logo
  • Tue, 13 Nov, 2018

  অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক   ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০  

তালাক দেয়ার নিয়মকানুন নিয়ে যত বিভ্রান্তি!

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন সাধারণভাবে শরিয়ার বিধান মেনে চলে। তবে শরিয়াতে নানা মত প্রচলিত থাকায় জটিলতা এড়াতে একটি বিশেষ মতকে অনুসরণ করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। তালাকের বিষয়ে বাংলাদেশের মুসলিম আইনে ১৯৬১ সালে কিছু বিধান নিধার্রণ করা হয়। কিন্তু এখনো পযর্ন্ত সাধারণ জনগণের মধ্যে আইনটি সম্পকের্ যথেষ্ট সচেতনতা না থাকায় তালাক প্রদানে নানা রকম বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকে।

তালাক দেয়ার নিয়মকানুন নিয়ে যত বিভ্রান্তি!
প্রথমেই তালাক সম্পকের্ প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাটি শুধরে নিই। মুখে মুখে তিন বার ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করলে বা একসঙ্গে ‘বায়েন তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করলে তালাক কাযর্করী হয় না। এমনকি, মুখে উচ্চারণ ছাড়া লিখিতভাবে তালাক দিলেও তা সঙ্গে সঙ্গে কাযর্করী হয় না। মুসলিম আইন অনুযায়ী একজন পূণর্ বয়স্ক এবং সুস্থ মস্তিষ্কের স্বামী যে কোনো সময় কোনোরকম কারণ ব্যতিরেকেই তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। তালাকের ক্ষেত্রে স্বামীর ক্ষমতা একচ্ছত্র, কিন্তু এজন্য আইনের বিধান মেনেই তা করতে হয়। বিধান না মানা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

স্বামী কতৃর্ক স্ত্রীকে তালাক দেয়ার বিষয়ে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে বলা হয়েছে যে, স্বামী তালাক দিতে চাইলে তাকে যে কোনো পদ্ধতির তালাক ঘোষণার পর স্ত্রী সে সময় যে এলাকায় বসবাস করছেন সে এলাকার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান/পৌর মেয়র/সিটি করপোরেশন মেয়রকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ দিতে হবে। সেই সঙ্গে তালাক গ্রহীতাকে উক্ত নোটিশের নকল প্রদান করতে হবে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, তালাকের নোটিশটি কত সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে। আইনে বলা আছে তখনই/ পরবতীর্ সময়ে/ যথাশিগগিরই সম্ভব।

যা পাঠাচ্ছেন এটিই তালাকের নোটিশ, এর জন্য আইন নিদির্ষ্ট কোনো ফরম বা বক্তব্য নিধার্রণ করেনি। নোটিশ লেখা বা পাঠানোর কাজটি তালাকদাতা নিজেও করতে পারেন, আবার অন্য কাউকে দিয়েও করাতে পারেন। নোটিশ পাঠানোর কাজটি ডাকযোগেও হতে পারে, আবার সরাসরিও হতে পারে। ডাকযোগে রেজিস্ট্রি করে এডি সহযোগে পাঠালে ভালো হয়। সরাসরি পাঠালে নোটিশের এক কপি করে রিসিভ করে নেয়া ভালো।

চেয়ারম্যান/মেয়র নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ হতে নব্বই দিন অতিবাহিত না হওয়া পযর্ন্ত কোনো তালাক বলবৎ হবে না। কারণ নোটিশ প্রাপ্তির ত্রিশ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান/মেয়র সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়ের মধ্যে আপোষ বা সমঝোতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সালিশি পরিষদ গঠন করবে এবং উক্ত সালিশি পরিষদ এ জাতীয় সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই অবলম্বন করবে। উল্লেখ্য, নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সালিশের কোনো উদ্যোগ নেয়া না হলেও তালাক কাযর্কর বলে গণ্য হবে। তবে স্ত্রী গভর্বতী থাকলে গভর্কাল শেষ হওয়ার পর তালাক কাযর্কর হবে। তবে সমঝোতার ৯০ দিন সময় চেয়ারম্যান কতৃর্ক নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে শুরু হয়। তালাক দেয়া বা নোটিশ লেখার তারিখ থেকে শুরু হয় না। (শফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র, ৪৬ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৭০০)। সালিশি পরিষদ ৯০ দিন সময় পেয়ে থাকে।। এর মধ্যে প্রতি ৩০ দিনে একটি করে মোট তিনটি নোটিশ দেবে। এর মধ্যে স্বামী নোটিশ প্রত্যাহার না করলে তালাক কাযর্কর হবে। কিন্তু নোটিশ প্রত্যাহার করলে তালাক কাযর্কর হবে না।

নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই যদি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী অন্য কারও সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, তাহলে উক্ত বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে। (সৈয়দ আলী নেওয়াজ বনাম কনের্ল মো. ইউসুফ, ১৫ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) পৃষ্ঠা-৯)। কারণ তালাক সম্পূণর্ কাযর্করী না হওয়া পযর্ন্ত পক্ষগণ আইনসম্মতভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই থেকে যায়। (শফিকুল ইসলাম এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র, ৪৬ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৭০০)। এই ৯০ দিন পযর্ন্ত স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণও দিতে বাধ্য।

এখানে মনে রাখা দরকার যে, নোটিশ পাঠানোর কোনো দায়িত্ব বিধিবদ্ধভাবে কাজীর নেই। যিনি তালাক দিলেন, তিনিই কাজটি করবেন। তবে কোনো তালাকদাতা যদি নিজের অসামথর্্য বা অজ্ঞতার দরুন কোনো কাজীকে ওই কাজের উপযুক্ত ব্যক্তি বলে মনে করেন, তবে তিনি কাজীকে দিয়ে নোটিশ পাঠানোর কাজটি করাতে পারেন। লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশের বেশির ভাগ কাজীই ‘মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশের ৭(১) ধারায় তালাকের নোটিশ’ ধরনের শিরোনামযুক্ত নোটিশ নিজেরাই ছাপিয়ে রেখেছেন এবং সেগুলো দিয়ে যার যার চাহিদামতো তালাকের নোটিশ পাঠাচ্ছেন।

নিধাির্রত নিয়ম ও সময়ান্তে প্রদত্ত একটি তালাক যদি কাযর্কর হয়, তখনই কেবল তা রেজিস্ট্রি করার সুযোগ আসবে। বিদ্যমান আইনের বিধানমতে, মুসলিম বিবাহ রেজিস্ট্রি করানো বরের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও তালাকের ক্ষেত্রে তা তালাকদাতার ইচ্ছাধীন। তবে কোনো তালাক রেজিস্ট্রি করার আগে ওই তালাকটি বিধি অনুযায়ী কাযর্কর হয়েছে কি-না, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে নেয়ার বাধ্যবাধকতা কাজীর রয়েছে। কাজীরা তালাকদাতার হয়ে নোটিশ তৈরি ও পাঠানোর যে কাজটি করে থাকেন, তা শুধু তালাকের ঘোষণা হিসেবে কাজ করবে। ওই ঘোষণা শেষ পযর্ন্ত কাযর্কর না-ও হতে পারে। তাই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তালাক রেজিস্ট্রি করে ফেলার সুযোগ কাজীর নেই। তিনি যদি সেটা করে থাকেন, তাহলে ওই রেজিস্ট্রেশন কাযর্কর হওয়া কোনো তালাকের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে না। কেবল ৯০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরে একজন নিকাহ রেজিস্টার কতৃর্ক তালাকের সাটিির্ফকেট গ্রহণ করা যায়।

আবার বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী যেহেতু তালাক প্রদানের সময় স্ত্রী যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকায় তা কাযর্কর হয় এবং সেই এলাকার কাজীর কাছেই তা রেজিস্ট্রিও করতে হয়; সেহেতু তালাক কাযর্করকারী পক্ষদ্বয়ের মধ্যে স্ত্রীর বসবাস যে এলাকায়, সেই এলাকার বাইরের কোনো কাজীর সুযোগ নেই তাদের মধ্যকার তালাকটি রেজিস্ট্রি করার। আর পেছনের তারিখ ব্যবহার করে কোনো তালাক রেজিস্ট্রি করা অসদাচরণ তো বটেই, রীতিমতো অপরাধও।

উল্লেখ্য, স্বামী যদি চেয়ারম্যান এবং স্ত্রীকে নোটিশ প্রদান না করে তাহলে স্বামী এক বছর বিনাশ্রম কারাদÐ অথবা ১০ হাজার টাকা পযর্ন্ত জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দÐনীয় হবেন, কিন্তু তালাক বাতিল হবে না। উক্ত তালাক কাযর্কর হবে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে অধ্যাদেশের কোথাও নোটিশ প্রদান না করলে তালাক হবে না এই বিধান উল্লেখ নাই। এই বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে। সিভিল রিভিশন নং ৬৯৮, ১৯৯২, মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বনাম মোছা. হেলেনা বেগম ও অন্যান্য।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোটের্র আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। ংবৎধল.ঢ়ৎধসধহরশ@মসধরষ.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে