logo
সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬

  অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ   ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সুশাসন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ

ব্যাংকিং সেক্টরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং জনগণের আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। আস্থাহীনতার কারণে জনগণ যদি ব্যাংকে টাকা জমা না রাখে, তাহলে কিন্তু ব্যাংকগুলো ডিপোজিট সমস্যায় পড়বে। ফলে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারবে না এবং আয় করতে পারবে না। ব্যাংকের বিনিয়োগ বা ঋণ প্রবাহ কমে গেলে দেশের অর্থনীতিই সমস্যায় পড়বে। তাই ব্যাংকিং খাতে নজরদারি বাড়াতে হবে, সব ধরনের অব্যবস্থা দূর করতে হবে। প্রয়োজনের আরও কঠোর আইন করতে হবে, সব অনিয়ম-অপরাধের বিচার দ্রম্নততর করতে হবে এবং ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা

ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন সুশাসন ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় একটি চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানের মাধ্যমেই মূলত আয় করে থাকে। কিন্তু গ্রাহক যখন এই ঋণ নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করে না, তখন তা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়। এই অবস্থায় ব্যাংকের কোনো আয় তো হয়ই না, অধিকন্তু মূল টাকাটাই গ্রাহকের হাতে আটকে থাকে। ফলে খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যায় এবং ব্যাংকগুলোতে সৃষ্টি হয় দায়বদ্ধতা।

খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর গতিকে পুরোপুরি আটকে রাখে। কারণ এই বিশাল পরিমাণ টাকা থেকে একদিকে ব্যাংক যেমন কোনো প্রকার আয় করতে পারে না, ঠিক তেমনি এই ঋণ অনাদায়ী হওয়ার কারণে তা নতুন করে অন্য কোনো সেক্টরে বিনিয়োগও করতে পারে না। ফলে ব্যাংকের আয় কমে যায়, বিনিয়োগ কমে যায় এবং ব্যাংকের আর্থিক গতিশীলতাও কমে যায়।

অন্যদিকে এই খেলাপি ঋণের বিপরীতে আয় থেকে প্রভিশন রাখতে হয় বিধায় ব্যাংকের আয়ের বিশাল একটি অংশ খেলাপি ঋণের ঘাটতি মেটাতে ব্যয় করতে হয়। এ ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যদি ব্যাংকের আয়ের সমান হয় তাহলে আয়ের পুরোটাই প্রভিশন ঘাটতির পিছনে ব্যয় করতে হয়। এ অবস্থায় ব্যাংকের কোনো আয় অবশিষ্ট থাকে না। তা ছাড়া জামানত অতি মূল্যায়ন, বন্ধকি সম্পত্তির দলিলপত্র সংগ্রহে দুর্বলতাও অনেক ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ে সমস্যা সৃষ্টি করে।

তথ্যপ্রযুক্তিতে ব্যাংকিং খাতে বৈপস্নবিক পরিবর্তন এলেও এর দুর্বল দিকগুলো কাজে লাগিয়ে সম্প্রতি বড় ধরনের অঘটন ঘটেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনায় লোকসানের কারণে ঋণগ্রহীতা খেলাপি হতে পারেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হচ্ছেন অনেকে। মামলা করেও এ ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, সুশাসনের অভাবও বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ যদি ব্যাংকের আয়ের চেয়ে বেশি হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে ব্যাংক ক্ষতির অবস্থানে থাকে। ফলে ব্যাংকগুলো আয় করেও তা ভোগ করতে পারে না। এ অবস্থায় ব্যাংকের অবস্থা দিন দিন নাজুক থেকে নাজুকতর হতে থাকে।

খেলাপি ঋণের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোতে বহুদিন থেকেই স্থবিরতা চলছে। একই ভাবে খেলাপি ঋণের কারণে অনেক বেসরকারি ব্যাংকও সমস্যার মধ্যে আটকা পড়েছে। প্রতিটি ব্যাংকই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রভিশন আকারে সংরক্ষণ করে থাকে। এটা করা হয় বিদেশি ঋণদাতা এবং স্থানীয় আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বিধানের জন্য। কোনো কারণে ব্যাংক যদি প্রদত্ত ঋণের কিস্তি আদায় করতে না পারে, তাহলেও যেন আমানতকারীদের অর্থ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধে অসুবিধা না হয় এবং ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় সৃষ্টি না হয়, মূলত সে কারণেই ব্যাংকগুলো প্রভিশন সংরক্ষণ করে থাকে। সব ধরনের ঋণ হিসাবের বিপরীতেই প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

ঋণ হিসাবগুলোকে সাধারণত পাঁচটি বিশেষ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে- অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণ হিসাব, এ ধরনের ঋণ হিসাবের বিপরীতে ১ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। স্পোশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ), এ ধরনের ঋণ হিসাবের বিপরীতে ৫ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সাবস্ট্যান্ডার্ড লোন হিসাবের জন্য ২০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ডাউটফুল লোন একাউন্টের জন্য ৫০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয় এবং ব্যাড অ্যান্ড লস ঋণ হিসাবের জন্য শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

কিন্তু অনেক ব্যাংকই নির্ধারিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্যদিকে নিলামের মাধ্যমে বন্ধকিকৃত সম্পদ বিক্রি করাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। বন্ধকিকৃত সম্পত্তি বিক্রির জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিলাম আহ্বান করা হলেও, তা অধিকারে যেতে পারবে না মনে করে ক্রেতারা কিনতে কম আগ্রহ দেখান। কোনো ক্রেতা আগ্রহী হলেও তিনি ওই সম্পত্তির জন্য অপেক্ষাকৃত কম মূল্য দিতে চান। ফলে খেলাপি ঋণ যথাযথভাবে আদায় করাটা সম্ভব হয় না আর এর পরিমাণ কেবল বাড়তেই থাকে।

আবার মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা খেলাপি ঋণ আদায়ের পথে অন্যতম বাধা। গ্রাহকের অযৌক্তিক মামলায় ব্যাংকের স্বাভাবিক কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হয়। এসব মামলা চালাতে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শুধু অর্থঋণ আদালতে এত মামলার সময়মতো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।

ব্যাংকিং খাতে সমস্যা নিরসনকল্পে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ খুবই জরুরি। ক্রমবর্ধমান অর্থঋণ মামলার দ্রম্নত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অর্থ ঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থঋণ মামলার বিপরীতে বিবাদী কর্তৃক দায়েরকৃত রিটসমূহ দ্রম্নত নিষ্পত্তির জন্য মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে আদালত বা বেঞ্চ গঠন, আদালতকে বিভ্রান্ত করতে ঋণখেলাপি কর্তৃক মিথ্যা তথ্য প্রদানকে একটি অন্যতম অপরাধ হিসেবে পরিগণিত করে, প্রচলিত আইনে শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়।

প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ব্যাংক জাতীয়করণ অধ্যাদেশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, অর্থঋণ আদালত আইন, দেউলিয়াবিষয়ক আইন, ব্যাংকার বহি সাক্ষ্য আইন, সমবায় আইন ও নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট কে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে আইনের বিভিন্ন বিষয় সংস্কার করা যেতে পারে। জনগণের অর্থ লুণ্ঠনের যগে যগে চলে আসা ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে রুখতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হবে।

খেলাপি ঋণের কারণ এবং তা কমিয়ে আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সম্প্রতি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে দুর্বলতা, ঋণের বিপরীতে রক্ষিত জামানতের অপর্যাপ্ততা, অতিমূল্যায়ন ও ঝুঁকি বিশ্লষণে দুর্বলতা, এক ব্যাংক কর্তৃক অন্য ব্যাংকের খারাপ ঋণ অধিগ্রহণ, চলতি মূলধনের পরিমাণ নির্ধারণ না করা, একাধিক ব্যাংক থেকে চলতি মূলধন গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি ও বিভিন্নভাবে প্ররোচিত হয়ে ঋণ প্রদান, শাখা পর্যায়ে ঋণ প্রদানের ক্ষমতা সীমিতকরণ, ঋণ পুনঃতফসিলকরণের সুবিধার অসৎ ব্যবহার খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ।

ব্যাংক এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেখানে জনগণ তাদের কষ্টার্জিত টাকা জমা রাখে টাকাগুলো নষ্ট হবে না, চুরি যাবে না এবং টাকা কমে যাবে না বরং বাড়বে, এ প্রত্যাশায়। ব্যাংকিং সেক্টরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং জনগণের আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। আস্থাহীনতার কারণে জনগণ যদি ব্যাংকে টাকা জমা না রাখে, তাহলে কিন্তু ব্যাংকগুলো ডিপোজিট সমস্যায় পড়বে। ফলে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারবে না এবং আয় করতে পারবে না।

ব্যাংকের বিনিয়োগ বা ঋণ প্রবাহ কমে গেলে দেশের অর্থনীতিই সমস্যায় পড়বে। তাই ব্যাংকিং খাতে নজরদারি বাড়াতে হবে, সব ধরনের অব্যবস্থা দূর করতে হবে। প্রয়োজনের আরও কঠোর আইন করতে হবে, সব অনিয়ম-অপরাধের বিচার দ্রম্নততর করতে হবে এবং ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে