logo
রোববার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

  প্রতিভা রানী কর্মকার   ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

সবুজের সবুজে মেশা

সবুজের সবুজে মেশা
মেঘগুলো উড়তে উড়তে সবুজদের গ্রামের মাঠে এসে থামল। রাতে এক পশলা বৃষ্টি এসে মাঠটিকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। চারদিকে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। মাঠের পাশে শান্ত গভীর দীঘি। দীঘির পাশে শ্বেত-শুভ্র হাঁসের দল বারবার মুখ লুকোচ্ছে। যেন অপার শান্তি আর আনন্দ। একটু দূরে সোনার শস্যক্ষেত। তরুণ কৃষক হাতের বাঁশিখানা বুকের ওপর রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শীতল বটবৃক্ষের ছায়ায় এ যেন স্বস্তির বাতায়ন। বকুল ফুলের গন্ধে মন মাতালো। সবুজ দেখল পায়ের নিচে বকুল ফুলগুলো তারার মতো ছড়িয়ে আছে। চারদিকে নানা রঙের ঘাস ফড়িং নেচে নেচে সবুজকে ওদের গ্রামে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সবুজ তাদের ছুঁতে চাইলেও ওরা সবুজের কাছে ধরা দিল না। কিছুক্ষণ লুকোচুরি করে হারিয়ে গেল। কোনো এক জেলে মাছ ধরবে বলে জালটিকে পিঠের ওপর ফেলে হেলিয়ে-দুলিয়ে হাঁটছে। পাশেই দাঁড়ানো মিষ্টি কিশোর। হাতে রঙিন লাটাই। কিশোর সবুজ ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে লাটাইটি অনেক উঁচুতে উড়াবে- যেন গ্রামের সবচেয়ে উঁচু বাড়িটিকেও ছাড়িয়ে যায়। কিশোরের চোখে স্বপ্ন, মুখে হাসি। সবুজও আজ লাটাই উড়াবে, তরুণ কৃষকের বাঁশির গান শুনবে, কিশোরী মেয়ের বকুল ফুলের মালাগাঁথা দেখবে, জেলে ভাইয়ের সঙ্গে মাছ ধরবে। আর এভাবেই সবুজ মিশবে সবুজে।

আহা কি হলো! এই সবুজ ওঠ! ওঠ! মায়ের ডাকে বিছানায় শুয়ে চোখ খুলে তাকাতেই সবুজ দেখল সে তাদের জিগাতলার ফ্ল্যাটে শুয়ে আছে। ওর স্বপ্নের ঘোর এখনো কাটেনি। ঘরে এসির ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগল। খাটের ধারে রেহানা গোমরা মুখে দাঁড়ানো। রেহানার পরনের ম্যাক্সিটাতে হলুদের দাগ। চোখ ফোলা ফোলা। চুলগুলো অগোছালো। কিন্তু কেন! বিছানা গোছাতে গোছাতে রেহানা বলল, 'সবুজ ভাইয়া জানো, এবার ঈদের ছুটিতে আমাদের গ্রামে যাওয়া হচ্ছে না।' কিন্তু সবুজ তো গত রাতেই মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছে। ওরা ঠিক করেছে ঈদের দুই-তিনদিন আগে পীরগঞ্জে ওদের নানার বাড়ি যাবে। স্কুল, স্কুলের পড়া, স্কুলের কাজ, হোম টিচার- এসব ছেড়ে সবুজ সবুজে হারাবে। মাকে জিজ্ঞেস করতেই মা টানটান জবাব দিল, তোমার বাবাকে বলো। বাবার সোজা উত্তর, 'পড়তে বসো। গত টার্মে তোমার রেজাল্ট ভালো হয়নি। এখন বেড়ানোর সময় নেই। তা ছাড়া আমার আগের প্রজেক্টের কাজ ছুটিতে শেষ করব। অতএব, ঢাকায় ঈদ করব।'

সবুজ কিছুক্ষণ নীরবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। আজকের স্বপ্নটা তার জন্য একটু আলাদা। ইদানীং সবুজ প্রায়ই ঘুমের মধ্যে এরকম স্বপ্ন দেখে, স্কুলের সিঁড়ি থেকে পড়ে গেছে বা পা রাখতে গিয়ে দেখে সেখানে শুধুই শূন্যতা। যাক দূরের কোনো সবুজ গ্রামে বাস্তবে না মেশা হলেও স্বপ্নে তো তার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটল, এই বা কম কিসে!

এরপর হঠাৎ সবুজের চোখে পড়ল তাদের চারপাশে দেয়ালের ফাঁকে এক টুকরো আকাশ, জানালার গ্রিলে মানিপস্নান্টের সবুজ পাতা যা এখনো ভিজে আছে। গত রাতে কি সত্যি বৃষ্টি এসেছিল? শহরে পাখি ডাকে, বৃষ্টি হয়, গাছের পাতা ভেজে... তবুও কেন সবুজের অবসর মেলে না- এক টুকরো সবুজে হারানোর, সবুজে মেশার।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে