logo
  • Thu, 18 Oct, 2018

  অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক   ৩১ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

ধষের্ণর বিচার চেয়ে দফায় দফায় সম্ভ্রমহানি!

ধষের্ণর বিচার চেয়ে দফায় দফায় সম্ভ্রমহানি!
আমার এ লেখাটি মূলত ধষের্ণর শিকার একজন নারী বিচার চাইতে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই আবারও যে জনসমক্ষে ধষের্ণর শিকার হন, সে বিষয়টি তুলে ধরা। ধষির্তা নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা অথার্ৎ মেডিকেল রিপোটর্ তৈরিতে, তদন্তকারী কমর্কতার্র তদন্তের সময়, জবানবন্দিতে, জেরার সময় ইত্যাদি। নারীর এই বারবার ধষের্ণর শিকার হওয়ার একমাত্র কারণ প্রায় সব কাজেই পুরুষের উপস্থিতি। অথচ আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে নারী ও পুরুষের অধিকার চচার্র বিষয়ে সমতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। আবার অনুচ্ছেদ ১৯(৩) বলেছে, জাতীয় জীবনের সবর্স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ২৮(২) নিশ্চয়তা দিয়েছে যে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সবর্স্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবে।

আমাদের সাক্ষ্য আইনে ১৫৫ ধারার ৪ উপধারার সুযোগে ধষর্ক সাধারণত ধষির্তাকে ‘কুচরিত্রা’ প্রমাণের চেষ্টা করে থাকেন। এর কারণ হচ্ছে ওইরূপ প্রমাণ করতে পারলেই ধষর্ক ধষের্ণর অভিযোগ থেকে বেঁচে যেতে পারেন। এ ধারায় বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তি যখন ধষর্ণ বা বলাৎকার চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারিতে সোপদর্ হন, তখন দেখানো যেতে পারে যে অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা। এ সুযোগে ধষের্ণর মামলায় জেরা করার সময় ধষের্ণর শিকার নারীকে অনেক সময় অনভিপ্রেত, অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রাসঙ্গিক, রুচিহীন ও আপত্তিকর প্রশ্নের মাধ্যমে চরিত্র হনন করা হয়। এ কারণে ধষের্ণর শিকার নারী ও তার পরিবার মামলা করতে নিরুৎসাহিত হন ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন।

এ ধারাটি আদালতের কাজে এলেও বতর্মানে ধষির্তার ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনাকীণর্ আদালতে ধষির্তাকে হেনস্তা করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এই আইনকে। একজন ধষির্তা আদালতে বিচার চাইতে এসে কাঠগড়ায় দঁাড়িয়ে আবারও ধষের্ণর শিকার হন। কারণ এ ধারা প্রয়োগ করলে ধষির্তার অতীত যৌনজীবন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দঁাড়ায়। যা অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং গোপনীয় একটি বিষয়। প্রতিপক্ষের আইনজীবী বারবার প্রমাণের চেষ্টা করেন আসলে ধষির্তা এ রকমের যৌনসম্পকের্ অভ্যস্ত। খোদ একটি আইনের ধারাই যেখানে ধষির্তাকে দুশ্চরিত্রা হিসেবে উপস্থাপনের লাগামহীন সনদ দিয়ে দিচ্ছে সেখানে ওই ধষির্তাকে অপমানিত হওয়া থেকে আদালত কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারবে না। এই ধারাটি ব্যাপকভাবে ধষের্ণর মামলাগুলোকে প্রভাবিত করে চলেছে। এমনকি অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করার পর এই ধারাটির কঁাধে ভর করে বেকসুর খালাস পাওয়ার উদাহরণও এই দেশে আছে।

বাংলাদেশের উচ্চ আদালতগুলোতে ‘চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’ প্রমাণ হিসেবে কতটা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর ফলাফলগুলো কী ছিল তা একটি উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আবদুল মজিদ বনাম রাষ্ট্র মামলা, যা ১৩ বিএলসি ২০০৮ মামলায় একজন তালাকপ্রাপ্ত মা, যিনি তার শিশুসহ তার কুঁড়েঘরে ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় ধষির্ত হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। পালিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্ত ধষর্ক গ্রামবাসীর কাছে ধরা পড়েন এবং অপরাধ স্বীকার করেন। আদালতে অভিযোগকারিণীর বৈবাহিক অবস্থা এবং যৌনসম্পকের্র ইতিহাসকে তার ‘চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’ বিবেচনায় তাকে ‘যৌন কাযর্কলাপে অভ্যস্ত’ বলে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয় ‘ধষির্তা একজন হালকা নৈতিক চরিত্রের অধিকারিণী এবং তিনি অসামাজিক ও অনৈতিক কাযর্ক্রমে জড়িত রয়েছেন।’

রাষ্ট্র বনাম শাহীন এবং অন্যান্য যা ২৮ বিএলডি (হাইকোটর্ ডিভিশন) ২০০৮ মামলায় ধষের্ণর অভিযোগকারীর দুবার বিয়ে হয়েছিল। তাকে তার নানির কাছ থেকে ছিনিয়ে একটি হোটেলের কক্ষে সদলবলে ধষর্ণ করা হয়। এ ক্ষেত্রেও আদালতের রায়ে বলা হয় যে ‘এটি এমন একজন নারীর ধষের্ণর মামলা, যার আগে দুবার বিয়ে হয়েছিল এবং এই মামলাটি এমন একটি উদাহরণ, যেখানে উল্লিখিত কারণে বাদিনীর একার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না।’

শ্রী দিনটা পাল বনাম রাষ্ট্রের মামলায় যা ৩০ বিএলডি (এডি) ২০১০ দেখা যায় যে, আদালত অভিযোগকারিণীর গাছ বেয়ে ওঠাকেই তার ‘খারাপ চরিত্র বা দুশ্চরিত্র’ হিসেবে প্রমাণ করেন এবং তার সাক্ষ্যকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরে নেন। অভিযোগকারিণী ছিলেন একজন অল্পবয়সী গৃহপরিচারিকা, যিনি তার নিয়োগকতার্র হাতে ধষির্ত হন। আদালত এ ক্ষেত্রে মন্তব্য করেন যে, যেহেতু অভিযোগকারিণী অভিযুক্তের বাড়ির সদর দরজা বন্ধ থাকার সময় একটি পেঁপেগাছ বেয়ে উঠে প্রবেশ করেছিলেন, এতে প্রমাণ হয় যে বাদিনী একজন হালকা সম্ভ্রমের নারী। তাই তার দেয়া প্রমাণ বিশ্বাসযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেশ করা হবে।

উল্লিখিত মামলাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটার মধ্যে যথেষ্ট ঔপনিবেশিক আচরণেরও পরিচয় পাওয়া যায়। কাজেই সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারার কাযর্প্রক্রিয়াটি স্বাধীন বাংলাদেশের আদশের্র সঙ্গেও সাংঘষির্ক। আমাদের প্রতিষ্ঠিত আইনী নীতি যে, যদি ধষির্তা খারাপ চরিত্রের অধিকারীও হয়ে থাকেন এবং এমনকি যদি বেশ্যাও হয়ে থাকেন, তার গোপনতার অধিকার কোনো ব্যক্তি কতৃর্ক খবর্ হতে পারে না এবং নিযাির্ততার চরিত্র নিবিের্শষে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই ধষর্ণ অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে হয়। পৃথিবীতে এমন কোনো সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে আইনের বিকাশ হয়নি। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘আইন’ ধারণাটিরও ব্যাপক পরিবতর্ন হয়েছে। পরিবতির্ত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আইন তার কাযর্কারিতা হারায়। প্রয়োজন হয় সে আইনকে সময় উপযোগী করে তোলা। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যেই আইন তার অস্তিত্বের সন্ধান পায়। কাজেই আমাদের সাক্ষ্য আইনের ১৮৭২-এর ধারা ১৫৫-এর উপধারা ৪-এর বিধান বাদ দেয়া যুক্তিযুক্ত নয় কি?

যাহোক, প্রমাণের স্বাথের্ বিপক্ষের বিজ্ঞ কেঁৗসুলি উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর অবতারণা করতেই পারেন। কিন্তু পুরুষ বিচারক ও পুরুষ আইনজীবীর সামনে উপরিউক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে যে কোনো নারীর অশ্রæ ঝরবে, তার সম্ভ্রমে আঘাত লাগবে এটাই স্বাভাবিক। সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে এ ধরনের মামলায় অনেক নারীই অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। অবশেষে ছেড়ে দিতে হয় তার গুরুত্বপূণর্ একটি অধিকার।

পৃথিবীতে এমন কোনো সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে আইনের বিকাশ হয়নি। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘আইন’ ধারণাটিরও ব্যাপক পরিবতর্ন হয়েছে। পরিবতির্ত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আইন তার কাযর্কারিতা হারায়। প্রয়োজন হয় সে আইনকে সময় উপযোগী করে তোলা। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যেই আইন তার অস্তিত্বের সন্ধান পায়। যাই হোক, আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) অনুযায়ী নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীবান্ধব বিচারব্যবস্থা বা আদালত প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোটের্র আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। ংবৎধল.ঢ়ৎধসধহরশ@মসধরষ.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে