logo
রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৪ কার্তিক ১৪২৬

  রবিউল হোসেন   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

দেশের ব্যাংকিং খাত ও ব্যবস্থাপনা

সমাজের কিছু মানুষ হয়তো অর্থনীতি বিষয়ের ওপর একটু বেশি ভাবে। আমার আগ্রহ অবশ্য ব্যাংকিংয়ে। তাই এ অঙ্গনের ওপর আমার নিবন্ধও মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া নিকট অতীতে প্রকাশিত আমার দুটি বই 'জীবন ও মানুষ : ব্যাংক ও ব্যাংকিং' এবং 'একজন ব্যাংকারের দুর্লভ অভিজ্ঞতা' সমঝদার পাঠকসমাজের ভালো সমাদর কুড়িয়েছে। তাই মনে হলো, ব্যাংকিংয়ের বর্তমান সংকটের ওপর নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরি, যদি কোনো কাজে লাগে।

ইদানীং বিবিধ ব্যাংকিং সংকটের কথা প্রায়ই মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। যেমন দেশের একসময়ের ঊর্ধ্বমুখী রিজার্ভ পজিশন স্মরণকালের উচ্চতম রেকর্ড সৃষ্টি করলেও এখন তা অধোমুখী। এ ছাড়া অন্যান্য দুর্বলতার মধ্যে ব্যাংকের তারল্যবিভ্রাট, বিনিয়োগ বিপর্যয়, সি-এল স্ফীতি, ফান্ড পাচার, আয় হ্রাস তথা মুনাফা সংকোচন ইত্যাদি উলেস্নখযোগ্য। তদুপরি নতুন ব্যাংকের সংখ্যার সঙ্গে চলমান দুর্বল ব্যাংকের শাখার সংখ্যা বেড়ে সব মিলে অনৈতিক ব্যাংকিং প্রতিযোগিতার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ধ্বংসাত্মক বৃহৎ ঋণ প্রবৃদ্ধির বেপরোয়া চাপে ক্ষুদ্র ঋণ ঘরে ঢুকতে পারছে না। ঋণের পুনঃতফসিল এবং উদ্দীপক মওকুফ নীতিমালা শ্রেণিকৃত ঋণ বৃদ্ধির অনুপ্রেরণা হয়ে এর আদায়কে নিরুৎসাহিত করছে। ব্যাংকের এমডি ঘন ঘন বদল হচ্ছে। আবার অফিসারদের অবাধ আন্তঃব্যাংক মাইগ্রেশন তাদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ নষ্ট করছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকেও যেন কোনোমতে টিকে থাকার গতানুগতিক খেলায় গা ভাসিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা পর্যাপ্ত নয় বলে কখনো কখনো অভিযোগ উঠলেও যতটুকু আছে তা দিয়ে তারা (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) সমঝোতা ছাড়া তেমন কিছু করে দেখাতে পারছে না। এমন সব দুর্বলতার ওপর যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতিরোধী নজর বাড়লে ব্যাংকের নিম্নমুখিতা কমতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে এ লেখার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ব্যাংকিংয়ের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যাংকপাড়ার দিকে পা বাড়াতে হলো।

আসলে সব এমডিই অনেক ব্যস্ত। মিটিং, সিটিং আর ইটিংয়ের চাপে তারা পর্যুদস্ত। তাই ভিজিটরের 'কিউ'-এ অপেক্ষা করতে হলো। দেখা গেল বোর্ডের ডিরেক্টরসহ কিছু দর্শনার্থী শৃঙ্খলা ভেঙে এমডির রুমে ঢুকে পড়ছেন। মনে হলো, টাকা না নিয়ে কেউ যেন ফিরতে চাইছেন না। কিন্তু সবাই জানেন, বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের নিজস্ব ফান্ড পর্যাপ্ত থাকে না। তাই অনুঘটক হয়ে ব্যাংক জনগণের কষ্টার্জিত টাকা আমানত হিসেবে হেফাজতে রেখে তার নির্ধারিত অংশ বিনিয়োগ করে এর আয়ে প্রতিষ্ঠানের খরচ মেটায়, মালিককে লভ্যাংশ দেয় এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার মাধ্যমে টিকে থাকে। তাই হিসাবের মাপে এবং নিয়মের চাপে নয়-ছয় করার সুযোগ না থাকলেও ব্যাংকে অন্তর্ঘাত হয় এবং তাতে এর মূলধন ও প্রভিশনে ঘাটতি হয়। ফলে ব্যাংকের ঋণ প্রদানক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়। যাহোক, অবশেষে এমডি সাহেবের দেখা পাওয়া গেল দর্শনার্থীবেষ্টিত অবস্থায়। লক্ষ্য করলাম, তিনি সবার কথা শুনে 'নো' বলার কৌশল প্রয়োগ করে অনেককে বিদায় করছেন। ফলে কেউ অতৃপ্তি নিয়ে ফিরছেন বলে মনে হলো না। এতসব করে কর্তৃপক্ষ ফাইল দেখার সুযোগ কম পায় বলে তাকে হয়তো নিচের সহকর্মীদের সুপারিশ দেখে অনেক সময় ফাইল ছেড়ে দিতে হয় কিছুটা অন্ধবিশ্বাসে। কিন্তু ডিউ ডেলিজেন্সের নজর এড়িয়ে এমন বিশ্বাস প্রতারিত হলে ব্যাংক মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।

কথার ফাঁকে এমডি সাহেব বললেন, 'দেশি ব্যাংকিংয়ের বর্তমান দুরবস্থার জন্য প্রধানত আমরা (ব্যাংকাররা) দায়ী। যদিও আমাদের মস্তিষ্ক বোর্ডের চাপ, বহিরাগত কণ্ঠ-সন্ত্রাস, বেনামি অভিযোগ এবং নিজেদের অর্থাভাবের মুখে সহজলভ্য ঘুষ গ্রহণ না করার নৈতিক চাপ ইত্যদিতে বিধ্বস্ত থাকে।' তবে এমডি সাহেবের আক্ষেপের সুরে এবং হতাশার স্বরে মর্মপীড়া অনুভব করলাম। মনে হলো, তিনি অসহায় তাই চাপা উদ্বিগ্ন। কিছু করতে না পারলেও ব্যাংকিংয়ের দুরবস্থা যেন তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তবে নিজের ফল্ট নিজে ধরে 'এভরিম্যান ইজ বস্নাইন্ড টু হিজ ওন ফল্ট'-এ মহাকথনটি তিনি সেই মুহূর্তের জন্য গুরুত্বহীন করে দিলেন। তথাপি নিজ প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানে অসমর্থতার অনুশোচনায় তাকে কিছুটা সংকুচিত মনে হলো। এমন সংকোচন প্রশমনে ভুক্তভোগীদের জিদ বাড়লে ব্যাংকিং সেক্টরের মোড় অচিরে ঘুরে ভালোর পথ নিতে পারে। অতঃপর এমডি সাহেব বললেন, ব্যাংকের ভিত মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর রচিত ১. রুলস (নিয়ম/বিধি), ২. লজ (আইন), ৩. প্রসিডিউর (পদ্ধতি/প্রক্রিয়া) এবং ৪. অর্ডিনারি পরুডেন্স বা ব্যাংকারস উইজডম। এ ভিতের গন্ডির মধ্যে থেকে সতর্কতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারলে ব্যাংকের কর্মী নিরাপদ থেকে তার প্রতিষ্ঠানকে স্থিতিশীল করতে পারেন।

অনেক মানুষ গর্বভরে বলে, আমরা দেশের জন্য, জনগণের জন্য কাজ করি। আসলে বিয়য়টি ঠিক তেমন নয়। কারণ কথা ও কাজে মিল রেখে সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য ষোলোআনা পালন করলেই সেই কাজ নিজের তথা প্রতিষ্ঠানের জন্য করা হয়। এমন প্রথায় সব কাজ অবশেষে দেশের কাজ হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। কারণ জনগণকে নিয়েই দেশ এবং জনগণের জন্যই দেশ। এটাই প্রকৃত গণতন্ত্র, যার জনপ্রিয় সংজ্ঞা হিসেবে আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের অমর উক্তি বোধ করি সবার জানা আছে। যেমন 'ডেমোক্রেসি ইজ অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল।' অতএব, কোনো ভালো কাজ নিজের জন্য করলে পরোক্ষভাবে তা অন্যের জন্যও করা হয় এবং সেই কাজের বিনিময়ে সৎ রুটির জোগাড় হয়ে যায়। ফলে এমন সৎ কর্মীর বংশধর সৎ মানুষ তথা সঠিক নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে পারে। পক্ষান্তরে অসৎ মানুষের সমাপ্তি খারাপ ছাড়া কদাচিৎ ভালো হয়।

এরপর একটু ঘুরিয়ে সেই ব্যাংকার দৃঢ়প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, 'ব্যাংকের চলমান সমস্যা এর ব্যবস্থাপনায়।' আসলে বিশ্বব্যবস্থাপনার সবকিছু কোনো একজন মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এমন সবজান্তার দাবি কেবল অসীম ক্ষমতার অধিকারী মহান আলস্নাহতালাই করতে পারেন। কিন্তু কখনো কখনো অনেক অবুঝ মানুষ নির্বোধ অহংকারে বেসামাল হয়ে নিজেকে মহাজ্ঞানী-গুণী, পন্ডিত ভেবে বড়াই করে। অথচ বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন তার সারাজীবনের গবেষণা দিয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সূত্র আবিষ্কার করার পর জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি অকপটে বলেছিলেন, 'আমি এখনো জ্ঞানসমুদ্রের বেলাভূমিতে বসে বালু নিয়ে নাড়াচাড়া করছি।' কতটা মহান হলে এমন বড় মাপের কথা বলা যায়! অথচ আমরা নির্বিকারে মুনি-ঋষিদের মহামূল্যবান 'বাণী চিরন্তন' অবহেলায় অবজ্ঞা করে ট্রায়াল অ্যান্ড এররের মধ্যে কাজ করে থাকি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পথে চলার চেষ্টা করি কম। ক্ষতিকর হলেও কলোনিয়াল ভাবধারাকে ঝেড়ে ফেলে আমরা চলতে পারি না প্রকৃত মানবিক জ্ঞান ও মূল্যবোধের অভাবের কারণে। বস্তত 'ভ্যানিটি, অবস্টিনেসি আর স্স্নোবারির মতো প্রশাসনিক পাপকে আঁকড়ে ধরে অস্থায়ী সম্পদ বাড়ানোর নেশায় মানুষ মনের অজান্তে মেতে ওঠে নিজের বংশধরকে অসৎ বানানোর অশুভ চক্রান্তে পড়ে। এভাবেই দূরদর্শিতার অভাবে মানুষের প্রকৃত আখেরাত বরবাদ হয়।

দেশে সরকারি চাকরিতে হয়তো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দুর্বল এবং অনিরাপদ থাকে। তাই অধস্তনগোষ্ঠী ভুয়া নিরাপত্তার নির্বোধ অহংকারে উন্মত্ত হয়ে ঊর্ধ্বতনদের হুমকি-ধমকি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে, মিথ্যার ছলে 'বস্ন্যাকমেইল' করে ফায়দা লোটে। সংগঠন/সমিতি করে, রাজনীতির আবরণে 'বোর্ড অব ডাইরেক্টস'-এর নৈকট্যে গিয়ে নিজেদের দাপট বাড়িয়ে তারা রাজার হালে চলে আত্মতুষ্টি পায়। তখন ঊর্ধ্বতনরা বাঁচার তাগিদে দিশাহারা হয়ে জ্যাক-ব্যাক 'টোকাতে' মরিয়া হয়ে ওঠে। আবার অসহায় গরিব মানুষ অধিকাংশ সময় নিরুপায় হয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে হলেও মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে চাকরি পায় বলে সেই টাকা ওঠাতে চাকরি পাওয়ার পরদিন থেকেই তারা অতি তৎপর হয়ে ওঠে। এতে ব্যাংকের অনেক ক্ষতি হয়।

ব্যাংকের কর্মী ও মালিকপক্ষের 'টার্গেট' বা 'গোল' অভিন্নভাবে নিঃস্বার্থ, নিরপেক্ষ এবং গঠনমূলক হলে প্রশাসন নির্বিবাদে চলতে পারে। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তথা মালিকপক্ষের স্বার্থান্বেষী মনোভাব প্রতিষ্ঠানের অনেক ক্ষতি করতে পারে। তবে সর্বজনীন কল্যাণে প্রশাসন চালাতে দুর্নীতির মূল তিনটি উৎস অর্থ, নেশা, ভয় থেকে দূরে থাকতে হয়। সাধারণত মানুষ দুর্নীতি বলতে আর্থিক দুর্নীতিকেই বেশি করে বোঝে। কিন্তু এমন বুঝ পুরোমাত্রায় সঠিক নয়। কারণ আর্থিক দুর্নীতি ছাড়াও লোভ-হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, ক্ষমতালিপ্সা, ষড়যন্ত্র, কূটবুদ্ধি, ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যাচার, ব্যভিচার, অনৈতিকতা ইত্যাদি দুর্নীতিও কম যায় না। এমন দুর্নীতিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বলে তা গা-সওয়া হয়ে সমাজের ক্ষতি করছে।

এবার অন্য শীর্ষ ব্যাংকারের সঙ্গের অভিজ্ঞতা শেয়ার করব। তিনি বললেন, 'অতি চালাক কাউকে অযথা 'পীর' না ভেবে আমি তাকে এড়িয়ে চলি।' কারণ তারা ভালোর ছলে নিরীহ বসদের জাঁতাকলে পিষে কষ্ট দেয়। আসলে কানপাতলা/বুদ্ধিখাটো বসেরা চালস্নু অধস্তনের বানোয়াট কথা যাচাই ছাড়া মেনে নিয়ে তার ওপর একতরফা সিদ্ধান্ত দিয়ে বিপদে পড়েন। এভাবেই ধূর্ত অধস্তনরা বড় সাহেবদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেয়ে আঠায় আটকে রাখে তাদের। অবসরের আগে অনেকে নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো কিছু করতে চাইলেও পারেন না নিজেদের সরলতার ফাঁসে আটকে থাকার কারণে। তাই অবসরের পর জীবনের অংক মেলাতে না পেরে দুঃসহ বেদনায় কাতর হয়ে তাদের অনেককে অকালে প্রাণ হারাতে হয়। এ ছাড়া মরণোত্তরকালে তাদের কাউকে আবার অতি আপনজনের কাছ থেকে অপদার্থ বিশেষণের গঞ্জনা পেতে হয়। অবশ্য কর্মকালের সতর্কতা এমন সমস্যা দমাতে পারে। 'লাভ অল বাট ট্রাস্ট নান বস্নাইন্ডলি' এ দর্শনে 'গিভ দাই ইয়ার্স বাট ফিউ দাই ভয়েস' প্রথায় নিরপেক্ষ থেকে সিরিয়াসলি কাজ করলে খলের ছল এড়ানো যায়। এ ছাড়া 'ব্যালান্স অ্যান্ড চেক' হিসেবে কর্মীদের পদোন্নতিতে 'মেরিট কাম সিনিয়রিটি' সেরা পদ্ধতি হতে পারে, যদি তাতে বাদ পড়া নিরীহ সিনিয়রদের ক্ষতি পোষাতে দ্বিপক্ষীয় বেনিফিটের ব্যবস্থা রাখা যায়।

বোধ করি, ভালো ব্যাংকাররা সত্য বলার সাহস হারিয়ে 'হিজ মাস্টারস ভয়েস'-এর 'লোগোর' মতো নীরব দর্শক সেজে নিথর হয়ে বসে থাকেন, আর কপট কর্মীরা দাপটের সঙ্গে অবাধে চলেন। এ থেকে মনে হয়, আমাদের বিদ্যা-বুদ্ধি যেন লোপ পেয়েছে। তাই আমরা স্বকীয়তা ভুলে রোবটের মতো 'বস'-এর ইশারায় নাচি। ফলে দাম্ভিক বসেরা মনে করেন, তারাই ঠিক এবং 'ভালো বুঝ' তথা 'সঠিক জ্ঞান' যেন তাদের একচ্ছত্র 'অহস্তান্তরযোগ্য' পৈতৃক সম্পত্তি। অধস্তনদের কেউ যে একটু ভালো জানতে পারে ঊর্ধ্বতনদের দাম্ভিকতা তা মানতে রাজি নয়। এতে 'উয়ারার নোজ হোয়ার দ্য সু পিনসেস'-এর মতো নিরেট সত্য ভূলুণ্ঠিত হয়ে 'সেন্স অব বিলংয়িং'-কে নষ্ট করে দেয়। ফলে 'হারমনি অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং' ঘরছাড়া হয়। আসলে অফিস ও অফিসের কাজকে নিজের ভাবতে না পারলে সে কাজের ওপর কর্মীর মন বসে না। ফলে তা সফলতার মুখ দেখতে পায় না। তাই এখানে বলতেই হয়, নিজের টাকা অন্যকে ধার দিতে মানুষ যতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করে, ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ দিতে ঠিক ততটুকু সতর্ক হলেই ব্যাংকঋণের ক্ষতি কমানো যায়।

আমি বুঝি না, কেন মানুষ নিজের কাজ এবং কাজের প্রতিষ্ঠানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে 'ক্লোজ টু চেস্ট' করে নিতে পারে না। পারাটা অসম্ভব বা অযৌক্তিক নয়। কারণ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমের সময় বাদে অবশিষ্ট সজাগ সময়ের অধিকাংশটাই তো মানুষ কর্মক্ষেত্রে (হোমডোর টু অফিসডোর) থাকে এবং সেখানের আয় দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণসহ সন্তানদের ভবিষ্যৎ মজবুত করার চেষ্টা করে। তাই কর্ম ও কর্মস্থলকে কম গুরুত্ব দেয়ার কোনো যুক্তি ধোপে টেকে না।

সেই ব্যাংক কর্ণধার আরও বললেন, এ দেশের অনেক মানুষ আরেকটি বিষয়ও উল্টো বোঝে। যেমন মনে করে দেশ স্বাধীন, তাই দেশের মানুষ হিসেবে আমরাও স্বাধীন। আরও ভাবে স্বাধীন মানে মুক্ত, লাগামহীন। কিছু মানুষের এমন ভাবনা যৌক্তিক নয়। কারণ দেশের ভূখন্ড স্বাধীন হলেও এর মানুষের চলা-বলা প্রকৃত অর্থে কখনো স্বাধীন নয়। তাই মানুষকে নিজের স্বার্থে বাধ্য হয়েই তার নিজের দেশের, প্রতিষ্ঠানের, সমাজের এবং পরিবারের নিয়ম-শৃঙ্খলার আবর্তে বাঁধা থাকতে হয়। অতএব, বলা যায় মানুষ পরাধীন। এ চরম সত্যটা সহজে বোঝাতে আরও একটু বলতে হয় যে মানুষের মৌলিক অধিকার তিনটি জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অন্বেষণ। এসব অধিকার সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত হলেও স্বাধীনতা মানে উচ্ছৃঙ্খলতা নয় বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অন্যের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া নয়। মানুষ পরচর্চা করে তৃপ্তি পায় বলে আত্মসমালোচনাকে দূরে ঠেলে দেয়। অথচ আত্মসমালোচনার গুরুত্ব মানবজীবনে সর্বাধিক। এমন নির্ভুল সত্যের চাক্ষুষ দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বয়ং আলস্নাহপাক প্রতিটি মানুষের হাতের পাঁচটি আঙুলের মধ্যে চারটির নমুনা অনুশাসন দিয়ে তা অনুশীলন করতে নির্বাক নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন জাতি-ধর্ম-বর্ণ, স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে কোনো মানুষ যখন নিজ হাতের তর্জনী উঠিয়ে অন্যকে খারাপ বলে দেখায়, ঠিক ওই অবস্থায় তার একই হাতের অন্য তিনটি আঙুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার নিজের দিকেই নির্দেশিত হয়ে বলে দেয়, 'অন্যকে খারাপ বলার আগে তুমি কেমন তা একবার ভেবে দেখো।' এমন স্বর্গীয় দর্শনে অনুরক্ত হলে মানুষ আত্মসমালোচনাপ্রবণ হয়ে পৃথিবীকে ভালোর পথে এগিয়ে নিতে পারে।

রবিউল হোসেন

সাবেক এমডি, সোনালী ব্যাংক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে