logo
  • Wed, 21 Nov, 2018

  অনলাইন ডেস্ক    ০৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

মূল লু স্যুন

খোং ইজি

অনুবাদ মনির তালুকদার

খোং ইজি
লুজেনের শুঁড়িখানাগুলো চীনের অন্যান্য এলাকার মতো নয়। এসব শুঁড়িখানায় রাস্তার মুখোমুখি সমকোনী কাউন্টার আছে যেখানে মদ গরম করার গরম পানি থাকে। দুপুরে বা সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফেরার সময় লোকজন একবাটি মদ কেনেন। বিশ বছর আগে এর দাম ছিল চার পয়সা আর এখন দশ পয়সা। কাউন্টারের পাশে দঁাড়িয়ে গরম মদ পান করে তারা অবসাদ দূর করে। মদের সঙ্গে খাবার জন্য আর এক পয়সায় এক প্লেট নোনা বঁাশের অংকুর বা মৌরী মসলা দেয়া মটরশুঁটি কেনা যায়। আর বারো পয়সা হলে পাওয়া যায় এক প্লেট মাংস। কিন্তু ওই খদ্দেরদের প্রায় সবাই গরিব তবে গুটি কয়েকের সাধ্য আছে তা কেনার। শুধু লম্বা গাউন ওয়ালা লোকজন পাশের কামরায় ঢুকে মদ ও খাবার অডার্র দিয়ে মনের আনন্দে তা পান করে।

১২ বছর বয়সে শহরের প্রবেশ পথে-

‘শুভ শুঁড়িখানায়’ আমি বেয়ারা হিসেবে কাজ শুরু করি। শুঁড়িখানার মালিকের মতে লম্বা গাউনওয়ালা খদ্দেরদের সামনে আমাকে বোকা দেখায়। তাই আমাকে বাইরের কামরায় কাজ দেয়া হয়। গরিব খদ্দেররা সহজে খুশি হলেও, তাদের মধ্যে আবার কয়েকজন গোলমেলে লোকও ছিল। মদ ঢালার সময় তারা নিজের চোখে তা দেখতে চাইত, দেখতে চাইত পাত্রের তলায় কোন পানি আছে কিনা অথবা গরম পানিতে তা ঠিকমতো ডোবানো হচ্ছে কিনা। এত কড়াকড়ির মধ্যে মদে পানি মেশানো খুব কষ্টকর তাই কয়েকদিন পর মালিক ঠিক করলেন আমি ওই কাজের উপযুক্ত নই। ভাগ্য ভালো একজন প্রভাবশালী লোক আমাকে পাঠিয়েছিলেন। তাই তিনি আমাকে বরখাস্ত করতে পারেননি। আমাকে মদ গরম করার এক ঘেঁয়ে কাজ দেয়া হয়।

সেই থেকে কাজ নিয়ে আমি সারাদিন কাউন্টারের পেছনে দঁাড়িয়ে থাকি। কাজে তৃপ্তি থাকলেও মনে হয়েছে এক ঘেঁয়ে এবং ফালতু।

মালিকের চেহারা ছিল মারমুখী আর খদ্দেররা ছিল খিটখিটে তাই মজা করার উপায় ছিল না । শুধু খোং ইজি এলে একটু হাসতে পারতাম। একারণেই তাকে আমার এখনো মনে আছে।

লম্বা গাউনওয়ালা খদ্দেরদের মধ্যে একমাত্র খোং দঁাড়িয়ে মদ পান করত। বিশাল বপুর এই মানুষটি ছিল অদ্ভুতভাবে ফ্যাকাসে। মুখের বলি রেখায় প্রায়ই দেখা যেত ক্ষতচিহ্ন। তার ছিল লম্বা আগোছালো কঁাচা পাকা দাড়ি। লম্বা গাউন পরলেও সেটা ছিল জীণর্ ও নোংরা দেখে মনে হতো দশ বছরের বেশি সময় ধরে সেটা ধোয়া বা রিফু করা হয়নি। তার কথায় এত পুরনো শব্দ থাকত যে অধের্ক কথাই বোঝা যেত না। তার ডাক নাম ছিল খোং। তাই তাকে নাম দেয়া হয়েছিল খোং ইজি বাচ্চাদের দ্রæতপঠনের প্রথম তিন অক্ষর। যখনই সে দোকানে আসত সবাই তার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসত। কেউ হয় তো বলে উঠত:

‘খোং ইজি তোমার চেহারায় আরও কিছু নতুন দাগ দেখা যাচ্ছে।’

এসব কথায় কান না দিয়ে খোং কাউন্টারে এসে দু’বাটি গরম মদ ও মৌরী মসলা দেয়া এক প্লেট মটর শুটির অডার্র দিত। এ জন্য সে নয় পয়সা দিত। অমনি কেউ ইচ্ছা করে জোরে বলে উঠতÑ

‘তুমি আবার চুরি করেছ।’ বিস্ফারিত চোখে সে জিজ্ঞেস করত, ‘মিছেমিছি একজনের বদনাম করছ কেন?’

‘হু, বদনাম? গত পরশু আমি নিজের চোখে দেখেছি হো বাড়ি থেকে বই চুরির অপরাধে তোমাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে।’

খোং এর মুখ লাল হয়ে যেত। প্রতিবাদ জানানোর সময় তার কপালের শিরা ফুলে উঠত, বই নেয়া চুরি হতে পারে না ... বই বুদ্ধিজীবীর ব্যাপার তাকে চুরি বলা যায় না। তার পরেই আসত বিখ্যাত গ্রন্থের উদ্ধৃতি দারিদ্র্যের ভদ্রলোক চরিত্র নষ্ট করে না এবং এক বোঝা দুবোর্ধ্য শব্দ। শুঁড়ি খানার সবাই হো হো করে উঠতেই পরিবেশ হাল্কা হয়ে যেত।

লোকমুখে শুনেছি খোং ইজি চিরায়ত বিষয় পড়েছে কখনো সরকারি পরীক্ষায় পাস করেনি। জীবন ধারণের জন্য কোন উপায় না থাকায় গরিব হতে হতে সে ভিখিরী হয়ে যায়। ভাগ্য ভালো তার হাতের লেখা ছিল সুন্দর এবং জীবনধারণের জন্য নকল করার অনেক কাজ সে পেতে পারত। তার দোষও ছিল, সে মদ পছন্দ করত আর অলস প্রকৃতির লোক ছিল। সে কয়েকদিন পর পরই বই খাতা কালি-কলম, তুলি নিয়ে উধাও হয়ে যেত। কয়েকবার এমন ঘটনার পর কেউ আর তাকে নকল করার কাজ দিত না। তার পর মাঝে মধ্যে হাত-সাফাই করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। আমাদের শুঁড়িখানায় তার ব্যবহার ছিল দেখার মতো। পয়সা দিতে সে কখনো কসুর করেনি। মাঝে মাঝে পয়সা না থাকলে দেনাদারদের সঙ্গে তার নাম বোডের্ উঠত। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই সে তার পাওনা শোধ করে দিত এবং বোডর্ থেকে তার নাম মুছে যেত।

আধাবাটি মদ পান করার পর খোং তার মেজাজে ফিরে আসত। কিন্তু তখনই হয়ত কেউ বলে উঠতÑ ‘খোং ইজি, তুমি কি সত্যি সত্যি পড়তে জানো?’ খোং এমনভাবে তাকাত যেন এ ধরনের প্রশ্ন আবান্তর। তারা আবার জিজ্ঞেস করতÑ ‘কিন্তু এটা কেমন করে হয় যে তুমি সবচেয়ে ছোট পরীক্ষা পযর্ন্ত পাস করনি?’

এতে খোংকে অসুখী এবং অশান্ত দেখাত। তার মুথ শুকিয়ে যেত, ঠেঁাট নাড়তে থাকত। কিন্তু সে শুধু সেই দুবোর্ধ্য কথাগুলো বলত। আর সবাই হো হো করে হেসে উঠত। আনন্দময় হয়ে উঠত শুঁড়িখানার পরিবেশ।

এ সময় মালিকের গাল না খেয়ে আমি হাসিতে যোগ দিতে পারতাম। মাঝে মাঝে সেও খোংকে এমন সব প্রশ্ন করত যে তাতে হাসি পেত। তাদের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই জেনে খোং বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করত।

একবার সে আমাকে জিজ্ঞেস করেÑ

‘তুমি কি কখনো স্কুলে গিয়েছ?’

সায় দিতেই সে বলল, ‘ঠিক আছে, তাহলে তোমাকে পরীক্ষা করব। মৌরী মসলা দেয়া মটরশুঁটি বাক্যের মধ্যে মৌরী লিখবে কিভাবে?’

আমি ভাবলাম, ‘ভিক্ষুকের কাছে পরীক্ষা দেব না।’ তাই মুখ ফিরিয়ে তাকে উপেক্ষা করি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে বায়না ধরে।

“তুমি এটা লিখতে পার না? আমি তোমাকে শেখাব। মনে রাখবে। তোমাকে এসব মনে রাখতে হবে। কেননা পরে যখন নিজের দোকান হবে, তোমাকে অবশ্যই হিসাব রাখতে হবে।”

আমার মনে হলো নিজের দোকান হতে এখনো অনেক দেরি। তাছাড়া মালিক কখনো মৌরী মসলা দেয়া মটরশুঁটির হিসাব খাতায় লেখে না। মজা ও বিরক্তি নিয়ে আমি উদাসভাবে জবাব দিলাম, “তোমার মাস্টারি কে চায়? এটাকি হুই-সিয়াং এর হুই নয়?”

খোং খুব মজা পায় এবং কাউন্টারের ওপর হাতের নখ দিয়ে আঘাত করতে থাকে। মাথা নাড়তে নাড়তে সে বলল, “ঠিক, ঠিক। তুমি কি জান চার রকমভাবে ‘হুই’ লেখা যায়?”

আমার ধৈযর্চ্যুতি ঘটে। ভুরু কুচকে আমি কেটে পড়ি। কাউন্টারের ওপর অক্ষরগুলো লেখার জন্য খোং ইজি মদের মধ্যে নখ ডুবিয়েছে। কিন্তু আমার নজর নেই দেখে সে হতাশ হয়ে পড়ে।

কখনো কখনো আশপাশের ছেলেমেয়েরা হাসির শব্দে মজায় যোগ দিতে আসত এবং খোং ইজিকে ঘিরে ধরত। খোং তাদের প্রত্যেককে একটি করে মৌরী মসলা দেয়া মটরশুঁটি দিত। মটরশুঁটি খাবার পরও ছেলেমেয়েরা ঘিরে থাকতেÑ তাদের নজর থাকত প্লেটের দিকে। তাড়াতাড়ি সে হাত দিয়ে প্লেট ঢেকে উপুড় হয়ে বলত, “খুব বেশি নেই। আমি খুব একটা খাইনি।” তারপর মাথা সোজা করে মটরশুঁটির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলত, “না, না, খুব বেশি নেই। তারপর হাসতে হাসতে ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করত।

খোং ইজি সঙ্গি হিসেবে খুব মজার ছিল, কিন্তু তাকে ছাড়াও আমাদের সময় ভালোই কাটত।

হেমন্ত উৎসবের কয়েকদিন আগে, একদিন শুঁড়িখানার মালিক তার হিসাব পরীক্ষা করছিলেন। দেয়াল থেকে বোডর্ নামিয়ে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘অনেক দিন খোং ইজির দেখা নেই। তার কাছে এখনো উনিশ পয়সা পাওনা আছে।” তখন বুঝতে পালাম কতদিন তাকে দেখিনি।

খদ্দেরদের একজন বলে উঠল, “সে কেমন করে আসবে। গতবারের পিটুনীতে তার পা ভেঙে গেছে।”

“আহা!”

“সে আবার চুরি করতে গিয়েছিল। এবার বোকামি করেছে প্রাদেশিক বুদ্ধিজীবী মি. ডিং-এর বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে। যেন যে কেউ সেটা করতে পারে।”

“তার পর কি হয়েছে?”

কি আর হবে? প্রথমে তাকে স্বীকারোক্তি লিখতে হয়েছে, তারপর পিটুনী। পিটুনী প্রায় সারারাত ধরে চলে, পা ভেঙে যাওয়া পযর্ন্ত।”

“তারপর?” “তার পা’র জোড়া ভেঙে গিয়েছে।”

“কিন্তু তার পর কি হয়েছে?”

“তারপর?...কে জানে? সে হয়তো মরে গিয়ে থাকবে।” মালিক আর কিছু জানতে চায়নি, হিসাব মেলাতে থাকেন।

হেমন্ত উৎসবের পর, শীত আসতে শুরু করলে বাতাসও দিন দিন ঠাÐা হতে থাকে। সারাদিন চুলার কাছে বসে থাকলেও প্যাডেড কোট পরতে হয়। একদিন দুপুরে দোকান প্রায় খালি। চোখ বন্ধ করে বসে আছিÑ এমন সময় শুনতে পেলাম:

“একবাটি মদ গরম কর।”

গলার স্বর নিচু, কিন্তু পরিচিত। কিন্তু মাথা তুলতেই কেউ নজরে পড়ল না। আমি দঁাড়িয়ে দরজার দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম দরজার দিকে মুখ করে কাউন্টারের নিচে বসে আছে খোং ইজি। তার চোখ জোড়া বসে গেছে। মুখ শুকনো-খুব বিপযর্স্ত দেখাচ্ছে। তার গায়ে টুটা ফাটা একটা জ্যাকেট। গলার সঙ্গে ঝোলানো একটি মাদুরের ওপর সে পা আড়াআড়ি করে বসে আছে। আমাকে দেখতে পেয়ে বলল,Ñ “এক বাটি মদ গরম কর।”

এ সময় কাউন্টারের ওপর দিয়ে মাথা বাড়িয়ে মালিক বললেন, “খোং ইজি নাকি? তোমার কাছে এখনো উনিশ পয়সা পাওনা আছে।”

একটু অস্থির হয়ে খোং ইজি জবাব দিল, সেটা আগামীবার মিটিয়ে দেব। এবার নগদ পয়সা দিচ্ছি। মদ ভালো হওয়া চাই। মালিক মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে,

‘খোং ইজি, তুমি আবার চুরি করতে গিয়েছিলে?’ কিন্তু প্রতিবাদ না করে সে শুধু বলেÑ

‘ঠাট্টা কর না।’

‘ঠাট্টা? চুরি না করলে তারা তোমার পা ভেঙেছে কেন?’

খোং বলল, ‘পড়ে গিয়ে, পড়ে গিয়ে আমার পা ভেঙেছে।’

ব্যাপারটা শেষ করার জন্য তার চোখে আকুতি মিনতি। কিন্তু ততক্ষণে বেশ কয়েক জন জড়ো হয়েছে এবং তারা হাসতে শুরু করেছে। আমি মদ গরম করে তা নিয়ে চৌকাঠের ওপর রাখলাম। টুটাফাটা কোটের পকেট থেকে চার পয়সা বের করে সে আমার হাতে দিল। দেখতে পেলাম তার হাত জোড়া কাদামাখা। তারপর মদ শেষ করে লোকজনের হাসাহাসি ও চুটকির মধ্যে সে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে গেল।

তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। খোং এর দেখা নেই। বছরের শেষে বোডর্ নামিয়ে মালিক বললেন, “খোং ইজির কাছে এখনো ১৯ পয়সা পাওনা আছে।” পরের বছর ড্রাগন নৌকা উৎসবের সময়ও তিনি একই কথা বললেন। কিন্তু হেমন্ত উৎসবের সময় আর কিছু বললেন না। আরেকটি নববষর্ এলো কিন্তু তাকে আর দেখা গেল না। সেই থেকে আর তাকে দেখিনি। হয়ত সে সত্যি সত্যি মরে গিয়ে থাকবে।

* আধুনিক চীনা সাহিত্যের স্থপতি লু স্যুন (১৮৮১-১৯৩৬) ছিলেন আশ্চযর্জনক ভাবে ম্যাক্যিম গোকির্র সমসাময়িক। তার রচনাসমূহের সৃজনশীলতা, জীবনজিজ্ঞাসা, বোধও চেতনা, সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমালোচনামূলক বস্তুবাদের প্রক্রিয়াও মিলে যায় গোকির্র সঙ্গে। প্রথম জীবনে লু স্যুন ছিলেন বিপ্লবী গণতন্ত্রী। পরবতীর্ পযাের্য় কমিউনিস্ট হয়েছেন। ১৯১৮ সালের মে মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়, “এক পাগলের ডায়েরি।”
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে