logo
  • Sun, 18 Nov, 2018

  ফজলুল হক সৈকত   ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

জন্মদিনের শুভেচ্ছা কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক

জন্মদিনের শুভেচ্ছা  কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক
কথাশিল্পী আনোয়া সৈয়দ হকের জন্ম ৫ নভেম্বর ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ। পেশায় মনোরোগ চিকিৎসক হয়েও বিস্তৃত হয়েছেন তার সাহিত্যকমের্। বিশেষ করে ছোটদের জন্য লেখা বইগুলো অসাধারণ হয়েছে; তার স্বামী বাংলা সাহিত্যের অনন্য নক্ষত্র সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক। যুগলসাহিত্য সংসারে তারা এক ও অভিন্ন। সৃষ্টির বাণী গভীর ও প্রাণরস সমৃদ্ধÑ যা হৃদয়ের গহীনে গিয়ে অনুভূত হয়। সময়ের সঙ্গে তার সাহিত্যে চোখে পড়ার মতো যদি বলি তার অনন্য সৃষ্টি সেই ভাষণটি শোনার পর। শিশু-শৈশব, বয়স্ক ব্যস্ত মানুষ, বঙ্গবন্ধু, তার ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঘরে ঘরে নিচুস্বর, ফিসফিস কথাবাতার্, মিলিটারির দফায় দফায় গুলিবষর্ণ, ছাত্রলীগের মহড়ায় উত্তপ্ত ভাসিির্ট, স্বাধীনবাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন, উড্ডীন বাংলাদেশের পতাকা, ধনী গরিবের সংসার, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, শহীদদের শোক মিছিল, রবীন্দ্র-নজরুলের পরিচিতি গানের আবেগ বিহŸলতা, নানি-নাতির সখ্যতা, কাজের বুয়াদের সঙ্গে সম্পন্ন পরিবারের সম্পকর্, জনমনে দুঃখকষ্ট, লাগবের চিন্তা, মাতৃভাষার প্রতি মমতা, ভাষার জন্য রক্তদানে পুণ্য, না ফেরা ভাষা সৈনিকের লাশ, বাঙালির আত্মপরিচয়, বৈজ্ঞানিক ভাষা বাংলা, বঙ্গবন্ধুর জেল-জুলুম, রেসকোসের্র ভাষণ, জনতার ঢল, হাতে রক্ত পতাকা, জয় বাংলা, স্কুলে জাতীয় সংগীত, বৈষম্য, অসহযোগ আন্দলন, মুক্তিসংগ্রাম, সকালের সূযর্ আকাশজুড়ে দপদপ আলো, বঙ্গবন্ধুর বেড়ে উঠা রাজনৈতিক উত্তরণ, আমাদের বঙ্গবন্ধু, সমবেত জনতা, ইতিহাসের পাতায় রক্ষিত ভাগ্যবান শ্রোতা ইতিহাসের মহত্তম অধ্যায়ের মতো বেশ সমৃদ্ধ ও অনন্য কুশলতায় অপূবর্ নান্দনিক অঁাচড়ে বাঙালি বাংলাদেশেরর সৃজনগুণে সমৃদ্ধ করেছেন।

২. তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নক্ষত্র, তার বাল্যনাম আনোয়ারা বেবী চৌধুরী তের-চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই লেখালেখির হাতেখড়ি কচিকঁাচার আসর বিশ^বিদ্যালয় শিশুতোষ রচনাবলির মধ্যে যার নাম শোনা যেত। সে থেকেই বুঝা যেত সাহিত্যে তার আগমন আগে থেকেই। এখানে নারী শিশু ও যুবকদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল চুক্ষে পড়ার মতো চরিত্রগুরু এমনভাবে এসেছে যেন দেশপ্রেমের ভেতর দিয়ে ক্রমাগত হৃদয়কে খামছে ধরে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতি আবালবৃদ্ধবনিতা সবার যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তা এখানে মিঠু চরিত্রের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে পাঠককে টেনে নিয়ে যায়। এ টান চিরকালীন ও সবর্ গ্রহণীয় বলা চলে; এটি একটি মুক্তি যুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের চেতনাগত ক্যানভাস।

শিশুদের সঙ্গে বড়রা সব কথা শেয়ার করে না। তাদের মনে নানা জটিলতা অঁাকিবুকি দিতে পারে। তেমনি কথা হচ্ছে মা এবং বুলু মামার সঙ্গে। সন্দেহ বাতিক মন মিঠুর। কেউ আড়ালে কিছু বললে সে অনেক কিছু ভাবে। কী জানি হয়তো কঠিন কথা তাই বলছে না; কিন্তু মা তো আমাকে সব বলে, কোনো কথা গোপন রাখতেন না, তাহলে তিনি রাখছেন কেন? যদি তার সুযোগ ঘটে, মাকে এ কথা জিজ্ঞেস করব। কিন্তু সে কি তার বুলু মামাকে খুব ভয় পায়? তার বন্ধু নান্টু তো বলে বড়দের ভয় পাওয়া এটা নাকি নিয়ম। নান্টুর সৎ মা রয়েছে, তার দিকে সে সহজেই তাকাতে পারে না। তাদের উভয় সংসারে ভয়াতর্ এ যুদ্ধকালীন সময়ে শিশুদের ভয় এবং লাল শাড়ির চিত্র সে রক্তাক্ত সময়। চিত্র এরকমÑ ‘আমার মায়ের লাল একটা টকটকে লালশাড়ি আছে, সেই শাড়ির গায়ে অনেক জরির কাজ আছে। মাকে কখনো যদি বলি, মা লালশাড়িটা পরেন, তো মা হেসে কুটিপাটি হয়ে বলেন, দূর বোকা! ওটা তো আমার বিয়ের শাড়ি। বিয়ের লালশাড়ি পরে কেউ কি বাহিরে যায়?’

পঁচিশ বছরব্যাপী শোষণ, যুগব্যাপী সামরিক চাপ, বাঙালির জাতির মনে ঘুরতে থাকে একাত্তরের রণাঙ্গন। এই যুগচঞ্চল ঘাত আমাদের কথাসাহিত্যে যুক্ত হয়েছে। নতুন সীমারেখা ও রক্তঝরার মতো স্মৃতিপট হিসেবে মাচর্ মুক্তিযুদ্ধকালে পাক হানাদার বাহিনী গুলিবষর্ণ করে লুটোপুটি খায় নিরীহ বাঙালির ওপর। মহান বিজয় এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বগুণসমৃদ্ধ কখনো হালকা কখনো গভীরভাবে ছায়া বিস্তার করেছে। এ উজান স্রোতের যাত্রী ছিলেন অনেকেই। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু রুশদ, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, আবু ইসহাক শওকত ওসমান, সরদার জয়েন উদ্দিন, শাহেদ আলী, শওকত আলী, জহির রায়হান, আনোয়ার পাশা, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ সবার উপন্যাসেই মুক্তিপাগল মানুষকে পাকসেনা কতৃর্ক হত্যা নিযার্তন গুমের চিত্র এসেছে। আনোয়ারা সৈয়দ হক তার সেই ভাষণটি শোনার পর উপন্যাসে চারুলতা ধরের নিহতের দৃশ্য এভাবেই এঁকেছেন। বুলু মামার প্রতি মায়ের স্নেহপরায়ণতা, ভাসিির্টতে ছাত্রলীগের উত্তপ্ত মিছিল, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র নিয়ে মজলুম নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, নুরুল আমীন, আতাউর রহমান, মুজাফফর আহমদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

নুরুল আমিন ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ছাত্রদের ওপর গুলিবষের্ণর হুকুম দেয়, তার সঙ্গে আলোচনা সঙ্গত নয়, মিঠুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তার মা কথাগুলো বলেনÑ সে সময় সবার কথাগুলো ছিল ঘরোয়া কথার মতো; বাহিরে কেউ শুনতে পাবে। কারণ তারাই তো পাকসেনাদের খবরটা পৌঁছাত। এ বিপদ রেখায়Ñ ‘মামা বলছেন, বুবু, দেশের এই বিপদে আমাদের মুজিব ভাই, জোর গলায় বলছেন, আজ সব বাঙালিকেই একজোট হতে হবে। শুধু তাই না, তিনি ভাসিির্টর ছাত্রনেতাদের ডেকে গোপনে স্বাধীনবাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার নিদের্শ দিয়েছেন। এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্ররা পহেলা মাচের্ই এটা গঠন করে ফেলেছে। এসব হচ্ছে গোপন খবর। আপনি কি বুঝতে পারছেন, বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে বাংলার স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন?’

৩.বিপুল সম্ভাবনার দার খুলে দিয়েছে ছাত্রসমাজ। তাদের শ্রম মেধা এবং ¯েøাগানে মুখর হয়ে উঠেছিল বিশাল মুক্তিযুদ্ধের সময়। উত্তপ্ত হয়েছে ভাসিির্টর নেতৃত্বে ছিলেন সে সময়ের তুখোড় ও আকরÑ নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আব্দুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ। ইয়াহিয়া সরকার কারফিউ জারি করেছে, নেমে পড়েছে ছাত্র, শ্রমিক, জনতা। গুলি চলছে, বুক পেতে দিয়েছে জোয়ানরা, কান্না আর শোকের মাতমে পুরো ভ‚মি। লাশ ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছে স্বাধীনতাই মুক্তি। ঐ দিকে আ স ম আব্দুর রবের উড়ানো পতাকা উড়ছে ঈশানে-বিশানে। বঙ্গবন্ধু কারাবরণ করেছেন জীবন ও বাস্তবতাকে মেনে। বাঙালিকে আলো দেখিয়েছেন, জন বিপ্লব তৈরি হয়েছিল। ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে পাক হানাদার বাহিনী পালাতে বাধ্য হলো। ধীরে ধীরে তৈরি হলো নতুন ভ‚মি ‘বাংলাদেশ’।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য প্রবন্ধ রয়েছে এমনÑ সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, যা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা, কিন্তু সেটি বড় কথা নয়। সৈয়দ হকের ভেতর মুক্তিযুদ্ধ একটি ভিন্ন প্রভাব ফেলেছে। তার নিমার্ণকালকে তিনি বিশ্বাস করেছেন ওই যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস তীব্র এবং প্রচÐ আত্মবিশ্বাসী শক্তির কাছে।...

পাঠক থামে না, থামার কোনো প্রয়োজনও থাকে না। তেমনি আনোয়ারা সৈয়দ হকের সেই ভাষণটি শুনার পর মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিষয়টি পাঠককে চেতনার দিকে নিয়ে যায়। মুক্তির উৎসের দিকে বারবার ধাবিত করে।

৪. আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। ধীরে ধীরে উন্নত হবে। সবার চোখেমুখে সুন্দরের রেখা দেখা দেবে। সমাজ ও দেশ মানুষের মাঝে পরিবতর্ন আসবে; কিন্তু পরিবতের্নর সরলীকরণে যুক্ত হয়েছে চুরি-চেঁচামি, ভÐামি, যুথসই কাজ। রাস্তাঘাটের কাজ হয় কদিন বাদেই চাড়বাকল উঠে গতর্ হয়ে যায়। শুরু হয় জনদুভোর্গ, এরা নিকৃষ্ট প্রজাতি; এদের মন মানসিকতা দুবর্ল। তবে কারো মধ্যে সমাজ বদলের চিন্তাও ছিল না, হলে তো যা এগিয়েছে তা সম্ভব হতো না। এমনই চিন্তা মিঠুর, সে ইঞ্জিনিয়ার হবে। তার বাবাও তা ছিল। ধানমন্ডি যাওয়ার সময় রাস্তার বেহাল দশাই তাকে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখায়, এখানে ব্যক্তি প্রেমের চেয়ে বড় দেশপ্রেম।

ভাষাপ্রেম বাঙালির মনের সঙ্গে গ্রথিত। ইংরেজি আন্তজাির্তক ভাষা, বাংলা মাতৃভাষা, উদুর্ হলো জোর করে গেলানো ভাষা। বাংলাভাষা তা বুঝেও না মানতেও নারাজ; কিন্তু উনিশশ’ বায়ান্ন সালে পাকিস্তানি শাসকরা বলে একমাত্র উদুর্ই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সে কথা বাংলাভাষীরা মেনে নেয়নি। ঢাকা ভাসিির্টর ছাত্রদের প্রতিবাদÑ কারফিউ ভঙ্গ করে সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউর রফিকের রক্তে শোধিত হয়ে আত্মপরিচয়ের ভাষা হলো বাংলা। রেসকোসর্ (ঘোড়াদৌড়ের মাঠ)। ৭ মাচর্ বঙ্গবন্ধু জনতার সম্মুখে চেতনার বাণী শুনিয়েছিলেন, উত্তপ্ত হয়েছিল মাঠ, সে রেস ছড়িয়েছিল মাঠেঘাটে, বনে-বিজনে, চায়ের চুমুকে, অলিতে গলিতে জাগ্রত হয়েছিল পুরো জাতি ঝঁাকে ঝঁাকে বীর সন্তান জাগ্রত। রেসকোসর্ কানায় কানায় পূণর্ হয়ে আশপাশে নেমে ছিল জনতার ঢল, জীবন্ত হয়ে উঠে মরা ঘাস। গলা নামিয়ে সে কথাই বলছে মিঠুর মা আর বুলু মামা। আগামীকাল তারা ১০টায় পেঁৗছে যাবে কারণ দেরিতে গেলে জায়গা পাবে না। আগরতলা মামলায় ছাড়া পেলেন বঙ্গবন্ধু। তাকে একনজর দেখার জন্য ভিড়ের মধ্যে মাথা ঘুরে পড়েছিল একদিন। বরাবর তিনঘণ্টা দঁাড়িয়েছিল; কিন্তু দেখা হলো না। আজকে কী হবে সে কথা বুলু মিঠুর মাকে স্মরণ করাচ্ছে। বুলু, শেখ মুজিব বলছে, কেন বঙ্গবন্ধু বলছেÑ সে বিষয়ে সাবধান করে বলছেÑ ‘শুধু শেখ মুজিব, শেখ মুজিব বলবিনে, বল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কেন, তোরাই তো সেদিন রেসকোসর্ মাঠে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিটা দিলি? তো তাকে চোখে দেখা তো সেদিন বড় কথা ছিল না, বড় কথা ছিল তার মানসিক জোর বাড়িয়ে দেয়া। কতদিন পরে জেল থেকে তিনি বেরোলেন, সে কথা কি ভুলে গেলি? সেই কাজটা তো সেদিন আমরা, বাঙালিরা করতে পেরেছিলাম, নাকি?’

৫.

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তির জন্য ¯েøাগানে ¯েøাগানে মুখরিত হয় পুরো দেশ। ¯েøাগান মুক্তির দাবি আদায়েরও আটর্। সময়ের গতরে এ ধারা বয়ে আসছে। কোনো ¯েøাগান কারো কাছে খুব প্রিয় হয়ে দাবির শেকড়ে রয়ে গেছে যখনই কোনো সংকট তাড়া করে ভেসে উঠে সে ¯েøাগান। আবার চেতনা ডেকে পাঠায় ইতিহাস ঐতিহ্য হয়ে রয়ে যায় বুনন হয় পরম্পরা। মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ¯েøাগান-

১.পদ্মা মেঘনা যমুনা

তোমার আমার ঠিকানা

২. তুমি কে আমি কে

বাঙালি বাঙালি

ফেস্টুন প্লাকাডর্, মাইকে গান হচ্ছে, কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট।

২. জাগো, অনশন যদি বন্দিরে ওঠরে যত, জগতের লাঞ্ছিত, নিপীড়িত।

পতাকার রং, শিক্ষকরা ছাত্রদের জাতীয় সংগীতচচার্, নীতিকথা, দেশপ্রেম, মনের প্রশ্ন জিইয়ে না রাখা পাকিস্তানিদের ফঁাকি জন্মের পর থেকে বাঙালিকে চাকরি-বাকরি, খেলাধুলা, লেখাপড়া, বিদেশে পাঠানো, সৈন্যবাহিনীতে ভতির্ হতে না দেয়া, করাচি ছিল রাজধানী এ দেশের মানুষের পক্ষে এটি মেনে নেয়া সম্ভব নয়। অথচ-

‘আমাদের দেশের আদি ইতিহাস, আমাদের দেশের ভাষা, আমাদের নানি-দাদি আমলের বাঙালির উৎসব, সবকিছু ভুলিয়ে দেয়ার জন্য দিব্যি আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে লাগল।’

এসব রক্ষার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু। তার দল জয়ী হলো, কিন্তু ক্ষমতা দিল না, নানা রকম টালবাহানা শুরু করল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা হলো; তার মা স্কুলে যাচ্ছে না। দিগন্তে উত্তপ্ত আবহাওয়া। মায়ের কথা, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, এ কথাগুলো মিঠুর কানে কানে বলছে। প্রশ্নাত্মক মিঠু জানতে চায় মা কানে কানে বলছে কেন? আমি তো গালর্স্গাইড, যেখানে চাকরি এবং বেতন পাই তা তো তাদের। সে সময় অনেকেই মনে মনে স্বাধীনতা চায়, কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কারণে মুখ বন্ধ রেখেছে।

৬.মিঠু ইঞ্জিনিয়ার হবে, নান্টু তার ভালো বন্ধু, এ কথা সে তাকেই বলেছে, কারণ ভালো বন্ধু না হলে সব কথা শেয়ার করা বিপজ্জনক। কিন্তু নান্টু তাকে বলেÑ গাছে কঁাঠাল গেঁাফে তেল। তারা আমাদের পরাধীন করে রেখেছিল। দেশ স্বাধীন হলে ভালো ফলাফল করলে চাকরি মিলবে, বিদেশে ভ্রমণে যাওয়া যাবে, নেপালের হিমালয়, ভারতের আগ্রায় সম্রাট শাহজাহানের তাজমহল দেখা যাবে। মিঠুকে না দেখার ফন্দি করে বলেÑ ইংরেজি জানে না, বাহিরে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। সিদ্ধান্ত হলো মিঠু যাবে, কালুর মা ও সে মনে করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তারও শোনা দরকার। রেসকোসর্ ঘোড়দৌড়ের মাঠ, আজ ঘোড়া নেই, জনতার জমায়েত। যতদূর চোখ যায়Ñ “শুধু মানুষ, মানুষ আর মানুষ। আর কোনো মানুষ খালি হাতে আসছে না। সবার হাতে একটা করে বঁাশের লম্বা লাঠি, বা লম্বা একটি সড়কি বা কাগজের ব্যানার, বা ফেস্টুন বা মাছ ধরার জাল বা বঁাশের লগি বা এরকম কিছু না কিছু। আর সিনেমায় দেখা সমুদ্রের গজের্নর মতো গলায় ¯েøাগান চলছে, পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা; বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। তোমার আমার ঠিকানা শেখ মুজিব শেখ মুজিব। জয় স্বাধীন বাংলা।’ জনতার ভড়ে বুলুর বন্ধু বলল, এত ভিড়ে তাকে নিয়েছে কেন, মিঠুকে নিরাপদ রাখতে আটর্ কলেজের বারান্দায় যেতে বলল, সেখানে গিয়ে দেখ কত মানুষ, দূর থেকে দেখা যায় আটর্ কলেজের জঙ্গল। লোকে টিটকারি করছে। তার মা তাকিয়ে আছে জন ঢলে। দুজন লোক তকর্ করছেন, শেখ মুজিব কী হাত মিলাবে। রোগা লোকটি রেগে বলল, কখনো না, শুনো তাহলে তার বৃত্তান্ত। বঙ্গবন্ধু ছোটবেলার নাম খোকা। ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী, তার ছিল ভরাট কণ্ঠ। প্রতিনিধিত্ব করার মানসিকতা ছিল তুখোড় ও আপসহীন। সেই স্পশর্ ও প্রাণিত স্বর থেকে ইংরেজদের রাজত্ব, বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা ফজলুল হক, মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর্ গোপালগঞ্জে তার স্কুলে গেলে কিশোর বঙ্গবন্ধু দেখলেন সবাই বড় নেতাদের প্রশংসা করছেন, কিন্তু জরাজীণর্ বিদ্যালয়ের কথা কিছুই বলছেন না, সহপাঠীসহ দঁাড়িয়ে গেলেন আমাদের কিছু অভিযোগ আছে স্যার। কী তোমাদের অভিযোগ?

স্যার আমাদের হোস্টেলের ঘরের ছাদ দিয়ে বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টিতে আমাদের বইপত্র ভিজে যায়। আমাদের বিছানা ভিজে যায়, জোর কণ্ঠে বিষয়গুলো বললেন শেখ মুজিব।

তারপর তাকে গেস্ট হাউজে দেখা করতে বলেন, শহীদ সোহরাওয়াদীর্। সে থেকে শুরু হলো রাজনীতির ক্যারিয়ার। উনিশশ’ ছেষট্টি সালে শুরু হলো ছয় দফা আন্দোলন। এমন কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে মিঠু। তার মাঝে কেউ কেউ নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা বিষয়ে মৃদু আলাপ করছেন। বকবাদ্য করছেন, কে বঙ্গবন্ধুকে চিনে। তার মা চুপ থেকে হঠাৎ চেঁচিয়ে বললেনÑ ‘উরেব্বাস, কী বিশাল তার চেহারা! মাথা ভতির্ কালো চুল। লম্বা খাড়া শরীর। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপরে হাত কাটা কুচকুচে কালো কোট, চোখে কালো ডঁাটির চশমা। সেই চশমায় সাতই মাচের্র রোদ যেন ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে।’ মানুষের উজান ক্ষরণে ঝঁাকিয়ে উঠা মানুষের সারি- ‘হাতে সবুজ পতাকা, প্লাকাডর্ পেস্টুনে সয়লাব, দূরে জঙ্গলে গাছে মাথায় সারস। মাথার উপরে হেলিকপ্টার দুলছে। হঠাৎ বেঁজে উঠল কালের কণ্ঠস্বর। ভায়েরা আমারÑ সেই বঁাশির শব্দ যেন ধীরে ধীরে বৈশাখী ঝড়ের মতো শোঁ শোঁ হয়ে গেল, হতে হতে কাল বৈশাখির মতো কালো জটাজালে ভয়ঙ্কর এক সুন্দর হয়ে গেল। কাল বৈশাখী থেকে প্রচÐ এক তাÐব, আর সেই তাÐবের ভেতরে আমি আর মা, মা আর আমি, দুলতে দুলতে, ঝুলতে ঝুলতে আমাদের হাতে হাত, আর সেই সঙ্গে অনেক মানুষ, তাদের লাখ লাখ হাত, লাখ লাখ ওপরে ওঠা হাত, লাখ লাখ লাঠি, লাখ লাখ ওপরে ওঠা লাঠি, বৈঠা, লগি, সড়কি, মাছ ধরার জাল, ফেস্টুন, ফ্লাগ, পোস্টার, আর ভেতর থেকে শুধু দিকে দিকে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত, ভায়েরা আমার, ভায়েরা আমার, ভায়েরা আমার...”

৭. কিশোরসুলভ নান্দনিক লেখা উপন্যাস সেই ভাষণটি শোনার পর, কিশোর মিঠুর মনে রাষ্ট্র তৈরি ও মেরামতের চিন্তা, সে অনেক বিষয়ে অপরিণত, কিন্তু প্রশ্নবাণে পুষ্পিত। আসলে কিশোরদের মনে নানা প্রশ্ন থাকে এগুলো তাদের নাড়া দেয়। এখানে তার মনে নানান প্রশ্নÑ পতাকা, স্বাধীনতা কি, ভোট কি, ভাষা কি, মগের মুল্লুক, খুব খারাপ শব্দ ও বিষয়গুলো নরম ও আবেদনময়ী হলো। মৌলিক বিষয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যা ঐতিহাসিক ভাষাতাত্তি¡ক অলংকার প্রসূত হয়ে উপন্যাসটিকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু এবং তার উন্মুখ চিন্তা অবদানকে সহজসূত্রে হৃদয়ে ও মননে ধারণ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। বলা যায়Ñ পূবের্ বঙ্গবন্ধুকে এবং তার অসামান্য অবদানকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা, তা কোনো কালেই সম্ভব হবে না। জাতীয় ও আন্তজাির্তকভাবে যেমন সংরক্ষিত হয়েছে, শিল্প সাহিত্যেও রক্ষিত হয়েছে। এখানে আনোয়ার সৈয়দ হক নিবিড় পরিচযার্য় দরদের শেকড়ে গভীরভাবে তা প্রোথিত করেছেন। তা জানার সামান্যতেই বুঝা যায় এটি অসামান্য রচনার গ্রন্থ। অন্তগর্ত চেতনের জায়গা থেকে নবায়িত পত্রপল্লবে আঁকা সৃষ্টি কণ্ঠের সৃষ্ট হিরক প্রতিম উপন্যাস।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে