logo
রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬

  ফখরুল হাসান   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০  

আক্কুর বুদ্ধি

আক্কুর বুদ্ধি
আক্কু ঘুম থেকে সকালবেলায় ওঠে ভয়ানক খিদে নিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। মনে হচ্ছে খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি বাইরে বের হয়ে আসবে। মাথাটাও চক্কর দিচ্ছে। ছেঁড়া মলিন প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুঝতে পারে পকেটে টাকা নেই। আজকে আর বজা মামার হোটেলে রুটির সঙ্গে পাতলা ডাল খাওয়া হবে না। রেলস্টেশনের পাশের পুকুর থেকে হাত-মুখ ধুয়ে আবার ঝুপড়িতে ঢোকে। রেলস্টেশনে যারা বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে তাদের অনেকে চট ঝুলিয়ে ঘর বানিয়ে থাকে। আক্কুর ঘর-ফরের দরকার হয় না। ঝুপড়িতে ঢুকে হাঁড়িকুঁড়ি খুঁজে অল্প চিড়ে আর গুড় পাওয়া যায়। এটাই আক্কেল আলী আক্কুর আজকের সকালের নাশতা। বর্ষার সময়ে ঠান্ডা থাকে বলে মানুষ পানি কিনতে চায় না। তখন বেচা বিক্রি কম হয়। তাই মাঝেমধ্যে না খেয়ে থাকতে হয়। ভৈরব রেলস্টেশনে পানি বিক্রি করে আক্কু। তার বাবা-মা নেই। বৃদ্ধ নানির কাছে থাকে সে। কয়েকদিন ধরে তার নানি অসুস্থ। নানিকে মনে হয় কঠিন অসুখে ধরেছে। তা না হলে চিড়ে, গুড় খেতে হতো না। নিজের জন্য চিন্তা না। আক্কুর চিন্তা নানির জন্য।

সারাদিন রেলস্টেশনে পানি বিক্রি করে যা পায় তা দিয়ে আক্কু ও তার নানির চলে না। তবুও সন্ধ্যার পর আক্কু কোনো কাজ করে না। কারণ টিভিতে দেখেছে সিনেমার নায়করা লেখাপড়া করে ভালো মানুষ হয়। তা ছাড়া রেলের টিটি বলেছে লেখাপড়া করলে ভদ্রলোক হওয়া যায়। আক্কু বড় হয়ে ভদ্রলোক হতে চায়। সিনেমার নায়কের মতো। তাই সে রেললাইনের বস্তির ছেলেমেয়েদের জন্য যে স্কুলটি চালু করেছে, রাতে সেখানে পড়তে যায়। স্যার খুব ভালো ভালো কথা বলে। দেশকে ভালোবাসতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। মানুষের মতো মানুষ হতে হবে। চুরি করা পাপ।

তাছাড়া স্যার বিভিন্ন খাবার নিয়ে আসে। আক্কুর খুব ভালো লাগে স্যারের কথাগুলো। আক্কুর সঙ্গের অনেকে স্কুলে আসে না। কেউ গ্যারেজে, কেউ হোটেলে কাজ করে। কেউ রেলস্টেশন থেকে চুরি করে। আক্কু সেগুলো করে না। কারণ সে লেখাপড়া করে ডাক্তার হবে; ভদ্রলোক হবে। ডাক্তার হয়ে ভৈরব রেলস্টেশনের সব গরিব মানুষকে চিকিৎসা দেবে। কারণ তার বাবা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর মাও তাকে ছেড়ে চলে গেছে বাবার কাছে। আকাশ কালিবর্ণ মেঘে ভরা। অগুণতি ছ্যাদা দিয়ে কখন জানি নেমে আসে অঝোর ধারায় বর্ষণ। সন্ধ্যার পর আজও আক্কু রেলস্টেশন থেকে অল্প দূরে স্কুলটায় পড়তে যাচ্ছে। স্কুলে ঢুকতেই সাগর স্যার তাকে বলল, 'আমাদের আক্কেল আলী আক্কু তো দেখি স্কুল কামাই দেয় না!'

'স্যার স্কুল কামাই দিলে তো পড়ায় পিছিয়ে যাবো।'

'হঁ্যা তা ঠিক বলেছিস।'

'স্যার, তাছাড়া।'

'তাছাড়া কী?'

'আপনার ভালো ভালো কথাগুলো তো শুনতে পারব না! আমাকে আপনিই শুধু এত সুন্দর নামে ডাকেন।'

'লেখাপড়া শিখে ভালো মানুষ হলে সবাই তোকে ভালো নামে ডাকবে।'

আজকে দ্রম্নত স্কুল ছুটি দিয়ে দিল। স্যার বললেন, দেশের অবস্থা ভালো না। ঢাকায় নাকি গ্যাঞ্জাম হচ্ছে। সবাইকে ছুটি দিয়ে আক্কুকে সাগর বলল, 'চল, আমার সঙ্গে। আজকে আমার বাসায় রাতের খাবার খাবি। আর তোর নানির জন্য খাবার নিয়ে আসবি।' আক্কু ফিরে আসার সময় ভাবতে লাগল- দেশের আবার কী হলো? এমনটা ভাবছে আর রেললাইন দিয়ে হেঁটে আসছে আক্কু। হঠাৎ তার চোখে পড়ল রেললাইন কাটা! কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। সে রেললাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর শাঁই শাঁই করে ছুটে আসছে ট্রেন। আক্কুর চিন্তা কীভাবে ট্রেন থামাবে। ট্রেন না থামাতে পারলে তো ওর বাবা-মায়ের মতো বহু মানুষ মারা যাবে। চারপাশে ভালো করে দেখে ঝোপের ভেতর উঁকি দিতেই দেখতে পেল ভাঙা একটা বোতল। তা দিয়েই হাত কেটে ফেললো। শরীর থেকে সাদা রঙের গেঞ্জিটি খুলে হাতের রক্ত দিয়ে লাল করে নিল। গেঞ্জিটা হাতে নিয়ে ছুটছে রেল থামাতে। কাটা জায়গা দিয়ে তখনও রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। সেদিকে খেয়াল নেই তার। এই মুহূর্তে চিন্তা একটাই রেল থামাতে হবে। আক্কুর লাল পতাকা দেখে রেল থেমে গেল। হঠাৎ করে রেল থামাতে যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। সবাই নিচে নেমে এসে জানতে পারল রেল থামানোর কারণ। সঙ্গে সঙ্গে আক্কুর এই কাজটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পেল কোনো মিডিয়া আসার আগেই। ট্রেনে ছিল একজন সাংবাদিক মীর হেলাল। তিনি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকা ফিরছিলেন। স্বভাবসুলভ আক্কুকে প্রশ্ন করলেন। বিভিন্ন বিষয়ে, হঠাৎ একটি প্রশ্ন করেন আক্কু বড় হয়ে কী হতে চায়। আক্কুর সোজা জবাব দিল ডাক্তার হতে চাই। সাংবাদিক কারণ জানতে চাইলে। আক্কু বলে গরিব মানুষের চিকিৎসা করবে। এই নিউজটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে অধ্যাপক ডা. শামছুন নাহার আক্কুকে নিয়ে আসেন তার কাছে...
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে