logo
  • Thu, 18 Oct, 2018

  আবরার মাসুদ   ২৪ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

গুপ্তধনের মালিক কে?

গুপ্তধনের বিষয়ে নানা গালগল্প এবং কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। অমুক ব্যক্তি গুপ্তধন পেয়েছেন এবং সারাজীবন রাজার হালে কাটিয়ে দিয়েছেন এ রকমের কথা শুনে বহু মানুষই নিজেও গুপ্তধন পাওয়ার কল্পনা করে রোমাঞ্চ অনুভব করে থাকেন। সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে একটি বাড়িতে গুপ্তধন পাওয়া গেছে মমের্ তথ্য পাওয়ার পর প্রশাসন থেকে ওই বাড়িটিতে গুপ্তধনের সন্ধানে অভিযান শুরু হয়েছে।

গুপ্তধনের মালিক কে?
গুপ্তধনের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে গুপ্তধন আইন ১৮৭৮
ধরুন আপনি আপনার জমি খনন করতে গিয়ে কিছু গুপ্তধন বা মূল্যবান সম্পদ পেয়ে গেলেন। এখন এই সম্পত্তি যেহেতু আপনার জমিতে পাওয়া গেছে, তাই নিঃশতর্ভাবে কি এই সম্পত্তি আপনার? না। আইন আপনাকে সেই সুযোগ দেয় না।

গুপ্তধনের বিষয়ে নানা গালগল্প এবং কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। অমুক ব্যক্তি গুপ্তধন পেয়েছেন এবং সারাজীবন রাজার হালে কাটিয়ে দিয়েছেন এ রকমের কথা শুনে বহু মানুষই নিজেও গুপ্তধন পাওয়ার কল্পনা করে রোমাঞ্চ অনুভব করে থাকেন। তবে গুপ্তধন যে কেবল কল্পকাহিনীর বিষয়বস্তু তা নয়। প্রাচীন সময় থেকেই গুপ্তধন প্রাপ্তির ঘটনা ঘটে আসছে পৃথিবীতে। উপমহাদেশেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া গেছে। যে কারণে ব্রিটিশ শাসনামলেই গুপ্তধনের ব্যবস্থাপনা সম্পকির্ত একটি আইন তৈরি করা হয়। ১৮৭৮ সালে প্রণীত সেই আইনটি ‘গুপ্তধন আইন’ নামে পরিচিত।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুরে এক বাসায় গুপ্তধন রয়েছে বলে খবর চাউর হয়েছে। পরে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের খেঁাজে রাজধানীর মিরপুরে সেই বাড়িতে প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরকে নিয়ে খেঁাড়াখুঁড়ি চালাচ্ছে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। মিরপুরের ১০ নাম্বার এলাকায় একটি দোতলা বাড়ির দুটি কক্ষের মেঝেতে ২১ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টা থেকে এই খেঁাড়াখুঁড়ির শুরু হয়। নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনোয়ার উজ জামানের উপস্থিতিতে বিকাল ৩টা পযর্ন্ত চলে কাজ। পরে বাড়িটি পুরনো ও জরাজীণর্ হওয়ায় খেঁাড়াখুঁড়ির স্থগিত করা হয়। বাড়িটির নিরাপত্তার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে তারা শিগগিরই আবার কাজ শুরু করার চেষ্টা করবেন বলে জানানো হয়।

একটি সাধারণ ডায়েরিকে (জিডি) কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। গত ১০ জুলাই কক্সবাজারের তৈয়ব নামের এক ব্যক্তি জিডিটি করেন। তার দাবি, মুক্তিযুদ্ধের পর তার পূবর্পুরুষরা পাকিস্তানে যাওয়ার আগে ওই বাড়িটির মেঝে খঁুড়ে সোনা লুকিয়ে রেখে যায়। এরকম জিডি হওয়ার খবর পেয়ে বাড়িটির বতর্মান মালিক মনিরুল ইসলামও ১২ জুলাই জিডি করেন। জিডিতে তিনি আইনসম্মত উপায়ে পুলিশকে বিষয়টি সমাধান করে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানান। এর প্রেক্ষিতেই আজ প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর ও পুলিশের সহায়তায় গুপ্তধনের সন্ধানে নামে জেলা প্রশাসন।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত মনিরুল বলেন, ২০১০ সালে সেলিম রেজা নামের একজনের কাছ থেকে তিনি বাড়িটি কিনেন। দুজন কেয়ারটেকারের তত্ত¡াবধানে গত দুই বছর ধরে বাড়িটি খালি পড়ে রয়েছে। ডেভেলপারদের দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন তৈরির প্রস্তুতি নেয়ার মধ্যেই গুপ্তধন অভিযানে পড়ল তার বাড়ি।

আইন কী বলে?

আইনের বিধান অনুসারে, এ ধরনের গুপ্তধন পাওয়া গেলে প্রথমত সরকারের কাছে তা পেশ করতে হবে। এই গুপ্তধনের মালিক প্রকৃতপক্ষে কে, সেটা নিধার্রণ করে দেবে সরকার। তবে যিনি এটি উদ্ধার করলেন, গুপ্তধনে তারও একটা ভালো অংশ অবশ্যই থাকবে। মিরপুরের এই ঘটনায় উদ্ধারকারী পুলিশ হওয়ায় উদ্ধারকারী হিসেবে কেউ কোনো অংশ পাবে না। তবে কেউ যদি এই সম্পত্তির প্রকৃত মালিক হিসেবে নিজেকে সাব্যস্ত করতে পারে, তাহলে সরকারের কাছে আবেদন করলে তিনি তার সম্পত্তি পেতে পারবেন।

বাংলাদেশে ১৮৭৮ সালের গুপ্তধন আইনের ৩ ধারা অনুসারে, ‘গুপ্তধন’ বলতে বোঝায় মূল্যবান যে বস্তু মাটিতে লুক্কায়িত থাকে অথবা যে বস্তু তার সঙ্গে যুক্ত থাকে। ওই আইনের ৪ ধারা অনুসারে, যে ব্যক্তি ১০ টাকার বেশি মূল্যের গুপ্তধন পায়, তাকে তার বিবরণ জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে জানাতে হয় এবং গুপ্তধন সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয় অথবা তা জমা প্রদানের জন্য জামানত দিতে হয়। ওই আইন অনুসারে, জেলা প্রশাসক গুপ্তধনের প্রকৃত মালিক কে অথবা তা ‘মালিকবিহীন’ কিনা, সে সম্পকের্ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি প্রকৃত মালিক নিধার্রণের জন্য গুপ্তধনের বিষয়ে প্রচারণা চালাবেন। কোনো ব্যক্তি যদি জেলা প্রশাসকের কাছে এসে নিজেকে ওই গুপ্তধনের ‘প্রকৃত মালিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, তাহলে গুপ্তধন তাকে দিয়ে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি ওই গুপ্তধন পেয়েছেন, সেই ব্যক্তি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি যদি ওই গুপ্তধনের মালিক হিসেবে সাব্যস্ত হন, তখন প্রকৃত মালিক এবং উদ্ধার করেছেন যে ব্যক্তি তারা গুপ্তধন বণ্টনের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছার চেষ্টা করবে। তাদের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে জেলা প্রশাসক গুপ্তধন উদ্ধার করা ব্যক্তিটিকে তিন-চতুথার্ংশ প্রদান করবেন এবং বাকি অংশ তার প্রকৃত মালিকের হাতে ন্যস্ত করবেন।

যদি কোনো ব্যক্তি তার মালিক বলে সাব্যস্ত না হন, তখন যে ব্যক্তি গুপ্তধন উদ্ধার করেছেন, জেলা প্রশাসক তাকে এবং যে জমি থেকে তা উদ্ধার হয়েছে তার মালিকের মধ্যে সেটি ভাগ করে দেবেন। তবে সরকার চাইলে গুপ্তধন হিসেবে প্রাপ্ত সম্পত্তি সরকারের মালিকানায় নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে শতর্ হলোÑ গুপ্তধনটি ‘মালিকহীন’ হিসেবে সাব্যস্ত হতে হবে এবং মালিকহীন হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার পর এই গুপ্তধন যাদের পাওয়ার কথা ছিল, তাদের সরকার পযার্প্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।

কোনো ব্যক্তি যদি জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি কতৃর্ক গুপ্তধনের নিষ্পত্তিতে সংক্ষুব্ধ হন, সে ক্ষেত্রে তিনি দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করে গুপ্তধনের বিষয়ে সুরাহা করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, গুপ্তধন পাওয়ার পর কোনো ব্যক্তি যদি বিষয়টি সরকারকে অবহিত না করে, সে ক্ষেত্রে তার এই কাজটিকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাকে এক বছরের কারাদÐ বা আথির্ক জরিমানা বা উভয় দÐে দÐিত করা হবে। কোনো ব্যক্তি যদি গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া ব্যক্তিটিকে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখতে প্ররোচণা দেয়, সে ক্ষেত্রে প্ররোচনা দানকারী ব্যক্তিটিকেও ছয় মাসের কারাদÐ, অথর্দÐ বা উভয় দÐে দÐিত করা হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের যে কোনো মাটির অন্তঃস্থ সব খনিজ ও মূল্যবান সামগ্রীর মালিক প্রজাতন্ত্র।’ এই অনুচ্ছেদটিকে গুপ্তধন আইনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। কোনো ব্যক্তি যদি মাটির নিচে কোনো বৈধ সম্পত্তি সংরক্ষণ করে রাখে, তা কেবল মাটির নিচে রাখার কারণে রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত হবে না। উদ্ধারের পর কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে প্রকৃত মালিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, রাষ্ট্র তাকে তার সম্পত্তি দিয়ে দেবে। তবে প্রাকৃতিক সম্পদের একচ্ছত্র মালিক রাষ্ট্র এবং মালিকবিহীন সম্পদ মাটির নিচে পাওয়া গেলেও তাও রাষ্ট্রের হাতেই ন্যস্ত হবে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে