logo
বুধবার ২৬ জুন, ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

  খলিলুর রহমান   ০১ জুন ২০১৯, ০০:০০  

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

গল্প কথায় ইফতার উৎসব

গল্প কথায় ইফতার উৎসব
বেলা শেষে রোদ আলো-ছায়ার মনোরম চিত্রাঙ্কন করে সবুজের রাজ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ। যেখানে বছরের এগারো মাস ব্যাট-বল বা ফুটবলের রাজত্ব চলে সেখানে রমজান মাসে দেখা যায় ভিন্ন সাজ। মাসের শুরু থেকেই এখানে শিক্ষার্থীরা ইফতার উৎসবে মেতে ওঠে। ছোট ছোট দলে গোল হয়ে বসে চলে ইফতারির প্রস্তুতি। সূর্যাস্তের অপেক্ষায় জমে ওঠে গল্প-আড্ডা।

উৎসব শুধু মাঠেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটোরিয়া ও টিএসসির বারান্দা, পরিবহন চত্বর, শহীদ মিনারের পাদদেশ, অডিটোরিয়ামের বারান্দা, নিজ-নিজ বিভাগ, টারজান পয়েন্ট ইত্যাদি জায়গায়ও আয়োজনের কমতি থাকে না। ব্যক্তিগত, সামষ্টিক, এমনকি সাংগঠনিক উদ্যোগেও এই আয়োজন পরিচালিত হয়। আনন্দের স্রোতে যুক্ত হয় সাবেক শিক্ষার্থীরাও। এই উৎসব রূপ নেয় মহামিলনমেলায়।

সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতির বন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সবার জন্য হয়ে ওঠেপ্রন্ধুত্বপূর্ণ। পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে কেবল মুসলিম শিক্ষার্থীরাই নয়-হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বন্ধু-বান্ধবীরাও আনন্দের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইফতারে শামিল হয়। অসাম্প্রদায়িক জাবি ক্যাম্পাসের এই অপূর্ব মিলনমেলার দৃশ্য আনন্দদায়ক ও ব্যতিক্রমী।

প্রথম থেকে ৪৮তম ব্যাচের সব শিক্ষার্থী মিলে আয়োজন করা হয়েছে ইফতার। এটা ছিল অন্যান্য বছর থেকে একটা ভিন্ন আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীরা একই ইফতারে। যাদের পদচারণায় খেলার মাঠ সারা বছর মুখরিত থাকে ঠিক তারাই মেতে উঠছে ইফতারের আনন্দে। '১ থেকে ৪৮' এই ধারণার অন্যতম সংগঠক বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী এসএম সাদাত হোসেন বলেন- 'বিশ্ববদ্যিালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে ইফতার এক অসম্ভব আবেগের অনুভূতি। সাবাই ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিকভাবে ইফতার করে। আমরা চারজন মিলে চিন্তা করেছি সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কীভাবে ইফতার করা যায়। এই চিন্তা থেকেই চলে আসে ১ থেকে ৪৮। সবুজ মাঠে জাবির সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এখানে সবাই মিলে মেতে উঠেছি ইফতার আনন্দে। পাশাপাশি জমে উঠেছে আড্ডা-গল্প। সাবেকরা ফিরে গেছে অতীতে। এই উৎসব এবার প্রথমবারের মতো শুরু হলেও এর ধারাবাহিকতা চলবে।'

এক বিকেলে দেখা হলো ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাছির হোসেনের সঙ্গে। পাঞ্জাবি পরে কয়েকজনের সঙ্গে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করতে বলে চাঁদপুর জেলা সমিতির ইফতার। সে আরও বলেন, 'নিজের পরিবার ও জেলা ছেড়ে অনকেদূর চলে আসার পর ক্যাম্পাসে জেলার শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধবী ও বড় ভাই-বোনেরাই পরিবার। সেই পরিবারের সঙ্গে ঘাসের ওপর বসে ইফতার করার আনন্দ ভাষায় বোঝানো যাবে না। গল্পে আর আড্ডায় পরিবারের স্বাদ পাওয়া যায়।'

একদিন মাঠে হাঁটতেই দেখা মিলল ১৪ জনের একটি গ্রম্নপ। ইফতারসামগ্রী মাঝখানে রেখে গোল হয়ে বসে আছেন তারা। জানা গেল, তারা ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৪৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী। তাদের একজন মুনিয়া তাহসিন বলেন, 'পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থেকে আমাদের ভরসার হাতটা রাখতে হয় বন্ধুদের কাঁধেই। আত্মার আত্মীয়তে পরিণত হওয়া বন্ধুরাই আমাদের চলার পথকে করে মসৃণ। রোজার ছুটিতে ইফতারের সময়গুলো পরিবারহীন ভীষণ অসহায় লাগে। একসঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে এই ইফতার পরিবারের প্রশান্তিময় সেই পরিবেশ আর আমেজটাই ফিরিয়ে দেয়।'

এই প্রতিযোগিতায় সামাজিক সংগঠনগুলোও কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। তেমনি একটি সংগঠন জাবি লিও ক্লাব তার সদস্যদের নিয়ে আয়োজন ইফতার। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, 'বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি লিও ক্লাব জাবি শাখা পবিত্র রোজা শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ক্লাবের সদস্যদের নিয়ে আয়োজন করে ইফতার অনুষ্ঠানের। খোলা আকাশের নিচে সবুজ ঘাসে বসে আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার বৃদ্ধি করে ভ্রাতৃত্ববোধ ও বন্ধুত্ব। যা যে কোনো সংগঠনের জন্য খুবই জরুরি।'

সূর্য পশ্চিম আকাশে ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ইফতার নিয়ে। ইফতার শেষ করেও চলে গল্প ও আড্ডা। এভাবেই আনন্দদায়ক ও ব্যতিক্রমী সব আয়োজনের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয় দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একেকটি রোজার সন্ধ্যা।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে