logo
মঙ্গলবার ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৫

  তানিয়া তহমিনা সরকার   ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০  

জন্মদিনের শুভেচ্ছা

মহাদেব সাহা সবুজ হাতছানি

মহাদেব সাহা সবুজ হাতছানি
বাংলাদেশের কবিতার ধারায় অন্যতম প্রধান কবি মহাদেব সাহা (জন্ম-১৯৪৪)। কবি হওয়ার ইচ্ছে শৈশবেই লালন করেছিলেন তিনি। সিরাজগঞ্জ জেলার ধানঘড়া গ্রামে যে শিশুটি ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেছিল, সে শিশুটিই তার পূণর্ যৌবনে শুধু কবি হওয়ার তীব্র ইচ্ছে নিয়ে ঢাকায় পদাপর্ণ করেছিল ১৯৬৯ সালে। ১৯৭২ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার ভুবনে পদাপর্ণ করেন মহাদেব সাহা। দীঘর্ পথচলায় তিনি এখনও কবিতার সঙ্গেই বসবাস করছেন। কবি হওয়ার যে ইচ্ছে শৈশবে তিনি পোষণ করেছিলেন, যৌবনে যে কারণে বড় চুল রেখেছিলেন, কঁাধে তুলে নিয়েছিলেন ঝোলা ব্যাগ, পরনে পাঞ্জাবি, সেই কারণেই কোনোদিন পেশাদার চাকুরে হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। জীবন ও জীবিকার সমন্বয় করতে না পেরে পাড়ি দিয়েছেন মহাসমুদ্র, বসবাস করছেন সুদূর কানাডায়। কিন্তু দেশে ফেরার আতির্ তার প্রবল। দেশের মাটি, তার নিযার্স, প্রকৃতির সবুজ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। স্বদেশের মাটির সৌগন্ধ, ঋতুর পরিক্রমা, বণির্ল নিসগর্ তাকে আকুল করে তুলেছে। কবিতার যে দীঘর্পথে তিনি হেঁটেছেন, তার বড় একটি অংশ দখল করে আছে স্বদেশবন্দনা ও প্রকৃতিপ্রেম। স্বভাবতই দেশপ্রেমে বঁুদ এই আবেগমগ্ন কবির পক্ষে দেশের বাইরে থাকা নিজর্ন কারাবাসেরই শামিল। দেশে ফিরে আসার অক্ষমতা থেকে তার ভেতরে তৈরি হয়েছে অসীম বেদনা, যার পরিচয় তার রচিত কবিতার মাধ্যমেই প্রকাশ করা যায় :

আজন্ম তোমার জন্য ভয়ানক দুঃখী আমি

মনমরা, এমন একাকী

সেই কবে ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি নিঃসঙ্গ বালক

কেন কেউ তা জানে না।

কবির কাছে দেশপ্রেম মানেই মুক্তিযুদ্ধের প্রখর চেতনা, শহীদ মিনারের সুউচ্চ সুগভীর অস্তিত্ব। স্বদেশের অনুপস্থিতিতে তার অনুভ‚তিপ্রবণ হৃদয়ে তৈরি হয় আতর্ হাহাকার। জীবন দিয়ে দেশকে ভালোবাসেন তিনি। সন্তানের চেয়েও তার কাছে প্রিয় সোনার বাংলাদেশ। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে জজির্রত বাংলাদেশ থেকে অনেকেই তাকে পরবাসী হওয়ার পরামশর্ দিয়েছিল। অনেক আত্মীয়-বন্ধু চলে গিয়েছিল পরবাসে, ভিন্নধমীর্ বন্ধুরা কেউ কেউ ঘৃণ্য রাজনীতির প্রভাবে হয়ে উঠেছিল চরম স্বাথর্পর ও নিমর্ম। এরপরও তিনি দেশকে ত্যাগ করতে পারেননি। স্বদেশের সবুজ মানচিত্র, নদী, ঘাস, ফুল অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে রেখেছিল তাকে। আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধকারীদের তালিকা কবিতায় দিয়েছেন মহাদেব সাহা :

একুশের বইমেলা, শহীদ মিনার,

পয়লা বৈশাখের বটমূল, রমনার মাঠ-

আমার কত যে প্রিয় তুমি এই বঙ্গোপসাগর,

করতোয়া, ফুলজোড়, অথই উদাস বিল,

পুকুরের সাদা রাজহঁাস

নিবিড় বটের ছায়া, ঘন বঁাশবন।

দেশের আকাশ, ভোরের শিশির, উদাসীন মেঘ, স্নিগ্ধ বনভ‚মির ওপর অধিকার রয়েছে দেশের আপামর জনসাধারণের। কোনো পক্ষের সবলতা দুবর্ল মানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। আথির্ক, মানসিক বা শারীরিক সুবিধার কারণে মহাদেব কখনই দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাননি। স্বাধীন স্বদেশে সপ্রেমেই বসবাস করতে চেয়েছিলেন তিনি :

আমাকে কি ফেলে যেতে হবে এই নদীর কল্লোল

ভাটিয়ালি গান, কাশফুল, চেনা ঝাউবন

এই দীঘি, জলাময়, প্রিয় সন্ধ্যাতারাÑ

ফেলে যেতে হবে এই স্মৃতির উঠোন

প্রেমিকার মুগ্ধ চোখ, মায়াময় দিব্য হাতছানি

মহাদেব সাহা কখনও দেশ ছেড়ে পৃথিবীর সবাের্পক্ষা মনোরম স্থানেও যেতে চাননি। দেশ ছাড়ার প্রশ্নে তার বুকে পদ্মার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, দু’চোখ বেয়ে নেমেছিল শ্রাবণের ধারা। ঘরের মেঝেতে মায়ের অঁাকা ল²ীর সারি সারি পা ছেড়ে চলে যাওয়ার কল্পনাতে অঁাকড়ে ধরে স্বদেশের বুক, লুকিয়ে পড়তে চেয়েছেন। দেশের মাটি, সান্নিধ্য ছেড়ে, আকাশের আত্মীয়তা ছেড়ে কোথাও যেতে অক্ষম ছিলেন তিনি। কিন্তু কমর্হীন কবি পারেননি স্বদেশকে ধরে রাখতে। বিদেশে পাড়ি জমাতেই হয়েছে তাকে। তবে দেশ ও বাংলা ভাষার প্রতি তার মমত্ব গভীর ভালোবাসা হয়ে অক্ষম অভিমান জমিয়ে রেখেছে। যে ভাষায় প্রথম কথা বলেছেন, যে ভাষায় কথা বলে শান্তি অনুভব করেন, সযতনে তাকে বুকের খনিতে হিরার মতো লুকিয়ে রেখেছেন তিনি :

... এই একটি বাংলা শব্দের মধ্যে

মিশে আছে পৃথিবীর সাতটি সমুদ্র; তাই আমি তোমাকে ভালোবাসি

বলার সাথে সাথে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে সবগুলি নদী

গিয়ে মেশে পৃথিবীর প্রতিটি নদীতে,

এই বঙ্গোপসাগর যেন আটলান্টিক হয়ে যায়।

বাংলাদেশকে ভালোবেসে কবি বাংলার প্রকৃতিকেও জানান সাদর আমন্ত্রণ। দেশকে ভালোবেসে দেশের প্রতিকণা মাটি, প্রতিবিন্দু উপাদানের প্রতি তার জন্মেছে গভীর অপত্য স্নেহ। মহাদেব সুমিত ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন বাঙালির এই প্রাণের টানকে। বাংলার আকাশ, সাগর, পাখি, ফুল, নদী সবার বুকে বাজে এক ও অভিন্ন গান, দেশের প্রতি ভালোবাসা। তাদের হৃদয়ে শোনা যায় চযার্পদের গান। বাঙালি হিসেবে মহাদেব সখ্য অনুভব করেন নদীর সঙ্গে। তার বুকের মধ্যে নড়ে ওঠে ষড়ঋতুর আবেশ। তিনি মনে করেন, বাংলা ভাষা, গান, গদ্য, সাহিত্য, নিসগর্ ও ঐতিহ্য নিয়েই পরিপূণর্ একজন বাঙালির জীবন:

তুমি কি বাংলার ফুল, গন্ধে তাই ফোটে সন্ধ্যাতারা,

সহস্র বছর যেন এইভাবে নামে বৃষ্টিধারা,

ভেজে এই দুই চোখে, ভেজে গীতবিতানের পাতা

তোমার বুকের মাঝে অভিধান, কবিতার খাতা;

তুমি কি বাংলার ফুল, তুমি কি বাংলার এই পাখি

বাংলা অক্ষর তুমি, তোমাকে বাঙালি নামে ডাকি।

স্বাজাত্যবোধ থেকে উদ্ভ‚ত দেশপ্রেম মহাদেব সাহাকে চালিত করেছে বাংলার সাথে একাত্ম হতে। হৃদয়ের নিজর্ন অনুভবে দেশকে বসিয়েছেন মায়ের পাশে। মা, মাটি, দেশ তার কবিতায় সমানভাবে প্রোজ্জ্বল। দেশের প্রতি যুক্তিহীন ভালোবাসার স্রোতে নিমগ্ন মহাদেব পাঠকের মনেও তৈরি করেছেন সশ্রদ্ধ সম্মান। তার দেশপ্রেমমূলক কবিতাপাঠে যে কোনো পাঠক দেশপ্রেমিক হতে বাধ্যÑ এখানেই কবি মহাদেব সাহার সাফল্যের প্রামাণ্য ধরা পড়ে।

দূর বিদেশে মহাদেব সাহার অপ্রাপ্তির পূণর্তা, দুঃখের পাহাড়ে তৈরি হওয়া শূন্যতার ছেঁায়া তাকে শেষ অবলম্বন হিসেবে অঁাকড়ে ধরতে শেখায় দেশে থাকার সেই অমল মুহূতর্গুলো। তার অশান্ত উন্মুখ মন শৈশব-কৈশোরের তেপান্তরের মাঠে ছুটে বেড়াতে চায়। স্মরণের ক্ষরণে তার চোখ অশ্রæভারাক্রান্ত হয়। ফেলে আসা গ্রাম, স্মৃতির শৈশব, প্রকৃতির বণির্ল সৌন্দযর্ তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় বতর্মান শৃঙ্খলিত অধীনতার কথা। মগ্নচৈতন্যে তিনি দেশে ফিরে আসেন, দেখে যান তার উত্তরবঙ্গের দুঃখিনী গ্রাম, শুনতে পান টিনের চালে বৃষ্টির নূপুরের ছন্দ। গ্রামের ‘উলুঝুলু বন’, ‘বিষণœ পাথার’, ‘খালের মতো শুকনো নদীটি’ তার কাছে এখন রূপকথার ঘোড়ায় চড়ে দেখা স্বপ্নরাজ্যের মতো। ঘুঘুর ডাক, হুতোম পেঁচার শব্দ তার কানে তৈরি করে অপূণর্ রাগিনী। তিনি হৃদয়ে অনুভব করেন শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি :

কতদিন হয়নি যাওয়া আমার সবুজ গ্রামে

সোনাবিল, পদ্মদীঘি, উত্তরবঙ্গের

সেই ধুলোওড়া পথ, বিষণœ পাথার,

আখ মাড়াইয়ের দৃশ্য, ক্লান্ত মহিষ

কতোদিন হয়নি দেখা;

স্মৃতির এক আজলা জলপানে মহাদেব সাহা পরদেশে নিজেকে বঁাচিয়ে রাখছেন। অচেনা পরিবেশে চেনা মানুষ ও প্রকৃতির রোমন্থনে উপভোগ করতে চান তিনি পুরনো গন্ধের সৌরভ। শৈশবের মতো নদী-জল-বৃক্ষ-পাখির সংস্পশর্হীনতার মালিন্য দূর করতে স্মৃতির জলপানে তৃষ্ণা মেটান অন্তরের :

আজ খুব ইচ্ছে করে ¯œান করি নদীজলে নেমে

ইচ্ছেমতো মাখি শরীরে জলের গন্ধ, দেখি

কীভাবে লাফিয়ে পড়ে সরপঁুটিগুলি-

শুনি পুরনো টিনের চালে মধ্যরাতে সেই বৃষ্টিপড়া,

আজ খুব ইচ্ছে করে উদলা গায়ের শৈশববেলায় ফিরে যাই;

অচেনা পরিবেশের অমীমাংসিত শূন্যতা ও বেদনা থেকে যে সংক্ষুব্ধ আবেগের সৃষ্টি তাকে উপেক্ষা করতে মহাদেব সাহা স্বদেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েন। সময়ের অস্থিরতা ও হাহাকার তাকে পরিব্রাজকের মতো নিয়ে যায় বাংলার সবুজ সজীবতার কাছে। কিন্তু স্বদেশে ফেরার অনিশ্চিয়তায় তার বুকে জমে ওঠে গোপন অশ্রæ। ব্যক্তিক মানুষ ব্যষ্টিক পরিবৃত্তি ছেড়ে জীবনযাপন করলেও সংক্ষুব্ধ কবি বেদনার অভিমানে নীল হতে থাকেন। তার মনের মধ্যে দেখা দেয় প্রশ্নের দোলাচলতা :

মনে আছে আমার কথা কি সজল বষার্র নদী

চৈত্রের উদাসীন মাঠ, কবি লাউডঁাটা

গহনার নাও, অষ্টমীর মেলা!

আমার কথা কি মনে আছে রাতজাগা চঁাদ

সবুজ শস্যের মাঠ-

মরাকান্নায় মত্ততায় সময়ের পাগলাঘণ্টির অমোঘ নৈরাশ্য থেকে তাকে কেবল ছায়া দিতে পারে, স্নিগ্ধ জল সিঞ্চন করতে পারে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও নদী। আজ মহাদেব সাহার জন্মদিন। বেঁচে থাকার তাগিদে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া এই অভিমানী কবি আবারও দেশে ফিরে আসুনÑ শুভদিনে এই আমাদের শুভকামনা। স্বদেশের প্রতি তার প্রগাঢ় অনুরাগ আমাদের জানিয়ে দেয় কতটা নৈরাশ্যে তার বসবাস। স্মৃতির ভিড়ে জেগে থাকা স্বদেশ নয়, সজীব সবুজ, সুনীল আকাশ আর মাটির সৌগন্ধের মাদকতা তাকে আমৃত্যু ঘিরে রাখুক জড়িয়ে থাকা আপনজনের মতো। শুভ জন্মদিন, হে কবি।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে