logo
  • Thu, 16 Aug, 2018

  অনলাইন ডেস্ক    ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০  

মহাদেব সাহার বিষাদ ওড়ানো দিন সমীর আহমেদ

মহাদেব সাহার বিষাদ ওড়ানো দিন সমীর আহমেদ
বিষাদ যেন মানুষের চিরন্তন সঙ্গী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষাদের মজুদও বাড়ে। মানুষ চাইলেও তা এড়িয়ে যেতে পারে না। জীবনের কোনো নিজর্ন মুহূতের্, নৈঃসঙ্গ-চৈতন্যে, মনের গহীনে বিষাদ উঁকি দেয়। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ আপন মনের আনন্দ-বেদনা ভাষাচিত্রে আরেকজনের মনোজগতে, অনুভব-চৈতন্যে জাগিয়ে তোলেন। এ কারণেই তারা পাঠকের প্রিয় হয়ে ওঠেন। যে কবিতা কবির অন্তগর্ত ও পারিপাশ্বির্ক মমের্বদনা ধারণ করে কালপ্রবাহের দূরত্ব ঘুঁচিয়ে অন্যের অনুভব জগতে নাড়া দেয়, তখনই সেই কবিতা হয়তো চিরন্তনতা লাভ করে। এ জন্যই অনেকে বলেন, বেদনা বা বিষাদ স্পশর্ করতে না পারলে কেউ প্রকৃত কবি হতে পারে না। কবি মানেই বেদনার এক চিরন্তন আধার! কিন্তু এই বিষাদগ্রস্ততা শুধু কবি কেন, কোনো মানুষেরই কাম্য নয়। অথচ এই অন্তহীন অন্ধকারে কবিকে ডুবে থাকতে হয়, সতত একাকী, গহন নিজের্ন। এখানে কবি বড় অসহায় ও একা, এমনকি পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে হাজার মানুষের ভিড়েও। মহাদেব সাহা, (জন্ম ৫ আগস্ট, ১৯৪৪-) জীবনের একটা পযাের্য় এসে, এই বিষণœতাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। জীবনের সব বিষাদগ্রস্ততা ঝেড়ে ফেলে ক্ষণিকের জন্য হলেও হতে চেয়েছিলেন নিভার্র, হালকা। জীবনের পলে পলে জমে ওঠা বিষাদ তিনি উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন ‘দূরের ঝাউবনে’, ‘ধানপাকা মাঠ ক্ষেতে’। ‘পাহাড়ে নিজের্ন’ ‘সাত সমুদ্র’ তের নদী পার করে দিয়ে ‘শ্রাবণে বষের্ণ’ বিষাদ ভিজিয়ে, ধুয়ে-মুছে হতে চেয়েছিলেন বিষাদ শূন্য মানুষ। তারপর যাপিতজীবনের ক্লেদাক্ততা, পাওয়া, না-পাওয়ার সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে এই জনকোলাহল, ‘মাঘের কোকিল’, ‘ফাগুনের চঁাদ’, ‘ভোরের ফুল’, ‘উদাসীন মেঘ’, ‘রাতজাগা পাখি’দের ছেড়ে তিনি যেতে চেয়েছিলেন দূরে কোথাও। কঠোর জীবনবাস্ততার চার দেয়ালের সীমা পেরিয়ে আরও বেশি ছায়াসংলগ্ন হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এটাকে কি আত্মপলায়ন বলে? কেনই বা তার এই আত্মপলায়নপর স্পৃহা? বুকের ভেতর কেনই বা ফেণিয়ে উঠেছে এত অভিমান? এ কি অতি বঞ্চনার অভিঘাত থেকে তৈরি? তারপর ক্রমশ নিরাসক্ততা, নিলির্প্ততা ও নিমোর্হতার দিকে তার যাত্রা? এ যাত্রার শেষ কোথায়? জীবনের অন্তিম শয্যায়? এ হিসাব করতে গেলে একটা দীঘর্শ্বাসই শুধু বেরিয়ে আসে। অন্তর-বাহিরের বেদনায় পিষ্ট হয়ে কবি যে অমর পঙক্তিমালা সৃষ্টি করে যান, ভাগ্য ভালো হলে তা হয়তো অগণন পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত হতে পারে। অথর্-বিত্তও কিছুটা হতে পারে। কিন্তু এ সৌভাগ্যের শিকা কয়জনের ভাগ্যে ছিঁড়ে? শুধু বাংলাদেশ কেন উন্নত বিশ্বের কবিরাও আজকাল কবিতা লেখাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে বড় শঙ্কাবোধ করেন। বেঁচে থাকার জন্য বা জীবিকা নিবাের্হর জন্য তারা কবিতা লেখার পাশাপাশি বেছে নেন অন্য কোনো বৃত্তি বা পেশা। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে, তার জীবন যে ভীষণ বিশৃঙ্খলা ও দুবির্ষহ হয়ে উঠবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আজকাল যারা কবিতা লিখতে আসেন, তারা তা জেনে বুঝেই পা রাখেন এ জগতে।

মহাদেব সাহা হয়তো অগণন পাঠকের হৃদয় স্পশর্ করতে পেরেছেন, কবিখ্যাতি, পুরস্কার বা স্বীকৃতিও তার স্বল্প নয়, উল্লেখ করার মতোই। দেশের নামিদামি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে এককালে আয়রোজগারও ভালোই করতেন। কিন্তু কবি কি সাধারণ মানুষের মতো বৈষয়িক হতে পারেন? পারেন না। সমাজ-সংসারে সে চিরকাল অবৈয়ষিক, উদাসীন। কবিতার প্রতি এক দুভের্দ্য আত্মিক টান, দৃঢ় আত্মনিমগ্নতাই তাকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। কবিতা ছাড়া তার কোনো স্বজন নেই, বন্ধু নেই। কেউ তার আত্মার গভীর ক্রন্দন শুনতে পায় না। তার চারপাশে শুধু ঘনায়মান অন্ধকার, অসীম শূন্যতা। সেই অন্ধকার ও শূন্যতার মধ্যে ডুবে কবি অনুভব করেন নিঃসীম নিজর্নতা, দুঃসহ বেদনা। নিজেকে শূন্য ও ক্লান্তিকর মনে হয়। জীবনের কোনো এক টানাপড়েনে, দুঃসময়ে মহাদেব সাহারও এমনই মনে হয়েছিল :

কোথায় দঁাড়াল এসে তাহলে

জীবন,

মিশে গেছে সব পদরেখা, সব চিহ্ন

আজ আমি তোমারই বুকে অনন্ত শূন্যতা;

কেউ আর শোনে না আমার কণ্ঠ

কেউ আর দেখে না আমার মুখ।

আমি এক দূর ছায়া অপসৃয়মাণ

ঘন অন্ধকারে।

আমাকে পাবে না আর জলের কল্লোলে

জাগরণে. অধীর জ্যোৎ¯œায়

আমি খঁা খঁা শূন্য মাঠ বিরাণ মানুষ হয়ে গেছি;

[কাব্যসমগ্র ৪, মহাদেব সাহা, পৃষ্ঠা ২৩]

দুঃখের ‘তমিস্রার তীরে’ ‘¤øান ধূসর গোধূলি’ যেন তাকে গ্রাস করে ফেলে। কবির দুঃসময় ও বেদনার সাগরে নিমজ্জিত হবার কোনো দিন-তারিখ থাকে না। যে কোনো সময়ই সে পতিত হতে পারে সুখের পাহাড় থেকে নিচে বেদনার নদীতে। নিজের জীবনে পলে পলে জমে ওঠা বঞ্চনার পয়সা-আধূলিই তাকে এক সময় দুঃখ ভারাক্রান্ত করে। আর এসবই হয়ে ওঠে একজন কবির কবিতার বিষয়। মহাদেব সাহা, তার বেদনার তিমিরে অবগাহনের সময় বা কাল উল্লেখ করেছেন ‘তুমি আজ ¤øান অস্তাচলের পথিক’ কবিতায়। প্রতিনিয়ত সমাজ-সংসারের চাপে একজন ভাঙাচুরা, নিঃসঙ্গ, বিষণœ মানুষের মুখ চিত্রিত হয়েছে এ কবিতায় :

‘তুমি আজ পোড়-খাওয়া ভাঙাচুরা একটি মানুষ

তুমি আজ পঞ্চাশেই নব্বুই- পেরুনো,

তোমার চোখের দিকে চেয়ে মনে হয় কী ভীষণ আতঙ্ক বেঁধেছে বাসা

তুমি আজ বড়ো দুঃস্বপ্নতাড়িত যেন কতকাল একটু শান্তিতে

তুমি ঘুমোতে পারো না।

[প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা ২৬]

এই ‘দুঃস্বপ্নতাড়িত’ মানুষটিই মহাদেব সাহা। দুঃখের বিচিত্র রঙ দিয়ে তিনি এঁকেছেন জীবনের জলছবি। স্বকালে, সংসারে প্রিয়জনরা যখন তার অযোগ্যতা ও অক্ষমতাকে অবহেলা করে ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ, তখন মুষড়ে পড়েছেন। ‘পুত্রকে’ কবিতায় এই অপার বেদনার অনুষঙ্গ পাঠককে নাড়া দেবেই।

‘কোনো মনোকষ্টে তুই এভাবে ফেরলি মুখ

অযোগ্য পিতার প্রতি’

[প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা ২৬]

নিজের অক্ষমতা নিয়ে, কায়ক্লেশে স্বদেশের মাটিতে, জল-হাওয়ায় বেঁচে থাকতে চেয়েছেন মহাদেব সাহা। তিনি হয়েতো জেনে গেছেন জীবনের চরম সত্য, মানুষ আপন না হলেও স্বদেশের প্রকৃতি কখনো পর হয় না। জীবন ও আত্মার সঙ্গে মিশে থাকে। জীবনানন্দ দাশের মতো তাকে মুগ্ধ করেছে ‘উদাস ঘুঘুর ডাক, স্তব্ধ সেই বিজন দুপুর. মাছরাঙা, শাদা বক’ আর ‘শেফালিফুলের ঘ্রাণ’। ‘এই তুলসী, ডুমুর, আমলকী, পেয়ারার শীতল ছায়ায়’ তিনি ঘুমাতে চেয়েছেন আজীবন।

বস্তুত কোথাও যাওয়ার সাধ ছিল না আমার

এখানেই নুন মরিচের গন্ধে জড়িয়ে থাকার ইচ্ছে মনে, এই

শ্যাওলা দীঘির ধারে

আদাবন, কঁাঠালপাতার কাছাকাছি, বহুদূরে কখনো চাইনি যেতে

দূরের ভ্রমণে রোমাঞ্চ সত্তে¡ও এখানেই এই কঁাঠালের বনে

দেখেছি রয়েছে মন পড়ে

[এইসব গন্ধে গানে : প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা ৪২]

কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিমর্ম। মন না চাইলেও জীবনের প্রয়োজনে, সংসারে স্ত্রী-সন্তানদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য বাধ্য হয়ে মহাদেব সাহাকেও ছাড়তে হয়েছে স্বদেশ ভূমি। বেঁচে থাকার আশা ও ভরসা যখন প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন এ ছাড়া আর উপায় কী? স্বদেশের মায়া ছেড়ে মহাদেব সাহা পাড়ি জমিয়েছেন সুদূর কানাডায়, প্রিয় সন্তানের কাছে। এই বৃদ্ধ বয়সে, অসুস্থ শরীরে, এদেশে তিনি কার কাছে থাকবেন? এ যান্ত্রিক ও পূঁজিবাদী বাণিজ্যিক শহরে কে তাকে আশ্রয় দেবে পরম মমতা দিয়ে? তাই তিনি দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবেই জীবনের কাছে, নিজের অনিচ্ছার কাছে, রূঢ় সময়ের কাছে পরাজিত হন একজন কবি! কানাডায় গেলেও তিনি স্বস্তিতে নেই। বাংলাদেশের জল-হাওয়া ও মানুষ এবং নিবিড়, ¯িœগ্ধ, মায়াময় প্রকৃতির জন্য অহনির্ষ তার মন কঁাদে। বিদেশ বিভূঁইয়ের অনাত্মীয়, নিবার্ন্ধব পরিবেশ ও প্রকৃতি ছেড়ে তিনি ছুটে আসতে যান জন্মভূমিতে। কিছুদিন আগে ফেসুবুকে তার করুণ আকুতিভরা স্টেটাস পড়ে পাঠকের মন নিশ্চয় নাড়া দিয়েছে। তিনি নাড়ির টানে ফিরে আসতে চান এদেশের মাটিতে। আমরা চাই, জীবনের সব দুঃখ-বেদনা বা বিষাদ উড়িয়ে দিয়ে, সুস্থ দেহে তিনি ফিরে আসুন এদেশের মানুষের কাছে, প্রকৃতির কাছে। আগামী ৬ আগস্ট তার জন্মদিন। জন্মদিনে কবিকে অফুরন্ত ফুলেল শুভেচ্ছা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near 'WHERE news_id=6226' at line 3