্ট চেপে রাখে বুকের গহীনে। অতীত নিয়ে ভেবো না। যা ঘটেছে তা আর ফিরে আসবে না। বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব। ভেতরের কষ্ট মিলিয়ে যেতে সময় নেবে না খুব একটা। কষ্টের কথা কাউকে বলতে নেই। লাভ কিছু হয় না। শুধু শুধু অন্যের করুণার একজন হওয়া। বাবার সেই বলা কথা শতভাগ সত্যি-প্রমাণিত। বাবার কথা মেনে চলি সেই থেকেই। ক'মাস আপনাকে দেখলাম। জানলাম আপনার মানসিকতা। সে কারণেই প্রকৃতির মধ্যে আপনাকে নিয়ে আসা। আপনাকে বদলানোর ছোট প্রচেষ্টা বলতে পারেন।

আমাকে কেন বদলাতে চাইছেন? কোনো কিছুর প্রত্যাশায়?

না। আমি আমাকে চিনি। আমাকে জানি। যতটুকু প্রাপ্য, ততটুকু পেয়ে গেছি। আর কোনো প্রত্যাশা নেই আমার।

তাহলে...?

আপনি কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। এ কঠিন সময় থেকে সহজে আপনার মুক্তি মিলবে, তা মনে হয় না। এই কঠিন সময়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলে, আপনি স্বাভাবিক থাকতে পারবেন। আপনি স্বাভাবিক থাকুন। সুস্থ থাকুন- এতটুকুই আমার প্রত্যাশা।

এই পরিবেশে আমারও কষ্টের কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু বাড়িতে যাওয়া মাত্রই কষ্টগুলো নাড়া দিয়ে উঠবে। সেখানে হিমালয়ের চূড়া নেই। সাদা বাদামি ইউকেলিপটাস নেই। চারদিকে সবুজ নেই, আপনার মতো কোনো একজন নেই। তখন কষ্টগুলো আমাকে এলোমেলো করে দেবে যে।

আপনার কষ্টের বিষয়গুলো আমি তো জানি।

সেলিম ভাই বলেছে?

কে বলেছে সেটা বড় কথা নয়- আমি জানি সেটাই বড়কথা। আপনি কাল বিকালে আসুন। করোতোয়ার সবুজ চত্বরে বসে চা খেতে খেতে আপনাকে একটা মন্ত্র শেখাবো। সেই মন্ত্র আপনি ধারণ করবেন, লালন করবেন। আপনার কষ্ট থাকবে না।

তাই হবে।

তাহলে উঠুন।

রাতে বিছানায় যাওয়ার পর রেবার কথা মনে হয়। তার জীবনের গল্পের কথা মনে হয়। রেবার গল্প পুরনো। আমাদের সমাজে ঘটা অহরহ ঘটনার মতোই-ব্যতিক্রম কিছু নেই।

পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে পঞ্চম। রেবা দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় মা হারায়। পঞ্চান্ন বছর বয়সে বাবা পনের বছরের এক মেয়েকে বিয়ে করে। বাবার বিয়ে ভাইবোনের জন্য কঠিন সমস্যা সৃষ্টি করে। লজ্জায়, ঘৃণায় তারা চার দেয়ালে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব গ্রহণ করে। তাদের কান্না থামে না। বাবা রিটায়ার্ডে গেলে চারদিক থেকে অভাব ধেয়ে আসে। তার মধ্যেও মাত্র ছ'বছরেই পরিবারে আসে চার নতুন সদস্য। অভাবে বড় ও ছোট ভাইয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। মেঝোভাই দাঁতে দাঁত কামড়ে পড়ালেখা চালিয়ে যায়। সম্পত্তি থেকে তাদের বঞ্চিত করে যায় বাবা। বাবার ধারা বজায় রাখে ভাইয়েরা। এতটুকুই।

এমন গল্পের শেষ নেই। হাজার বছর আগে যেমন ছিল, হাজার বছর পরেও তেমন থাকবে।

পরদিন বিকালে রেবা এলো। দুজনে করোতোয়ার পাড়ে এলাম। দেখলাম সবুজ চত্বরটা বেশ ফাঁকা। সেখানে বসে রেবাকে দেখলাম। তার মুখাবয়বে কষ্ট স্পষ্ট। চেয়ে দেখছে মৃত করোতোয়া। হয়তো ভাবছে এই করোতোয়াই তার জীবনের বর্তমান রূপ! এটা স্বাভাবিক। পৃথিবীতে মানুষ সবচেয়ে রহস্যময়ী প্রাণী। কারও শরীরের রূপ, কথা বলার ধরন দেখে বোঝার উপায় নেই, তার ভেতরটা কেমন? রেবার ভাইয়েরাও তেমন। ভয়াবহ কষ্ট পার করা মানুষ। ব্যতিক্রমও তারা। কষ্ট পেরিয়ে আসাজন অন্যের কষ্টে কাতর হয়- রেবার ভাইয়েরা বোনের কষ্টেও কাতর হয় না। কেউ কেউ অস্ট্রেলিয়ান, কানাডিয়ান ডলারে বাড়ি-ঘর সাজাচ্ছে নিত্য-নতুন সাজে। বোনের অশ্রম্ন দেখার সময় নেই!

নীরবতা ভেঙে রেবা বলল, ত্রিশ বছর আগের করোতোয়ার সঙ্গে ত্রিশ বছর আগের রেবার যেমন মিল ছিল। আজকের করোতোয়া আর রেবার সঙ্গে তেমন মিল! খুব অদ্ভুত না!

অদ্ভুত ভাবলেই অদ্ভুত। না ভাবলে না। তবু করোতোয়া বেঁচে আছে?

এই বেঁচে থাকাকে কী বেঁচে থাকা বলে? দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রেবা। তারপর বলে আপনার মন্ত্র বলুন।

পৃথিবীতে মন্ত্র বলে কিছু নেই। যা আছে তা মানসিকতা পরিবর্তনের কিছু রীতিমাত্র। প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এবং ঘুম থেকে উঠে কেবল দশবার চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলবেন- 'আমার বাবা এবং ভাইয়েরা আর দশজন নীতিহীন, আদর্শ বিবর্জিত মানুষের মতোই লোভী এবং চরম স্বার্থপর। এতদিন তাদের মহৎ ভেবে ভুল করেছি!'
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে