logo
রোববার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

  জোবায়ের আলী জুয়েল   ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

নজরুল ও অজানা অধ্যায়

নজরুল ও অজানা অধ্যায়
বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার সমস্ত নজরুল গবেষক ও জীবনীকাররাই একমত যে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুইবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তার এই দুটি পত্নীরই বাড়ি ছিল আমাদের বৃহত্তর কুমিলস্না জেলায়।

নজরুল ছিলেন মূলত প্রেমিক কবি। প্রেম দিতে ও প্রেম পেতে তিনি সবর্ত্রই ঘুরে বেড়িয়েছেন। নজরুলের প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল নার্গিস আসার খানম (বিয়েতে দ্বিমত আছে) ও দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম ছিল আশালতা সেন ওরফে প্রমীলা।

কুমিলস্না জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের খানবাড়ীতে ১৭ জুন, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে নজরুল ইসলামের সঙ্গে নার্গিস আসার খানম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন নজরুল ইসলামের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর (১৮৯৯-১৯২১ খ্রি.)। মূলত নার্গিস আসার খানম ছিলেন কুমিলস্নার আলী আকবর খানের ভাগ্নি। আলী আকবর খান ছিলেন কলকাতার স্বনামধন্য পুস্তক ব্যবসায়ী। পুস্তক প্রকাশনা বিষয়ে আলী আকবর খানের সঙ্গে নজরুলের একটা নিবিড় সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই সূত্র ধরেই আলী আকবর খানের সঙ্গে নজরুল কলকাতা থেকে কুমিলস্নার দৌলতপুর গ্রামে চলে আসেন। নার্গিস অত্যন্ত ধার্মিক পরিবারের মেয়ে ছিলেন। কবি নজরুলের সঙ্গে নার্গিসের বিবাহ সম্পর্কে তার পিতা রাজী ছিলেন না। এমন কি নার্গিসের বড় ভাইরাও এ বিয়েতে অমত ছিলেন। পিতা ও ভাইদের অসম্মতি সত্ত্বেও মামাদের কথায় নার্গিস এ বিয়েতে সম্মতি দিয়েছিলেন। নজরুলের পক্ষ হতে কলকাতা থেকে এ বিয়েতে কেউই উপস্থিত ছিলেন না।

বিয়ের পরে নার্গিসের মামা আলী আকবর খান চেষ্টা করেছিলেন বর, কনেকে বেশ আনন্দ ফুর্তিতে রাখা। তার জন্য তিনি এ বিয়েতে বিভিন্ন ধরনের গান-বাজনারও আয়োজন করেছিলেন। এই গানের অনুষ্ঠানে কুমিলস্না শহর থেকে একদল মহিলা শিল্পী এসেছিলেন। তারা আলী আকবর খানের বাসাতেই সবাই অবস্থান করেছিলেন। শিল্পীরা সবর্ক্ষণ এই সদ্য বিবাহিত বর ও বধূকে বিভিন্নভাবে আনন্দ ফুর্তিতে রেখেছিলেন। অনুমান করা হয়, এসব কারণেই রক্ষণশীল পরিবারের সদস্য নার্গিসের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। এই নার্গিস আসার খানমই ছিলেন নজরুলের প্রথম পত্নী। প্রথম দিনেই এ বিবাহের বিচ্ছেদ ঘটে এবং তা নজরুলের জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত করেছিল। এ বিয়েকে কেন্দ্র করে নজরুলের জীবনে ঘটে যায় এক বিষাদময় ঘটনা। একটা স্বপ্ন ভঙ্গের ইতিহাস। এ বিয়ে নিয়ে নানা বির্তক আছে। নজরুল ইসলাম বাংলা ১৩২৮ সালের ৩ আষাঢ়, ১৭ জুন, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিয়ের রাতে মতান্তরে পরের দিন সকালে বীরেন সেনকে সঙ্গে নিয়ে কুমিলস্নার সেন গুপ্ত পরিবারে চলে আসেন। ব্যক্তি জীবনে এতবড় হৃদয় বিদারক দুঃখময় ঘটনা সৃষ্টির পশ্চাতে নজরুলের মনে অন্য কোনো গভীর বেদনা কাজ করছিল কি না তা শুধু নজরুলই সঠিক বলতে পারবেন। পরবর্তী সময় তার বহু কবিতায় ও বহুগানে এই দুঃখের দীর্ঘশ্বাস আমরা দেখতে পাই।

এ বিয়ে কেন ভেঙে গেল তা আজও রহস্যবৃত। কেউ কেউ বলেন, নজরুলের ছন্নছাড়া, ক্ষ্যাপা জীবনই এর জন্য দায়ী। কেউ বলেন, নজরুলের প্রতি নার্গিস আসারের তাচ্ছিল্যই এ বেদনাদায়ক পরিস্থিতি ঘটিয়েছিল। আবার অনেকে বলেন, বিবাহের সময় ২০,০০০/- (বিশ হাজার) টাকা কাবিন হওয়ার পরেও শর্ত ছিল নজরুল ইসলাম নার্গিস আসারকে দৌলতপুর থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। এই শর্তই নজরুল ইসলামের অহমিকায় ভীষণভাবে আঘাত হেনেছিল। আবার অনেকে বলেন, নার্গিস আসার খানমের মামা আলী আকবর খানের বিরাট স্বার্থান্ধতাই এ বিয়ে বিচ্ছেদের মূল কারণ। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরে পরবর্তী সময়ে নার্গিস আসার খানম ঢাকা শহরেই বসবাস করতেন। তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করে ঢাকার ইডেন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং এই কলেজ থেকেই আইএ পাস করেছিলেন।

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হন। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেও কোনো লাভ হয়নি। নজরুলের দুঃসময় জীবনের অন্যতম এক অধ্যায় প্রিয়তমা পত্নী প্রমীলার অসুস্থ হওয়া। নজরুল তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য যে, যা বলেছেন তাই করেছেন। স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহের জন্য নজরুল তার বালিগঞ্জের জমি টুকু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কবি নজরুল নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘকাল ডাক্তাররা তার রোগ ধরতে পারেননি। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে নজরুল নিরাময় সমিতি গঠিত হয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির চেষ্টায়। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ১০ মে তারিখে লন্ডনে পাঠানো হয় নজরুলকে। সেখানে তার রোগ ধরা পড়ে। এ রোগের বৈশিষ্ট হলো মস্তিকের সামনে ও পাশের অংশগুলি সংকুচিত হয়ে পড়লে রোগী শিশুর মতো আচরণ করে থাকে। এ রোগ নিরাময় সম্ভব নয় বলে ডাক্তাররা জানান। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ৩০ জুন দীর্ঘ রোগভোগের পর নজরুলের প্রিয়তমা পত্নী প্রমীলা সেনগুপ্ত মারা যান। নজরুল তখন নির্বাক, নিঃস্তব্ধ, বাক্যহারা, কবি পত্নী সমাহিত হন চুরুলিয়ার মাটিতে।

১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের আগ্রহে নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। নজরুল কে সম্মান জানিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে "জগত্তাড়িনী" পদকে ভূষিত করে। ভারত সরকার তাকে "পদ্মভূষণ" উপাধি দিয়ে সম্মান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কবিকে সম্মান জনক ডি. লিট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ২১ শে পদকে ভূষিত করে। রবীন্দ্রনাথের "আমার সোনার বাংলা"কে যেমন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে তেমনি গ্রহণ করা হয়েছে "চল চল চল"কে বাংলাদেশের রণ সঙ্গীত হিসেবে।

দুই.

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অকস্মাৎ বাকরুদ্ধ হন ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই। ১৯৪২ সালের ১৭ জুলাই কবির অসুখের অষ্টম দিবসে কাজীর শাশুড়ি গিরীবালা দেবীর বিবৃতি অনুসারে কাজী নজরুলের জিহ্বার আড়ষ্টতা ক্রমেই বেড়ে চলছে। সকাল থেকেই তিন উত্তেজিত এবং বেশ জোরে শোরে চেচিয়ে ক্রোধের সঙ্গে কথা বলছেন। তবে তার সব কথা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না। মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। গিরীবালা দেবীর চিঠি পেয়ে চুরুলিয়া থেকে কাজীর বড়ভাই ও ছোট ভাই সাহেব জান ও কাজী আলী হোসেন চলে এসেছেন। তারা দু'জনে বললেন ডা. বিধান চন্দ্র রায়কে (১৮৮২-১৯৬২ খ্রি.) দিয়ে দেখাবার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় কি না? কবির চেহারা বিমর্ষ, দীপ্তিহীন। নির্জীব, নিস্তেজ অবস্থায় তিনি বিছানায় পড়ে রয়েছেন।

অসুখের শুরু থেকেই কবির খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে একটা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ঠিক উন্মাদের মতোই তাড়াহুড়া করে আবার কখনোও বা বাঁহাতে তিনি খাবার মুখে পুরে দিতেন। তার শাশুড়ি গিরীবালা দেবী মাছের কাঁটা বেছে না দিলে নিজে কাঁটা ছাড়িয়ে খাবার খেয়ালও তার লোপ পেয়ে গিয়েছিল। সে দৃশ্য বড়ই করুণ। তবে এই অসুখের বেলায়ও তার খাওয়ার রুচি হ্রাস পায়নি। বেশ খেতে পারতেন।

কিছুদিন পর কবির আবার এক নতুন উপসর্গ দেখা দিল। কোনো কোনো দিন অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়তে লাগলেন এবং স্বগত অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে শুরু করলেন। ক্রমে ক্রমে এমনি অবস্থা দাঁড়ালো যে, তার পাগলামির জন্য তাকে বাড়িতে রাখা একরকম অসম্ভব হয়ে উঠলো। সেই ছোট্ট বাড়িটার একটা ছোট্ট কামরায় তাকে আবদ্ধ করে রাখা হলো। কিন্তু সেখানেও বাহ্যি-প্রসাব করে নোংরা করতে শুরু করলেন। এক একদিন এমনও দেখা গেল যে, মলমূত্র ত্যাগ করে সেই কামরাতেই তিনি সেগুলো দু'হাতে চটকাতে থাকতেন এবং কাপড়চোপড় ছুড়ে ফেলে দিয়ে উলঙ্গ হয়ে বসে আছেন। কখনও বা বিড়বিড় করে, আবার কখনও বা জোরে জোরে নানা ধরনের শালীনতাহীন উক্তি করেছেন।

সে সময় ওই কামরায় কারো যাওয়ার সাহস হতো না, কবির কনিষ্ঠ সহোদর কাজী আলী হোসেন তখন তার চুরুলিয়ার বাড়ি থেকে এসে এখানে দিন কয়েক ছিলেন। তিনি কবির চেয়েও যথেষ্ট বলিষ্ঠ চেহারার শক্তিমান পুরুষ। অধিকাংশ সময় কনিষ্ঠ সহোদর কাজী আলী হোসেন কবিকে ধরে নিয়ে পাশের বাথরুমে কলতলায় নিয়ে গিয়ে গাধুয়ে কাপড় বদলিয়ে দিতেন এবং কবির মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়িয়ে তাকে সভ্যভব্য করে তুলতেন। সামনে খাবার নিয়ে দিলে কোনো কোনো সময় খেয়েছেন, আবার কখনো বা ভাত তরকারি কিংবা অন্য যে কোনো খাবার হোক, হাত দিয়ে চটকিয়ে মেঝের ওপর লেপে দিয়েছেন এবং সেই চটকানো হাত মাথায় ঘষেছেন। কবির কী চেহারা, কী নিদারুণ দৃশ্য। শুধু দু'চোখ ফেটে প্রিয়জনদের দু'ফোটা অশ্রম্ন গড়িয়ে পড়েছে।

পীড়িত কবি নজরুলকে সাহায্য করতে গিয়ে এই আশ্চর্য এবং অবিশ্বাস্য মানুষ এবং মানুষের চরিত্র বুঝা গেছে সেই সময়। স্বার্থ ও অর্থ কি সাংঘাতিক জিনিস। এরপর নিজ দেশে নজরুল আর ভালো করে অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা করাতে পারেননি। অদৃষ্টের এ এক নির্মম পরিহাস।

বিদ্রোহী কবি যখন অসুস্থ, তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিন জন মুসলমান। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন। এরা কেউ তাকে নিয়ে উচ্চবাক্য করেননি, তার জন্য একটা পয়সা খরচ করেননি। এই মহৎপ্রাণ কবি জীবদ্দশায় প্রতারিত হয়েছেন বন্ধুবান্ধব দ্বারা, পরে অবহেলিত হয়েছেন পুস্তক প্রকাশক দ্বারা। কবির ব্যক্তিগত বন্ধুবান্ধবদের কাউকেই সেই দুর্দিনে কাছে পাওয়া যায়নি। নজরুল তার বিবাহিত জীবনে আপন স্ত্রী, শাশুড়ি প্রভৃতি পরিবারের লোকদের সামনে কোনো সময় তিনি নামাজ পড়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা কখনো দেখেনি- কিন্তু ছেলেবেলা থেকে পল্টন জীবনের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ও ঐতিহ্যের তাগিদে তিনি যথাক্রমে মসজিদের খাদেম, মুয়াজ্জিন ও মোলস্নার কাজ করেছেন এবং রীতিমতো নামাজ পড়েছেন। আমাদের কেবলই মনে হয় নজরুল যদি তার আপন ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী অনুকূল পরিবেশ পেতেন, তবে হয়তো তার জীবনে এরূপ মর্মন্তদ করুন পরিণতি দেখবার দুর্ভাগ্য আমাদের হতো না।

কবির বাড়িতে সবসময় পৌষ্য, অতিথি- অভ্যাগত মিলে তার বাড়িতে অতিরিক্ত লোকজনের ভিড় লেগেই থাকত। এতে তাকে এক বিরাট পরিবারের খরচ বহন করতে হতো। অথচ নিজের পরিবার বলতে ছিল মাত্র ২টি ছেলে সানী ও নিনী, স্ত্রী ও শাশুড়ি।

কবি অবশ্য এসব ব্যাপারে কখনো কোনো অভিযোগ করতেন না। শুধু বন্ধুদের বলতেন আমার শাশুড়িকে তোমরা সবাইতো জানই। তিনি বড় দরাজ হাতে খরচ করেন- আমি কিন্তু কিছুতেই কুলাতে পারছি না।

কবির শাশুড়ি গীরিবালা দেবী যে দিন ঘৃণা লজ্জা- ভয় সবকিছু উপেক্ষা করে কবির হাতে তার অপরিণত বয়স্কা দুলিকে (প্রমীলা) তুলে দিয়েছিলেন সেদিন থেকে কবির শাশুড়িকে তার পিতৃকুল, মাতৃকুল, শ্বশুরকুল ও অন্যান্য জ্ঞাতি গোত্রকুল দশদিক হতে ঘৃণা, ভর্ৎসনায় যেভাবে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল তার পরিণতি যে কত মারাত্মক হতে পারে সে তখন কল্পনাও করতে পারেনি। নজরুলের শাশুড়ি (মাসীমার) তখন আত্মীয়স্বজনকে মুখ দেখাবারও উপায় ছিল না। আশ্চর্যের বিষয়, তার মেয়ে জাত দিয়েছে বলে যারা একদিন কবির শাশুড়ির সংশ্রব ত্যাগ করেছিলেন তারাই তার বাড়িতে রবাহূতভাবে আতিথ্য গ্রহণ করতে দলে দলে আসতে লাগল। কবির শাশুড়ি (মাসীমা) এই সব আত্ম-প্রতিষ্ঠার দুর্বার জেদ সামাল দিতে গিয়ে টাকার এমনি পরিস্থিতির উদ্ভব হতো এতে কবিকে যে কতবার কাবুলিওয়ালার কাছে হাত পাততে হয়েছে। তিনি কাবুলিওয়ালার কাছ থেকে মোটা সুদে কোনো কোনো দফায় তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করেছেন। সেই জন্য তাকে কতনা নির্মম লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তার শাশুড়ি গীরিবালা দেবী কবির রোগাক্রান্ত পর্যন্ত এই জিদ বজায় রেখেছিলেন।

কাজী নজরুলের রোগের অবস্থা যখন খুব খারাপের দিকে। এই দুর্যোগের দিনে এলো আর এক ভয়ঙ্কর আঘাত। তখন ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাস। অপরিসীম মমতা দিয়ে এবং প্রাণঢালা সেবা দিয়ে যিনি সারাক্ষণ কবিকে ও কবি পত্নীকে ঘিরে রাখতেন সেই কবি নজরুলের শাশুড়ি গীরিবালা দেবী হঠাৎ নিরুদ্দেশ। কেননা, তার একমাত্র কন্যা পঙ্গু, জামাতা উন্মাদ। তিনিও হয়তো উন্মাদ হয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কাজী নজরুলের এত অধিক গান লেখার পেছনে তার আর্থিক দুরাবস্থা অন্যতম প্রধান কারণ। শেষের দিকে আর্থিক অনটন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তাকে এত অধিক মাত্রায় গান রচনায় আত্মনিয়োগ করতে হয়েছিল এবং ওই পথই অর্থকরী পথ বলে মেনে নিতে হয়েছিল। ফলে একটা নিয়মিত আয়ের জন্য তাকে হিজ মাস্টার্স ভয়েসের আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দীন তার আত্মকথায় নজরুলের অসুস্থতার কথা উলেস্নখ করে বলেছেন, "নজরুলের শেষ লেখাটিও ছাপা হয়েছিল সওগাতেই। এ সময় এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২ খ্রি.) একটা পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেন। সম্পাদক হিসেবে সবাই নজরুলের নাম প্রস্তাব করেন। তিনি রাজিও হয়ে যান। কিন্তু এ সময়ে তার অসুখ শুরু হয়ে যায়। ফজলুল হক সাহেবকে তার শাশুড়ি জানালেন 'জামাই'কে (নজরুল) তো এখন আর বাইরে যেতে দেই না। কারণ রাতেও ঘুমায় না। শুধু গুনগুন করে গান গায়। ভালো লক্ষণ মনে হচ্ছে না। আপনি যখন এসেছেন নিয়ে যান। হক সাহেবের ওখানে আর কাগজ চালাতে পারেননি নজরুল। এভাবেই উচ্ছ্বল নজরুল নীরব হয়ে যান। সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।" এভাবেই সুদীর্ঘ ৩৪টি বছর ধরে (১৯৪২-১৯৭৬ খ্রি.) আয়ত নয়নে কবি শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছেন। কোনো কথা বলতে পারেননি। ফুলের জলসায় চিরকালের মতই কবি একেবারে নীরব হয়ে গেলেন।

নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অনেক গবেষণা হয়েছে ; অনেক হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে এটাও নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু নজরুলের অসুস্থ্য জীবনের গোড়ার কথা সম্পর্কে ড. অশোক বাগচী যে কথা বলেছেন তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তার কথাগুলো নবীন নজরুল গবেষকদের অত্যন্ত কাজে লাগবে বলে আমি বিশ্বাস করি। ড. বাগচীর অসুস্থ নজরুল সম্পর্কের কথা এখানে তার ভাষায় হুবুহু তুলে ধরা হলো।

যে ভদ্রলোক নজরুলের অসুস্থতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ এই কথাগুলো বলেছেন- তিনি হলেন এই উপমহাদেশের চিকিৎসা শাস্ত্রের এক অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তিত্ব। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিউরো সার্জন ড. অশোক কুমার বাগচী। ইনি সর্বপ্রথম নজরুলের অসুস্থ জীবন সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে নজরুলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দাখিল করেছেন এবং বেশ একটা বড় সময় যিনি নজরুল পরিবারের সান্নিধ্যে ছিলেন।

ড. বাগচী জন্মগ্রহণ করেন আমাদের উত্তরবঙ্গের এই রংপুর জেলায় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি আমাদের রংপুর তথা উত্তরবঙ্গের কৃতী সন্তান। যিনি সে সময়ে নজরুলের চিকিৎসার পথ প্রদর্শক ছিলেন। পিতা ও পিতামহ উভয়েই সেকালের নামকরা ডাক্তার ছিলেন। কলেজ জীবন তার কাটে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। তারপর কলকাতায় ডাক্তারি পড়া। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ডাক্তারি পাস করেন। সবকটি বিষয়ে প্রথম। ৫টি বিষয়ে অনার্স। ১৯টি মেডেল এবং ডাক্তারিতে স্কলারশিপ নিয়ে লেখাপড়া শেষ করে নিউরো সার্জারি পড়ার জন্য অষ্ট্রীয়ার রাজধানী ভিয়েনায় যান। ভিয়েনায় অসাধারণ রেজাল্ট করে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে মাস্টারশিপ পাস করেন। এ জন্য তাকে ভিয়েনায় দেয়া হয় "ম্যাগনা কাম লাউডে সার্টিফিকেট"। অচিরেই তিনি জগৎ বিখ্যাত নিউরো সার্জন হয়ে ওঠেন। এই সময়েই ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দেই তিনি কলকাতায় অকস্মাৎ প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিবিড়ভাবে কবি পরিবারের সাহচর্যে আসেন। এর এক বছর পরই ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইনি বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে চিকিৎসার জন্য ভিয়েনায় নিয়ে যান। পরে লন্ডনে কবির চিকিৎসায় তিনি যুক্ত থাকেন। নজরুলের মস্তিষ্কের প্রথম আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো ব্যাপারে তার উদ্যোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই কবি নজরুলের ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনায় এবং লন্ডনে যে বিশ্ববিখ্যাত চিকিৎসকরা যৌথভাবে নজরুলের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন হানস হফ, বিখ্যাত নিউরোলজিস্ট স্যার রাশেল ব্রেইন, নিউরো সার্জন ড. ওয়েলি ম্যাকিসক্‌ এবং বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. উইলিয়াম সার্জেন্ট। ড. অশোক বাগচীও ছিলেন যৌথভাবে তাদের সঙ্গে। ওই পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে নজরুলের ব্যাধি মানসিক বৈকল্য নয়। আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই নজরুল প্রথম বাকশক্তি হারান। এরপর থেকে তার যত রকমের চিকিৎসা করা হয়েছে সবই চিকৎসা ছিল ভুল ও ব্যর্থ। একমাত্র ডা. বিধান চন্দ্র রায়ই আশঙ্কা করেছিলেন নজরুল "স্নায়ুবিক বৈকল্যে" আক্তান্ত হয়েছেন যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে "আল-ঝেইমার্স"। কিন্তু নজরুলের জন্য সে সময় গঠিত মেডিকেল বোর্ড ডা. বিধান চন্দ্রের সুপারিশ কোনোক্রমেই গ্রহণ করেননি। ড. অশোক বাগচীর মতে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের মধ্যে যখন প্রাথমিকভাবে এই রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে এবং সেই সময়ে যদি তাৎক্ষণিকভাবে তার চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো তবে নজরুলের সম্ভবত এই করুণ পরিণতি হতো না। ভিয়েনার এবং লন্ডনের ডাক্তাররা যৌথভাবে মত প্রকাশ করেন নজরুলের চিকিৎসার আর সময় নেই। অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে।

নজরুল শুধু একজন সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন ব্যক্তি হিসেবেও বাঙালির এক আর্দশ প্রতীক। হিন্দু-মুসলমান মিলে এই বাঙালি জাতি। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক বাঙালির চেতনার প্রতীক। সর্বহারা মানুষের দুঃখে আর্দ্র হয়ে উঠতো তার হৃদয়। তার সারা জীবনে যে সব কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ লিখেছেন সেগুলোয় শোনা যায় মানবতার জয়ধ্বনি। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে ২৯ আগস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কবি নজরুল ঢাকার পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃতু্যকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর (১৮৯৯-১৯৭৬ খ্রি.)। তাকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের উত্তর পাশে। কবর থেকে কবি প্রতিদিন শুনতে পাচ্ছেন মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজানের ধ্বনি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে