logo
মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

  সরওয়ার নিজামী   ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

আইনের জন্ম ও বিকাশ ধারা

১৭৬০ খ্রিস্টপূর্ব সালের দিকে রাজা হাম্মুরাবী ব্যাবিলনে পাথরের ওপর লিখে প্রবর্তন করেছিলেন হাম্মুরাবী কোড। প্রাচীন ভারতের মনুস্মৃতি বা অর্থশাস্ত্র, রোমান জাস্টিনিয়ান, আধুনিক ইউরোপিয়ান ল', ইংলিশ কমন ল', মুসলিমদের ইসলামিক ল' বা খ্রিষ্টানদের ক্যানন ল'- সবকিছুর মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়ে এসেছে আজকের আধুনিক আইনের স্রোতধারা। আমরা আজকে যে আইনের চর্চা করি সে আইন ঋণি রয়েছে পূর্বসব আইনের কপাটকক্ষে।

আইনের জন্ম ও বিকাশ ধারা
গতকাল রাতে আপনার ভালো ঘুম হয়েছে। বাসায় নিরাপত্তার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও আইন আপনার সঙ্গে ছিল। নিরাপত্তা আইনের বেষ্টনী আপনাকে এনে দিয়েছিল প্রশান্তির ঘুম। এই যে আইনের মাঝে পরিবেষ্টিত আমরা মানুষ, আপনি কি কখনো চিন্তা করে দেখেছেন কিভাবে আমরা আইনের পরিবেষ্টিত দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ হলাম। কিভাবে আইন তার নিজস্ব গতির সঙ্গে আমাদের সমাজকে চলতে শিখিয়েছে। কিভাবে আমরা মানুষ আইনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে চলতে শিখেছি।

আমরা মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়েই আমাদের বসবাস। তবে আমরা মানুষ একদিনেই সমাজবদ্ধ হতে শিখিনি। পৃথিবীতে প্রথমে মানুষের আগমন ঘটেছে এবং বিবর্তনের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে সমাজের সৃষ্টি হয়েছে। আর এ দু'য়ের মাঝপথে সৃষ্টি হয়েছে আইনের।

পৃথিবীর প্রথম মানুষ কিভাবে খাবার খাবে, কিভাবে ঘুমাবে- ইত্যকার নিয়মসমূহ তার আগমনকালীন সময়ে সে জানতো না। মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে নিয়মগুলো শিখিয়েছেন। এক সময় একজন মানুষ থেকে কয়েকজন মানুষের সৃষ্টি হয়েছে। সেসব মানুষ ক্রমশ বাড়তে বাড়তে সৃষ্টি করেছে সমাজ। সমাজবদ্ধ মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে তৈরি করেছে বিভিন্ন নিয়ম, রীতি, কানুন। এসব নিয়ম, কানুন কিংবা রীতিকে আজকের পৃথিবীতে বলা হচ্ছে সামাজিক আইন। আবার ডিভাইন ল'-এর বিপরীতে এসব নিয়ম-কানুনকে অভিহিত করা হচ্ছে ম্যান মেড ল' বা মানুষের তৈরি আইন হিসেবে।

গুটি কয়েক নিয়ম বা রীতির সমষ্টিই ছিল মানুষের তৈরি প্রথম আইন। এক সময় এসব নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সূচনা হয় প্রথাগত আইনের। চুরি ঠেকাতে কিংবা খুনিকে শাস্তির আওতায় আনতে প্রবর্তিত হয় শাস্তি আইনের। বিবাদমান বিষয় নিষ্পত্তি করতে করতে জন্ম নেয় সালিশ আইনের। এভাবে মানুষ সামাজিক প্রয়োজনে সৃষ্টি করে অসংখ্য নতুন নিয়ম। এসব নিয়ম এক সময় সংখ্যায় বাড়তে থাকে। আর এভাবে সৃষ্টি হয় আইনের একটি পরিকাঠামো।

পৃথিবীতে মানুষের আগমন প্রথমে ঘটলেও সে এক সময় নিজেকে আইনের অধীনে নিয়ে আসে। আমাদের আদি মানুষরা নিজেদের ও সমাজের প্রয়োজনেই জন্ম দিয়েছিল আইনের। আবার সেসব আইনের মৃতু্যও ঘটিয়েছে তারা নিজেদের ও সমাজের প্রয়োজনে। আজও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে।

মানুষ ও সমাজের প্রয়োজনে যে আইনের সৃষ্টি হয়েছিল সে আইন এক সময় বশিভূত করেছে স্বয়ং আমরা মানুষ ও সমাজকে। যে নিয়মের রূপকার আমরা, যে নিয়মের জন্ম-মৃতু্য আমাদের হাতে, সে নিয়ম শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছি স্বয়ং আমরা মানুষ। প্রাকৃতিক কারণেই মানুষ তৈরি করেছে আইন।

আবার প্রাকৃতিক কারণেই সে আইন বিলুপ্ত হয়েছে।

এই যে আমরা মানুষ সহস্র আইনের জন্ম-মৃতু্য দিয়ে চলেছি, এই যে আমরা মানুষ নিত্যনতুন নিয়মের সৃষ্টি করে চলেছি- এ আইন, এ নিয়মসমূহের জন্ম কিন্তু একদিনে হয়নি। আজকের সমাজে যে আইন বিদ্যমান সে আইন হঠাৎ করে একদিনে এ অবস্থানে আসেনি। আমাদের আদি মানুষ থেকে আজকের আমরা- সবাই আইনের উৎকর্ষে কাজ করছে। এ উৎকর্ষতার ফলে আইন মানবতাকে যেমন করেছে সুউচ্চ, সমাজকে করেছে তেমন সুন্দর।

আজ থেকে কয়েকশ বছর পরেও আইনের এ বিকাশমান ধারা অব্যাহত থাকবে। আজকের আইনের থেকে হাজার বছর পরের আইন হবে আরও বেশি মানবধর্মী, আরও বেশি সমাজবান্ধব, ব্যবসাসহায়ক। দেখা যাবে হাজার বছর পরে আইনের অসংখ্য নতুন শাখা-প্রশাখা সৃষ্টি হয়েছে। আইনের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলো বিবর্তনের ফলে রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন তত্ত্বে। এও দেখা যাবে যে, আইনের কিছু মৌলিক বিধান হাজার বছর পরেও থেকে যাবে প্রায় একই রকম। বিবর্তনের এ খেলায় পৃথিবীর সবকিছুতে যেমন পরিবর্তন আসে তেমনি আইনের গায়েও লাগবে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

আজকে আমরা যে আইনের সঙ্গে বসবাস করি, যে আইন আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি- সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে, সে আইন কয়েক হাজার বছর আগে এমনটি ছিল না।

ইতিহাস বলে আমাদের আদি মানুষরাও আমাদের মতোই আইনের বিকর্ষসাধনে সংগ্রাম করেছিল। ইতিহাস থেকেই জানা যায় প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরে সামাজিক সাম্যতা, নিরপেক্ষতা সম্পর্কিত বিধান ছিল। মা'ত আইনের ভিত্তিতে সেখানে প্রচলিত ছিল বার খন্ডের সিভিল কোড। প্রথম বিদ্যমান ল' কোডের প্রচলন করেছিলেন সুমেরিয়ান শাসক উর-নাম্মু।

১৭৬০ খ্রিস্টপূর্ব সালের দিকে রাজা হাম্মুরাবী ব্যাবিলনে পাথরের ওপর লিখে প্রবর্তন করেছিলেন হাম্মুরাবী কোড। প্রাচীন ভারতের মনুস্মৃতি বা অর্থশাস্ত্র, রোমান জাস্টিনিয়ান, আধুনিক ইউরোপিয়ান ল', ইংলিশ কমন ল', মুসলিমদের ইসলামিক ল' বা খ্রিষ্টানদের ক্যানন ল'- সবকিছুর মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়ে এসেছে আজকের আধুনিক আইনের স্রোতধারা। আমরা আজকে যে আইনের চর্চা করি সে আইন ঋণি রয়েছে পূর্বসব আইনের কপাটকক্ষে।

তোমরা চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাবে আজকের গতিময় জীবন। এ জীবনের গতি আমাদের করে তুলেছে অস্থির। আমরা মানুষ আদিম সমাজ থেকে পা দিয়েছি আধুনিক সমাজে। নগর রাষ্ট্র থেকে জন্ম দিয়েছি আধুনিক রাষ্ট্রের। সৃষ্টি হয়েছে আইন সভা। সৃষ্টি হয়েছে আদালত। আজ আইনের পরিকাঠামো অনেক ব্যাপৃত। বিস্তৃত জলরাশি, সুউচ্চ শৃঙ্গ, সাগরতলের খনিজ কিংবা দূর মহাকাশ- কোনো কিছুই আজ বাদ পড়ছে না। সব কিছু নিয়েই আইন হচ্ছে। আধুনিকতার গতির সঙ্গে পালস্না দিয়ে জন্ম নিচ্ছে নতুন আইনের নতুন বিধান।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে