logo
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৬

  হাসনাত আবদুল হাই   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

এই নৃশংস হত্যাকান্ডের শেষ কোথায়

সব হত্যাকান্ডই নৃশংস। কোনো কোনো হত্যাকান্ড নৃশংসতায় অন্যসব মাত্রা অতিক্রম করে যায়। বরগুনায় নিহত রিফাত শরীফ হত্যাকান্ড এমনই একটি। ছবি দেখে এবং শুনে মনে হবে এই হত্যাকান্ড বাস্তবে ঘটেনি, চিত্রনাট্য অনুযায়ী কোনো অ্যাকশন ফিল্মের দৃশ্যগ্রহণ। সিনেমায় যেমন হয় এখানেও নাটকীয়তা ছিল যথেষ্ট। যেমন দর্শকদের নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, সাহায্যের জন্য চিৎকার করে ব্যর্থ হয়ে নিহতের স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে হত্যাকারীদের বিরত করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করা, হত্যাকারীদের হাতে মারাত্মক ধরনের ধারালো অস্ত্র এবং ভিকটিমের শরীরের পোশাক রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে, হত্যাকারীদের পরিচয় এবং জীবনযাপনে তথ্য পাওয়ার পর এই দৃশ্য যে অ্যাকশন ফিল্মের অনুকরণেই সাজিয়েছিল তারা, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রধান হত্যাকারী এবং হত্যাকান্ডের মূল হোতার নাম নয়ন হলেও সে নামের শেষে বন্ড যোগ করেছিল। অ্যাকশন ফিল্মের কথা মনে রেখেছে যেমন বন্ড, সত্যিকার অর্থে যাই হোক জেমস বন্ড অবশ্য স্পাইথ্রিলার হিরো ছিল। নয়ন বন্ড কেবল তার নামটাই গ্রহণ করেছে, তার বীরত্ব এবং ঘৃণ্য অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়টি বিস্মৃত হয়ে। তবে ফিল্মের ভায়োলেন্স যে তাকে এবং তার সহযোগীদের উৎসাহ দিয়েছে তা বেশ বোঝা যায়। এবং তারা নিকৃষ্ট খল চরিত্রের ভূমিকা পালনে খারাপ কিছু দেখেনি। অবশ্য তারা তাদের বিকৃত এবং পাশবিক মানসিকতার পরিস্ফুটিনে বেছে নিয়েছে ফিল্ম নয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম- যেখানে ০০৭ বন্ড নামে তারা একটি গোষ্ঠী গঠন করে অপরাধমূলক কাজের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছে বলে কাগজের খবরে প্রকাশ। নিহত রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে খুন করা হয়েছে ফিল্মি স্টাইলে, কিন্তু খুব ঠান্ডা মাথায়। আকস্মিক ছিল না এই নৃশংস হত্যাকান্ড। এর পেছনে ছিল নিখুঁত পরিকল্পনা এবং প্রায় একডজন হত্যাকারীর একটি দল। তাদের সবার অবশ্য একটা পেশা ছিল যা সমাজ স্বীকৃত না হলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয় পেয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। প্রধান হত্যাকারী নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী অন্য যুবকদের পেশা সন্ত্রাস এবং মাদক ব্যবসা ছিল বলে জানা গেছে। তারা অপরিচিত কেউ নয়, একটি ভয়ঙ্কর অপরাধী চক্রের সদস্য, এ কথা স্থানীয় সবার জানা ছিল। দাগি আসামিও ছিল তাদের অনেকে। বিশেষ করে নয়ন বন্ড, যার জন্য স্থানীয়ভাবে তার দাপট ছিল সীমাহীন।

দাগি আসামিদের দাপট তখন সীমাহীন হয় যখন তারা জানে যে কৃত অপরাধের জন্য তাদের কোনো শাস্তি হবে না। ধরা পড়লেও তারা স্বাচ্ছন্দে বেরিয়ে আসবে হাজত বা জেল থেকে এবং নির্বিবাদে আবার শুরু করতে পারবে অপরাধমূলক কর্মকান্ড। যেহেতু আইনের এবং বিচারের হাত কখনোই তাদের নিবৃত করতে পারেনি, শাস্তি দেয়া দূরের কথা, সেজন্য তারা প্রতিটি অপরাধকান্ডের পরই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পেরেছে। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারার জন্য নয়ন বন্ড দল প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে বাংলাদেশের জঘন্য এবং নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত করতে পেরেছে।

জানা গেছে অপরাধীচক্রের গডফাদার স্থানীয় একটি স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের সাবেক সংসদ সদস্যের পুত্র। আর অন্যসব ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে এখানেও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অঙ্গুলি হেলনে পুলিশ প্রশাসনও খড়গ হস্ত হয়নি অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে। সে একাধিকভাবে গ্রেপ্তার হয়েছে খবরে জানতে পারি। প্রতিবারই বেরিয়ে এসেছে নিরপরাধী হিসেবে। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ পাওয়া গেছে মাঝেমধ্যে। মাঝে ব্যবসার পাইকার হোলসেল ডিলার হিসেবে তার পরিচয় গোপন ছিল না পুলিশের কাছে। অন্যদিকে সে ছিল খুচরা মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশের একজন নির্ভরশীল সোর্স। তার কাছ থেকে গোপন তথ্য পেয়ে পুলিশ মাদকের খুচরা ব্যবসায়ীদের ধরপাকড় করত এবং একটি বাংলা দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করত। পত্রিকাটি এই খবর ছেপেছে প্রথম পৃষ্ঠায় নয়নের পুলিশ বন্ডিং নাম দিয়ে। তারপর অপরাধচক্রের বেপরোয়া দাপটের কারণে খুঁজতে অসুবিধা হয়নি, খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না।

রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে নয়ন বন্ড ও তার দল এমনই ভয়ঙ্কর এবং বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে তাদের পক্ষে সামান্য কারণে রিফাত শরীফ নামক যুবককে নৃশংসভাবে হত্যা করা ছিল প্রায় ছেলেখেলা। সহিংসতার চরমে গিয়ে প্রকাশ্যে রিফাতকে হত্যা করে তারা সবাইকে মেসেজ দিতে চেয়েছে যে তারা আনটাচেবল। এজন্যই তারা জিঘাংসু হয়ে রাতের অন্ধকারে হত্যা করেনি রিফাত শরীফকে। তারা নিশ্চিতই ছিল যে প্রকাশ্যে পৈশাচিক হত্যাকান্ডের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হবে না। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা অপরাধের পরিকল্পনা করে যাচ্ছিল, সেখানেই রিফাত হত্যাকান্ডের সচিত্র খবর অচিরেই ভাইরাল হয়ে যাবে এবং দেশের তো বটেই, বাইরের মানুষদেরও স্তম্ভিত করে তুলবে। হয়তো তাদের এটা অজানা ছিল যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী হত্যাকান্ডের খবর শুনে এতটাই কঠোর হয়ে যাবেন এবং অবিলম্বে গ্রেপ্তারের আদেশ দেবেন। তাদের অপরাধের সাম্রাজ্য শুধু বরগুনাতেই সীমাবদ্ধ থাকায় এর খবর দেশের অন্যত্র, বিশেষ করে রাজধানীতে ক্ষমতার করিডরে পৌঁছাবে- এ ছিল তাদের কল্পনার বাইরে।

রিফাত শরীফের হত্যাকান্ডকে অনেকে আরেক হতভাগ্য ভিকটিম বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ড জঘন্য হলেও তা ছিল আকস্মিক, মুহূর্তের উত্তেজনার প্রকাশ। রিফাত শরীফকে হত্যা করা হয়েছে ঠান্ডা মাথায়, সুপরিকল্পিতভাবে, যার জন্য এটাকে বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ডের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। বিশ্বজিতের ক্ষেত্রে হত্যার সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীর শাস্তি হয়নি কিংবা শাস্তি পেলেও হয়তো যথেষ্ট নয় বলে কেউ কেউ মনে করেন। তাই রিফাত শরীফের হত্যাকারীরাও একইভাবে বিচারের হাত থেকে উদ্ধার পেয়ে যাবে, সেই আশঙ্কাও অমূলক বলেই মনে হয়। কেননা, এখানে হত্যাকারীরা কোনো সংগঠনের কর্মী নয়, নেহাতই স্থানীয় একটি অপরাধচক্র, যারা আশ্রয় ও প্রশ্রয় পেয়েছে স্থানীয় নেতাদের কারও কারও কাছ থেকে এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে। যেহেতু জাতীয়ভাবে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ জারি করা হয়েছে, সেজন্য রিফাত শরীফের হত্যাকারীরা পার পেয়ে যাবে- এই আশঙ্কা অমূলক।

কেউ কেউ রিফাত শরীফের হত্যাকান্ডের মোটিফ খোঁজার জন্য তার স্ত্রী মিন্নির দিকে আঙুল তুলে পরোক্ষে তার দোষী হওয়ার বিষয়টি উলেস্নখ করেছেন। প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের সঙ্গে অতীতে মিন্নির যে সম্পর্কই থাকুক না কেন, তার ভিত্তিতে তাকে কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। সুতরাং রিফাত শরীফের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যারা, তারা প্রকারান্তরে অপরাধীদের অপরাধ লাঘব করার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন বলে মনে হয়। এটা কেউ কেউ হয়তো করেছেন ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে, আর কেউ কেউ করছেন নিজের অজান্তে। পুলিশ তাদের তদন্তে হত্যাকারীদের মোটিফ খুঁজে বের করুক, যা তাদের কর্তব্য। কিন্তু মোটিফের সুযোগে অপরাধ যেন লাঘব করে দেয়া না হয়, তার জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

এই নৃশংস হত্যাকান্ডের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি, সেই সঙ্গে অতীতে যারা হত্যাকারীদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের জবাবদিহি করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কেননা, তাদের জন্য নয়ন বন্ড ও তার দল নৃশংস হয়ে উঠেছে। কেবল অপরাধীদের বিচার নয়, গডফাদার নিযুক্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকার জন্য দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেয়া হোক। এই পর্যন্ত এ ধরনের অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হোতাদের দায়িত্বের কথা উলেস্নখ করা হয়নি এবং কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। রিফাত শরীফের নৃশংস হত্যার পর দেশব্যাপী যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, সেজন্য বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেয়া হবে বলে আশা করা যায়।

রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এর ফলে তার কাছ থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যেত, সেটা পাওয়ার আর সম্ভাবনা থাকল না। নয়ন বন্ডের মৃতু্য তার অপরাধজীবনের ওপর যবনিকাপাত করলেও যে অপরাধের সংস্কৃতি দেশব্যাপী শান্তি-শৃঙ্খলা এবং জনগণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে তুলেছে, তার অবসান হবে- এমন আশা করা যায় না। এই অপসংস্কৃতি গড়ে তুলতে যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে মদদ দিয়ে এসেছে এবং প্রশ্রয় দান করেছে, তাদের প্রতিহত করতে না পারলে দেখা যাবে যে আরও নয়ন বন্ড বেপরোয়াভাবে তাদের অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে। একমাত্র উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই পারে এই বিষবৃক্ষের বিনাশ করতে।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
আইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে