logo
মঙ্গলবার ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৫

  সত্যরঞ্জন সরকার   ০৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০  

রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরম্পরার অহঙ্কার

রবীন্দ্রনাথ  উজ্জ্বল পরম্পরার অহঙ্কার
রবীন্দ্রনাথ এক বিশাল বিস্ময়। ব্যপ্তি আর দ্যুতির বণর্চ্ছটায় উদ্ভাসিত সাহিত্য সংস্কৃতির এক বৃহৎ বলয়। বিন্যাস ব্যঞ্জনায় রংধনুর সপ্ত রং-ও তার স্নিগ্ধতার কাছে হার মানে। পরিমাণের ব্যাপকতা এবং গুণমানের সৌকষর্ তাই সমকালীন সাহিত্যে আজও বিরল। সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনের নতুন নতুন ঘরানার জন্ম হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে সব কিছুই ফ্যাকাশে মনে হয়। আর তাই ‘অলি বার বার ফিরে আসে’ এই নরোত্তমের কাছে। কারণ জাতিকে যারা পথ দেখান তাদের কাছে আমাদের বার বার ফিরে যেতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন ভারতবষের্র পশ্চিম বাংলার প্রাণকেন্দ্র কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসঁাকোর ঠাকুর পরিবারে কিন্তু সমগ্র বিশ্বের বণর্, গন্ধ, ছন্দ, গানে জীবনকে তিনি ভরিয়ে তুলেছিলেন। তার গ্রহিষ্ণুমন গ্রহণ বজের্নর মধ্যে দিয়েই সীমা ও অসীমের সেতু রচনা করেছে। সমস্যা সংকুল সমাজ ব্যবস্থার প্রতি পদে পদে বিচরণ করার অভিজ্ঞতার জন্য হয়তো জন্মসূত্রে নগরের হলেও কমর্সূত্রে তিনি গ্রামের তথা স্বদেশকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় গভীর সমবেদনায় বোঝার চেষ্টা করেছেন। পেয়েছেন নিবিড় একাত্মবোধে-আবিলতা মুক্ত ভালবাসায়। তাই সমাজ ও দেশের নানা সমস্যা তাকে ভাবিয়েছে। প্রায় সময়ই শিক্ষা, ধমর্-ভাষা সাহিত্য ও অংকনের নন্দন তত্ত¡ তার ভাবনার জগতকে উতলা করেছে। কারণ তিনি শুধু কবি নন, তিনি কবি মনীষী-দাশির্নক। সৌন্দযের্র প্রতি মানুষের ভাবনা, কল্পনা, মন, মনন, চিন্তা, অভিজ্ঞতা তথা অনুভূতির শিল্পসম্মত অবয়বের ভিতর দিয়ে, পরম সত্যকে পাওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ ব্যাকুল ছিলেন। তঁার ভাষার ‘এই চরম সত্য উপলব্ধির ফলে আমি নিদ্ধির্ধায় বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, মানুষের মন যে ডাকে সবচেয়ে গভীর ভাবে সাড়া দেয় তাই হল সৌন্দয্যর্, সত্যম-শিবম-সুন্দরম’।তাছাড়া জীবনকে তিনি নতুন দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। যে দৃষ্টির মধ্যে ছিল অবিনশ্বর চিৎপ্রকষর্ময় সচ্চিদানন্দ আর যুক্তিবাদী মননশীলতা।

রবীন্দ্রনাথকে আমরা বাঙালিরা প্রায় যেন জন্ম সূত্রেই পেয়ে থাকি। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের বাতাস যেন, এ যে, কতখানি প্রাণদায়ী তা আমাদের ভাবার দরকার করে না। আমাদের চিন্তা ভাবনা, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, রুচি সব কিছুর মধ্যেই আছে রবীন্দ্রনাথ। জন্মকাল থেকে আমরা এই প্রাণবায়ু গ্রহণ করেছি জ্ঞাতে অজ্ঞাতে। আমাদের আছে বলে আমরা ভাবি না। বিশ্ব মযার্দায় তো দূরের কথা এশিয়া বলয়ের বাইরেপ্রাপ্তির আশা যেখানে বতর্মান যুগে ক্ষীণ, আর তৎকালীন সময়ে বঙ্গজ ঋষি সরাসরি বিশ্ব কবি এবং নোবেল প্রাইজ নিয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে রাজ সিংহাসনে বসালেন-একি ভাবা যায়?

‘রবীন্দ্রনাথের মতো যুগসন্ধি কালের যে কোন মনীষী বা কমর্বীরকে বুঝতে হলে তঁাকে দেখতে হবে তার স্বদেশ, তার স্ব-কাল আর তার স্বভাবের দাবীর সঙ্গেমিলিয়ে। ভাষান্তরে বলতে পারি তাকে দেখতে হবে তার জাতীয় ঐতিহ্যের সংগে তার সমকালের প্রতি প্রকৃতির সঙ্গে তৎকালীন আধুনিকতার সঙ্গে এবং চরিত্রের বিশিষ্টতা বা তার নিজত্বের সঙ্গে মিলিয়ে। কারণ-

‘বিস্মৃত যুগে দুলর্ভ ক্ষণে বেঁচে ছিল কেউ বুঝি,

আমরা যাহার খেঁাজ পাই না তাই সে পেয়েছি খঁুজি।’

(রোগ শয্যায়-আমার দিনের শেষে ছায়াটুকু)

‘রবীন্দ্রনাথের মত আত্মনিমগ্ন শিল্পীর কতটাই বা প্রকাশ পেয়েছে ব্যবহারিক জীবনে, যদিও তিনি ছিলেন একাধারে কবি ও কমীর্ তার জীবনে ছিল বরাবরের বিরোধ-বিতকের্ শোকে-দুঃখে, স্পন্দমান, সমাদর ও বিদূষণে দোলায়িত তবুও সেই সব তৎসময়িক তরঙ্গের অনেক গভীরে ছিল তার শান্ত, সৌম্য, নৈঃশব্দ, ছিল একাগ্রতাও ঐকান্তিক প্রবতর্না’। একদিকে আপন জনের মৃত্যু আত্মীয়দের সঙ্গে মনোমালিন্য, কমের্ক্ষত্রে কমর্নীতির প্রতি অবজ্ঞার জন্য মনোকষ্ট, অন্যদিকে পরিণত জীবনেও নিন্দার তীযর্ক বান তাকে সইতে হয়েছে। যেমন-

‘তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা-

আমার সুরের অপূবর্তা

আমার কবিতা, জানি আমি

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সবর্ত্র গামী’।

সাহিত্যের আনন্দের ভোজে।

নিজে যা পারি না দিতে নিত্য আমি থাকি তার খেঁাজে

আর তাই তিনিই বলতে পারেন-

সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের চুরি করা

ভালো নয়, ভালো নয়, নকল সে সৌখিন মজদুরী।

অবজ্ঞার তাপে শুষ্ক নিরানন্দ সেই মরুভূমি

বসি পূণর্ করি দাও তুমি’।

-(জন্মদিনে-ঐক্যতান)

আজও তিনি নিন্দা সমালোচনা থেকে রেহাই পাননি। অথচ কত সহজে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের জন্মোৎসবে বলেছিলেন, ‘যতদিন বেঁচে থাকা যায় ততদিন প্রীতি, ক্ষমা, ধৈযর্্য সহিষ্ণুতা, এগুলোরই যথাথর্ভাবে প্রয়োজন। সম্মান না হলেও ক্ষতি নেই-চলে যায়’। এ কথা শুধু হয়তো তার মুখেই মানায়। কারণ তার নিজস্ব বিশ্বাসের বিশ্ব ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে কখনও ঘটনাবতের্ স্খলিত হয়নি। আর তাই বিশ্বতানের ধ্রæবপদের সুর শুনে ছিলেন তার জীবন গানে-যার জন্য তিনি গেয়েছিলেন-

‘আমি কান পেতে রই-

ও আমার আপন হƒদয় গহন দ্বারে বারে বারে’

রবীন্দ্রনাথের বহু রচনায় এমন সব বিষয় আছে যা চিরকালীন ও সাবর্জনীন। আজকের দিনেও তা স্বাভাবিকভাবে বহুপ্রাসঙ্গিক, প্রেম প্রকৃতি, স্বদেশিকতা, সৌন্দযর্, প্রকৃতি, আধ্যাত্মচেতনা,মানবিকতাবোধ, আত্মতত্ত¡দশর্ন ইত্যাদি রবীন্দ্র সাহিত্যে উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত। এসবের প্রাসঙ্গিকতা, আজও ফুরিয়ে যায়নি। প্রেম মনুষের জীবনে মৌল এবং প্রবল এক অনুভূতি। অনুভূতিপ্রবণ হƒদয় থেকে এ প্রেম উৎসারিত হয়, বণির্ল রাগে বিকশিত হয় প্রেমের সে অমলিন কুসুম। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যৌবন লগ্নের আবহমান বাংলার নৈসগির্ক সৌন্দযের্র সঙ্গে প্রেমের ললিত কোমল অভিব্যাক্তির কাব্যিক প্রকাশ আমাদের পরিপূণর্ করে।

দক্ষিণ ডিহির মৃণালিনী দেবীকে বধূ রূপে বরণ করার পরে ভাবুক রবীন্দ্রনাথ ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্য গ্রন্থের ‘হƒদয় আসন’ কবিতায় লিখেছেনÑ

‘কোমল দুখানি বাহু শরমে লতায়ে

বিকশিত স্তন দুটি আগুলিয়া রয়

তারি মাঝখানি কি রে রয়েছে লুকায়ে

অতিশয় সযতœ গোপন হƒদয়’।

অথবা, সোনারতরী কাব্যে ‘নিদ্রিতা’ কবিতায় যে চিত্র লেখনীর সাহায্যে তিনি এঁকেছেন তাতে রবীন্দ্র মানসে যৌবন লগ্নের প্রত্যেক যুবকের কৌত‚হলই ধরা পড়ে-

‘একটি বাহু বক্ষ করে পড়ি

একটি বাহু লুকায়ে একাধারে

অঁাচলখানি পড়েছে খসি পাশে

কঁাচল খানি পড়িবে বুঝি টুঁটি

পত্র পুটে রয়েছে যেন ঢাকা

অনাঘ্রাত পূজার ফুল দুটি’।

আসা-যাওয়া বিয়োগের বিচ্ছেদ পরিপূণর্ এ পৃথিবীর আকাশ বাতাস। চলমানতা পৃথিবীর চিরন্তন রীতি। এক সময়ের প্রাণ প্রাচুযের্্য উজ্জ্বল ঝলমলে আঙিনা একদিন কুয়াশার ধুসর রঙে ¤øান হয়ে যায়। এক সময় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় বাসন্তী উৎসব। বিবাগী বাতাস নৈঃশব্দের দেশে পাতা ঝরায়, গান শোনায়। আসলেই সব কিছুই একদিন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। সাজানো বাগান, নিকানো আঙ্গিনা, পুষ্পিত বৈভব, গগনচুম্বী ঐশ্বযর্। প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম থেকে কারো পরিত্রাণ পাবার জো নেই। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পরে ১৯২০ সালে লেখা এই কবিতাটি সেই কথাটাই মনে করিয়ে দেয়-

‘ভালো তুমি বেসেছিলে এই শ্যামধারে

তোমার হাসিটি ছিল বড় সুখে ভরা

তোমার সে ভালো লাগা মোর চোখে অঁাকি

আমার নয়নে তব দৃষ্টি গেছ রাখি।

আজি আমি একা দেখি দু’জনেরই দেখা

তুমি করিতেছ ভোগ মোর মনে থাকি

আমার তারায় তব মুগ্ধ দৃষ্টি অঁাকি ।

‘তুমি আজি মোর মাঝে আমি হয়ে আছো

আমার জীবনে তুমি বঁাচো ওগো বঁাচো’।

কবির প্রিয়তমা পতœী, প্রাণের দোসর আজ নয়ন সম্মুখে নেই। তবু ‘তুমি করিতেছ ভোগ মোর মনে থাকি’। কবির নিখিল বিশ্বে পরিব্যাপ্তি হয়ে আছে পতœীর সোনালি স্মৃতি। উপরোক্ত কবিতায় পতœীর বিয়োগ ব্যথায় ভরাক্রান্ত কবি হৃদয়ের হিরন্ময় উদ্ভাস পাঠক হৃদয়কে ব্যথিত করে, আপ্লুত করে। এখানে সংবেদনশীল হৃদয় প্রসূত মূছর্না আর উপমা অলঙ্কারের শীতল প্রদীপ্ত অনন্য শ্রী ফুটিয়ে তুলেছে।

কবিতা মাত্রই ভাষার ভিন্নতর বিন্যাস এবং শ্রেষ্ঠ কবিতা ভাষায় সীমাবদ্ধ অসীমতা। কবিতার এই বৈশিষ্ট্যকেই সম্ভবত “শেলী” অনন্ত উৎসের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন । যার মধ্যে এক যুগে লোক অবগাহন ও আনন্দিত হয় এবং অন্যতর যুগেও যার আকষর্ণ ও প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায় না। সেখানে প্রতি মানুষই অস্পষ্ট যন্ত্রনায় ভোগে। অনিবর্চনীয় দুঃখ চিরকালই মানুষের হৃদয়কে ভরাক্রান্ত করে রেখেছে। অপ্রাপণীয়ের সঙ্গে মিলনের আকাক্সক্ষায় মানব মন চিরকালই আকুল। বৈষ্ণব দাশির্নকরা এই বিষয়টিকেই ব্যাখ্যা করলেন সীমা অসীমের সম্পকের্র রূপক দিয়ে। আর রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনÑ

‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বঁাজাও আপন সুর’।

সীমা শুধু অসীম চাইছে,। অসীম কে পাবার জন্য সীমার প্রাণে যে কত যন্ত্রণা, কত অগণিত রূপে যে তার প্রকাশ ঘটেছে যেমন:-

‘বিশাল বিশ্বের আয়োজন মন মোর জুড়ে থাক অতি ক্ষুদ্র, তারি এক কোন’।

(জন্মদিনে-ঐকতান)

রবীন্দ্রচ্ছটার দ্রæতির বিকিরণ সাহিত্যধারে এক ‘সোনার উষার বিন্দু’। সভ্যতা যদিও যুথবদ্ধ মানুষের সংঘদ্ধমনীষার ফল তার সংস্কৃতির ফসলে ঘোষিত হবে ব্যক্তি মানুষের জয়যাত্রা, কালের সীমা ও স্থানিক শৃঙ্খলা থেকে বিচ্যুত এক সমাজ নিরপেক্ষ ব্যক্তিবাদের বিমূতর্ রূপ ঋদ্ধ আঙ্গিক সবর্স্ব আত্মিকথনই আমরা লক্ষ্য করি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে-

‘মিলে গেছে ওগো বিশ্ব দেবতা মোর সনাতন স্বদেশে’

অনেক গ্রহণ বজের্নর প্রক্রিয়া পেরিয়ে স্বদেশ ভাবনার যে পরিচয় আমরা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে পাই তাতে স্বদেশ প্রেমের যে পরাকাষ্ঠা তিনি দেখিয়েছেন, তা তুলনাহীন। ১৯২০ সালের বন্ধুবর অজিত চক্রবতীের্ক লেখা চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন- ‘আমাদের জন্য একটি মাত্র দেশ আছে, সে হচ্ছে বসুন্ধরা। একটি মাত্র নেশন আছে- সে হচ্ছে মানুষ’। তার স্বদেশ ছিল ত্রিভুবন অথচ যারা কুণ্ঠা ছিল না গেয়েও উঠতে-

‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা।

তোমাতে বিশ্বমায়ের, তোমাতে বিশ্বময়ীর অঁাচল পাতা’।

আবার তিনি জানালেন-

‘হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথা

অন্য কোনো খানেÑ

এই উচ্চারণের মাঝে খঁুজে পাওয়া যায় এক বিশ্ব বিহারি রবীন্দ্রনাথকে যিনি-গাইতে পারেন,

‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’।

আবার তিনিই বলেন,

‘সব ঠঁাই মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া

দেশে দেশে মোর ঘর আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া’। (উৎসগর্)

‘দেশে জন্মালেই দেশ আপন হয় না।...

নিজের সমস্ত ধন মন প্রাণ দিয়ে দেশকে যখনই আপন বলেজানতে পারব তখনই দেশ-আমার স্বদেশ হবে’।

(রবীন্দ্রনাথ-দেশের কাজ-পল্লী প্রকৃতি)

রবীন্দ্রনাথের মতো এতখানি বিশুদ্ধ সম্মোহবজির্ত, মৌলিক ও সদথর্ক স্বদেশ ভাবনা আজ কি নেতা-নেত্রীদের মধ্যে খঁুজে পাওয়া যাবে? যাবে না বলেই যত দলাদলি যত রক্তপাত যত সংঘষর্।

শুধু দেশকে কেন? ‘ভালোবাসা’ ছাড়া কাউকেই যথাথর্ভাবে আপন করা যায় না। যথাথর্ভাবে পেতে হলে নিজেকে যথাথর্ভাবে বিলিয়ে দিতে হয়। যথাথর্ভাবে দেওয়া অথর্ স্বাথর্বজির্ত ভাবে দিতে হয়। আর সেখানেই দ্ব›দ্ব দেখা দেয় ‘আমির’ সঙ্গে। ব্যক্তিস্বাথের্র বেড়াজালে ভোগ পিয়াসী মনকে অবদমিত রেখে কে পারে বৃহৎ ‘আমির’ মধ্যে ডুবে যেতে? তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘যে দিকে আমি পৃথক সে দিকে স্বাথর্ও পাপ, যে দিকে ‘আমি’ এক সেদিকে ত্যাগও পুনঃ যে দিকে আমি আলাদা সেদিকে কঠোর অন্ধকার, যেদিকে সে এক, সে দিকে কোমল প্রেম। এভাবে ‘আমার আমি ও বিশ্ব আমির মধ্যে চিরকাল খেলা করছে। তার জন্যই এত কেন্দ্রানুগ, কেন্দ্রাতিগ শক্তির বিরোধ। খেলাটা একবার বুঝতে পারলে ‘আমি’ ও ‘আমি না’র ‘দ্ব›দ্ব সমাধান হবে এক দ্বৈতের উপলব্ধিতে। সেই মহামানবের আগমনের জন্য আজকের মানবের তপস্যা। তপস্যার রাত্রি দীঘর্-কঠোরতা দুঃসহ, কিন্তু সিদ্ধি বিলম্বিত হলেও অনিবাযর্’।

কারণ-

‘ আমার আমির ধারা মিলে যেথা যাবে ক্রমে ক্রমে’।

রবীন্দ্রনাথ এ ব্যাপারে প্রভাত কুমার মুখোপ্যাধায়কে আরও লেখেনÑ

‘যিনি ‘আমি’ নামক এ ক্ষুদ্র নৌকাটিকে সূযর্, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র হইতে লোক লোকান্তর, যুগ-যুগান্তর হইতে একাকী কালস্রোতে বাহিয়া লইয়া আসিতেছে, যিনি আমাকে লইয়া অনাদি কালের ঘাট হইতে অনন্তকালের ঘাটের দিকে কি মনে করিয়া চলিয়াছেন আমি জানি না, সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত সৌন্দযের্ আমি যাহাকে খÐ খÐভাবে স্পশর্ করতেছি, যিনি বাহিরে নানা এবং অন্তরে এক, যিনি ব্যাপ্তভাবে সুখ-দুঃখ, অশ্রæহাসি এবং গভীরভাবে আনন্দ ‘চিত্রা’ গ্রন্থে আমি তাহাকেই বিচিত্রভাবে বন্দনা ও বণর্না করিয়াছি।

একথা অনস্বীকাযর্ যে মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের মূল্যবোধগুলো পুরানো হলেই তার সব বাতিল হয়ে যায় না। সমাজ সংসারে নানা ঘাত প্রতিঘাতে সবকিছু পালটে গেলেও অনেক মূল্যবোধের চির সত্য, প্রজন্ম, পরম্পরা থেকেই যায়। তার থেকে সরে এলে সমাজ সংসারটা যান্ত্রিক হয়ে যায়, মানবধমের্ বিশ্বাসী, সংবেদনশীল বিবেকী মানুষেরা তখন সেগুলো বঁাচিয়ে রাখার জন্য এগিয়ে আসেন। রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’ -এ তাই দেখতে পাই ‘কিšুÍ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পযর্ন্ত রক্ষা করব, আশা করব মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘ মুক্ত আকাশে, ইতিহাসের একটি নিমর্ল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূবার্চলের সূযোর্দয়ের দিগন্ত থেকে’। তাই-

‘কি জানি কি হলো আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ

দূর হতে শুনি মহাসাগরের গান’।

(নিঝের্রর স্বপ্ন ভঙ্গ),

অথবা

‘বিশ্ব রূপের খেলা ঘরে কতই গেলাম খেলে-

অপরূপকে দেখে গেলাম দুটি নয়ন মেলে।’

(গীতাঞ্জলী-যাবার দিন)

শান্ত, সৌম্য, সংযত বেদনাতর্ অথচ ভবিষ্যৎ বিষয়ে অপরাজেয় আশা ও আস্থার গরীমাদীপ্ত তার উচ্চারণ ‘সভ্যতার সংকট’ এ যেমন আছে তেমনি আমার জীবনে আছে নানা ভাবের খেলা, তাই আমার কাব্যেও বেজেছে নানা সুর। আমি শিল্পী, তাই জীবনকে কখনও এড়িয়ে যেতে চাইনি। আমি সবার্ন্তবাদী সমগ্রকেই মানি।’

‘জীবনের খর স্রোতে ভাসিছ সদাই

ভুবনের ঘাটে ঘাটে-

এক হাটে লও বোঝাও শূন্য করে দাও অন্য হাটে।’

(বলাকা- শাজাহান)

একথা রবীন্দ্রনাথই বলতে পারেন। কারণ-

‘জগতের মধ্যে আমাদের এমন ‘এক’ নাই যাহা আমাদের চিরদিনের অবলম্বনীয়। প্রকৃতি ক্রমাগতই আমাদিগকে ‘এক’ হইতে একান্তরে লইয়া যাইতেছে-

বিমূতর্ ধারণাদি নিয়ে যারা ভাবতে পারেন এবং জ্ঞানের সঙ্গে অস্তিত্বের সম্পকর্ বিশ্লেষণ এবং মানব প্রজাতির মানস বিকাশের ভেতর এই সম্পকর্ কত রকমের রূপ নিয়েছে তারই অনুসন্ধানে যারা নিরন্তন ব্যাপৃত তারাই মনীষী। রবীন্দ্রনাথ মহা-মনীষী। কারণ কবিতা লিখতে গেলে ঘনীভূত আবেগের প্রয়োজন। অনুধাবন, অনুভূতির প্রগাঢ় প্রতীতিকে সঞ্চিত করে রাখার মতো আধারের উপস্থিতিতে ও থাকা চাই,এবং সেই সঙ্গে জীবন যন্ত্রণার মন্থনে উত্থিত দুঃখ-কষ্ট যন্ত্রণাময় তন্ময়তার মধ্যেমূল্য বোধের উদ্ভাস ও জরুরি এবং এই সমস্ত গুণাবলি বিচ্ছুরণের কারণেই অনিন্দ্য সুন্দর অনিবাণর্ উজ্জ্বলতার রবীন্দ্র কাব্যে সবর্ত্র বিদ্যমান তার ভাষায় ‘জীবনের অজ্ঞাতসারে অনেক মিথ্যাচার করা যায়, কিন্তু কবিতায় কখনও মিথ্যা কথা বলি নে-সেই আমার জীবনের সমস্ত গভীর সত্যের একমাত্র আশ্রয় স্থান।’

আর একারণেই সাহিত্য শিল্পের প্রসারে সদথর্ক বিচরণের জন্য বাঙালীর কাছে রবীন্দ্রনাথ উজ্জ্বল পরস্পরার অহঙ্কার।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে