logo
  • Thu, 18 Oct, 2018

  অনলাইন ডেস্ক    ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০  

নাক-কান-গলার ক্যান্সার

প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হলে ভালো হয়

ক্যান্সার এবং মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ কঠিন, ব্যয়বহুল, নিরন্তর এবং অন্তহীন। এই যুদ্ধে মানুষ হেরে গেলে ক্যান্সার মানুষকে বধ করে। আর ক্যান্সার হেরে গেলে মানুষ বেঁচে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অগ্রযাত্রার ফলে মানুষ এখন দাবি করতে পারে ক্যান্সার ভালো হয় যদি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে।

প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হলে ভালো হয়
সারা শরীরের ক্যান্সারের মতো হেড নেক ক্যান্সার ও থাইরয়েড ক্যান্সার বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন নাক কান গলাবিষয়ক বিশেষায়িত শাখার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলোÑ হেড নেক ক্যান্সার ও থাইরয়েড ক্যান্সার বিশেষায়িত শাখা। বুকের ওপর থেকে মাথার ওপর পযর্ন্ত যে ক্যান্সার হয় তাকে হেড নেক ক্যান্সার বলে। এর মধ্যে পড়ে ঠেঁাট, জিহŸা, নাক ও সাইনাস, খাদ্যনালির ওপরের অংশ এবং স্বরযন্ত্র, গলা এবং লালাগ্রন্থির ক্যান্সার। হেড নেক শরীর সবচেয়ে জটিল অংশ, কারণ এখানে শরীরের গুরুত্বপূণর্ নাভর্ ও রক্তনালি থাকে যারা ব্রেইনের সঙ্গে শরীরের অন্য অংশের সংযোগ রক্ষা করে। তা ছাড়া খাদ্যনালি ও শ্বাসনালির ওপরের অংশ এখানেই অবস্থিত। হেড নেক ও ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হেড নেক ক্যান্সার সাজর্ন, প্লাস্টিক সাজর্ন পূণর্বাসন বিভাগ ও মনোবিজ্ঞানী।

হেড নেক রিজিয়নে হেড, নেক ও ইএনাটি সাজর্ন, জেনারেল সাজর্ন, ফেসিও মেক্সিলারি সাজর্ন ও হেড, নেক ক্যান্সার সাজর্নরা কাজ করে থাকেন। হেড নেক সাজর্নরা হেড নেক এলাকার ক্যান্সার এবং অ-ক্যান্সারজাতীয় রোগের ও চিকিৎসা করে থাকেন। কিন্তু হেড নেক ক্যান্সার সাজর্নরা শুধু হেড নেক এলাকার ক্যান্সারের সাজাির্র করে থাকেন। সুতরাং একই এলাকার কাজ করলেও তারা দুটি আলাদা গ্রæপ।

আমাদের দেশে প্রতি বছর কত সংখ্যক হেড নেক ক্যান্সারের রোগী পাওয়া যায় তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যায় জানা নেই। ভারতে প্রতি বছর ২ লাখের বেশি হেড নেক ক্যান্সারের রোগী শনাক্ত করা হয়। সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ ক্যান্সার হয় তার ৫৭.৫০ শতাংশ হয় এশিয়ার বিশেষ করে ভারতে। ৬০-৮০ শতাংশ রোগী অ্যাডভান্সড স্টেজে ডাক্তারের কাছে যায় যা উন্নত বিশ্বে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের চিত্র ও ভারতের মতোই। হেড নেক ক্যান্সার শরীরের মোট ক্যান্সারের ৫ শতাংশ এবং প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে নিরাময় সম্ভব। হেড নেক ক্যান্সারের ঝুঁকিপূণর্ উপাদানগুলো হলো, পান, সাবান, জদার্, সুপারি, ধূমপান, অ্যাকোহল, মুখের অযতœ, কারখানার ধেঁায়া, ধুলা, রেডিয়েশন এবং ভাইরাস।

এসব ঝুঁকিপূণর্ উপাদান সেলের ডিএনএ-কে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং প্রিক্যান্সারস জিন ক্যান্সার জিনে রূপান্তরিত হওয়াকে ত্বরান্বিত করে। প্রিক্যান্সার জিন যে কোনো সময়ে ক্যান্সার জিনে পরিণত হতে পারে। টিউমার সাপ্রেসর জিন প্রি-ক্যান্সার জিনকে ক্যান্সার জিনে পরিণত হওয়াকে বাধা দেয়। টিউমার সাপ্রেসর জিন যদি দুবর্ল হয় বা ত্রæটিপূণর্ হয় তখন প্রি-ক্যান্সার জিন ক্যান্সার জিনে রূপান্তরিত হয় এবং সেলে অনিয়ন্ত্রিত, অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হতে থাকে যাকে আমরা ক্যান্সার বলি। তার মানে আমাদের ধ্বংসের বীজ আমাদের মধ্যে পুঁতে রাখা হয়েছে। ক্যান্সার সেল পাগলের মতো। অন্য সেলের প্রতি তাদের কোনো সম্মান নেই। তারা সেলের স্বাভাবিক নিয়ম মানে না, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে দ্রæত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই অবিরত বৃদ্ধি ক্রমে টিস্যুকে এবং পরে ব্যক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। একটি সেল থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩ মাসের মধ্যে ১ কেজি ওজন পযর্ন্ত হতে পারে। ক্যান্সার সেল অমরত্ব পায়। মেয়াদ শেষে সেলের স্বাভাবিক মৃত্যুকে তারা অগ্রাহ্য করে, নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনীয় রক্তনালি তৈরি করতে পারে, অল্প অক্সিজেনে বেঁচে থাকতে পারে, অতি দ্রæত এক স্থান থেকে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে যেমনÑ মুখ বা শ্বাসনালি থেকে গলায়, ফুসফুসে, হাড়ে এবং লিভারে। হেড নেক ক্যান্সারের উপসগর্ প্রাথমিক আক্রান্ত স্থান হিসেবে দেখা দেয় যেমন মুখে বা জিহŸায় হলে খাবারের কষ্ট, স্বরযন্ত্রে হলে স্বরের পরিবতর্ন বা শ্বাসকষ্ট। কখনো বা এদের সঙ্গে গলা ফোলাও দেখা দেয়। ক্যান্সার নিণর্য় করার জন্য প্রয়োজন রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও লেখা এবং শারীরিক পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি টেস্ট, রেডিও লজিক্যাল, সাইটোলজিক্যাল এবং হিস্টলজিক্যাল টেস্ট।

ক্যান্সারের প্রধান চিকিৎসা সাজাির্র। সাজাির্র পরবতীর্ রেডিও-কেমোথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রেডিও থেরাপি দিয়েও চিকিৎসা করা যায়। তবে এগুলোর পাশ্বর্প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি এবং সময় ও চিকিৎসার ব্যয় অত্যাধিক।

থাইরয়েড গø্যান্ড গলার মাঝখানে থাকে এবং থাইরয়েড হরমোন তৈরি করে যা জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। থাইরয়েড গø্যান্ডের অবস্থান গলায় হলেও এটা হেড নেক ক্যান্সারের অন্তভুর্ক্ত নয়, কারণ এই ক্যান্সারের প্রকৃতি সম্পূণর্ আলাদা। শরীরের সব কান্সারের তিন শতাংশ থাইরয়েড ক্যান্সার। ভারতে প্রতি বছর এক লাখে একজন পুরুষ এবং ১.৮ জন নারীর থাইরয়েড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে। থাইরয়েড ক্যান্সারের সাজাির্রর পরবতীর্ ফলাফল খুবই ভালো। ৯৫ শতাংশ রোগী দীঘের্ময়াদি সুফল পায়, অনেকে ক্যান্সার থেকে মুক্ত হয়ে যায়। অপারেশনের পরে কোনো কোনো রোগীর রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন দিয়ে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিছু না করতে পারলে রেডিও থেরাপি দেয়া যেতে পারে। যার ফলাফল তেমন ভালো নয়। থাইরয়েড ক্যান্সার গø্যান্ড থেকে গলায়, হাড়ে ও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করা খুবই জরুরি। জেনারেল সাজর্ন, অ্যান্ডোক্রাইন সাজর্ন, ইএনটি সাজর্ন এবং হেড নেক সাজর্ন, হেড নেক ক্যান্সার সাজর্ন ও থাইরয়েড সাজর্নরা এই সাজাির্র করে থাকে। থাইরয়েড অপারেশনের প্রধান সমস্যা হলো স্বরনালির নাভের্ক রক্ষা করা। যদি একটি নাভর্ ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবে স্বরের পরিবতর্ন হয় এবং যদি দুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয় তবে শ্বাসের কষ্ট হয়। যা ম্যানেজ করা খুবই ঝামেলাপূণর্। প্যারা থাইরয়েড গø্যান্ড যা থাইরয়েড গø্যান্ডের সঙ্গে লেগে থাকে তাদের রক্ষা করা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এই ৪টি অতি ক্ষুদ্র প্যারা থাইরয়েড গ্রান্ডকে রক্ষা করতে না পারলে রক্তে ক্যালসিয়াম কমে যায় এবং রোগীদের হাত-পা ঝিন ঝিন করে এবং খিঁচুনি হয়। এসব রোগীকে সারা জীবন ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে হয়।

আমাদের দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান সমস্যা হলো অপযার্প্ত ক্যান্সার সাজর্ন, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, এবং ক্যান্সার হাসপাতাল। ফলে ক্যান্সার রোগীর সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইন্ডিয়ায় বতর্মানে ৩০টি রিজিওনাল ক্যান্সার সেন্টার আছে। এগুলো রিজিওনাল কারণ নিদির্ষ্ট এলাকার জন্য এগুলো নিধাির্রত। এখানে সব বিষয়ের ক্যান্সার সাজর্ন এবং ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আছেন। ফলে রোগী প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা এসব সেন্টার থেকে পেয়ে থাকে। তারা ১৯৭৫ সালে ৫টি সেন্টার দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। তাদের অনেক প্রাইভেট ক্যান্সার হাসপাতালও আছে।

আমাদের দেশে একটি সরকারি ক্যান্সার হাসপাতাল আছে এবং প্রতিটি মেডিকেল কলেজে ক্যান্সার বিভাগ আছে যেগুলো প্রধানত রেডিয়েন্স এবং ক্যামোথেরাপিনিভর্র। কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল আছে। তারাও রেডিয়েন্সনিভর্র। সেখানে চিকিৎসার ব্যয় খুব বেশি।

আমাদের দেশে দিন দিন ক্যান্সার বাড়ছে। এদের সুচিকিৎসার জন্য রিজিওনাল ক্যান্সার সেন্টার তৈরি করা খুবই জরুরি। মেডিকেল কলেজের ক্যান্সার বিভাগে ক্যান্সার সাজর্ন নিয়োগ দরকার। বেসরকারিভাবে উন্নতমানের পূণার্ঙ্গ ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে রোগীরা সহনীয় ব্যয়ে চিকিৎসা করাতে পারবে।

ক্যান্সার এবং মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধ কঠিন, ব্যয়বহুল, নিরন্তর এবং অন্তহীন। এই যুদ্ধে মানুষ হেরে গেলে ক্যান্সার মানুষকে বধ করে। আর ক্যান্সার হেরে গেলে মানুষ বেঁচে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অগ্রযাত্রার ফলে মানুষ এখন দাবি করতে পারে ক্যান্সার ভালো হয় যদি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে।

যাযাদি হেলথ ডেস্ক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে