logo
শনিবার ২৪ আগস্ট, ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬

  খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ   ২৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০  

খেলাপিদের নতুন ঋণ নেয়ার বিধান যেন না থাকে

২০১৫ সালে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের জন্য একটা সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সুযোগটি ছিল নামমাত্র কিছু টাকা জমা দিলেই সেটা পুনঃতফসিল হবে। কিন্তু তাদের কিস্তিতে টাকাটা পরিশোধ করতে হবে। সেখানে দেখা গেছে, ঋণখেলাপিরা সে সুযোগটি নিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু তারা কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করেননি। যারা ২০১৫ সালে করেননি, তারা ২০১৯ সালে সেটি করবেন বলে ভাবার কারণ কী? অর্থাৎ আমাদের বক্তব্য হল, ঋণখেলাপিরা স্বভাবগত ঋণখেলাপি।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া বেশকিছু ঋণ অবলোপন করা হয়েছে, যেটি এ অঙ্কের মধ্যে নেই। সেটিও খেলাপি ঋণ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে একটা বড় অঙ্ক এখন আটকে আছে খেলাপি ঋণ হিসেবে।

স্বভাবতই আমরা আশা করেছিলাম, এবারের বাজেট বক্তৃতায় খেলাপি ঋণ নিয়ে বিস্তারিত কিছু থাকবে; কিন্তু সেটি হয়নি। তারপরও বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এটি সংস্কার করবেন। তবে সংস্কার সম্বন্ধে বলা হয়েছে, তিনি দেউলিয়া আইন চালু করবেন- যেটি এক্সিট দিতে সাহায্য করবে। এখানে আমাদের বক্তব্য হলো, এক্সিট প্রথা আমাদের আগেও ছিল এখনো আছে।

যখন কোনো ঋণগ্রহীতা বিভিন্নভাবে আটকে পড়েন, তখন ব্যাংকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এবং প্রচুর টাকা ছাড় দিয়েও ব্যাংক পার্টির সঙ্গে একটা নিষ্পত্তি করে ফেলে; এতে তার এক্সিট হয়ে যায়। তাতেও যদি ঋণগ্রহীতা সম্মত না হন, তাহলে ঋণগ্রহীতা নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করতে পারেন। বর্তমানে দেউলিয়া আইন রয়েছে।

আমার জানা মতে, শিল্প খাতে দু-একটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে দেউলিয়ার বিষয়টি রয়েছে; কিন্তু ব্যাংকিং খাতের খেলাপিদের মধ্যে কেউ নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন, সেটি আমার জানা নেই। সে ক্ষেত্রে বর্তমান দেউলিয়া আইনকে আরও পরিশীলিত করা যেতেই পারে, আরও আধুনিকায়ন করা যেতে পারে; কিন্তু দেউলিয়া আইন নেই, এটি বলা ঠিক নয়।

অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের আরেকটি সংস্কার প্রস্তাব ছিল দুটি ব্যাংককে মার্জ করা বা মিলিত করা। ভলেন্টারি মার্জ করার বিধান সবসময় ছিল এবং এখনো আছে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রচন্ড দুরবস্থায় দুর্বল ব্যাংকও কোনো ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ হতে রাজি হয় না। উলেস্নখ করা যেতে পারে, এখন যেটি পদ্মা ব্যাংক নামে পরিচিত, সেটি খুবই খারাপ অবস্থায় পড়েও কোনো ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ করেনি। বেসিক ব্যাংকও কোনো ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ হয়নি।

এ বিষয়টিকে যদি ভলেন্টারি না হয়ে চাপিয়ে দেয়া হয়, সেরকম কোনো আইন নেই। যদি সেরকম আইন করাও হয়, তা হবে বাজার অর্থনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত একটি অবস্থা, যা গ্রহণযোগ্য হবে না। কাজেই অর্থমন্ত্রী মার্জার নিয়ে যে সংস্কার প্রস্তাব করেছেন, সেটি খুব একটা বাস্তবসম্মত হবে বলে মনে হয় না। খেলাপি ঋণ নিয়ে অর্থমন্ত্রী এ দুটি সংস্কার প্রস্তাবই রেখেছেন। কিন্তু ব্যাংকের মূল সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ।

ওই খেলাপি ঋণ ঠিক হলে বাকি সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। এ খেলাপি ঋণ সম্পর্কে দুটি সংস্কার প্রস্তাব ছাড়া তিনি তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি, শুধু বলেছেন, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তার এ বক্তব্য খুবই স্বাভাবিক এবং এ বক্তব্যের দ্বারা তেমন কিছু বোঝাও যায় না।

যদি খেলাপি ঋণ নিয়ে ইতঃপূর্বে গৃহীত দু-একটি ব্যবস্থার কথা মনে করে থাকেন, আগে গৃহীত ব্যবস্থা এবং সার্কুলারগুলোই সংস্কারের উদাহরণ। তাহলে তা হবে ব্যাংকের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারণ। এর আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী দুটি সার্কুলার ইস্যু করেছেন। এর একটি হল খেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করা। আসলে খেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করে তিনি এটাকে নমনীয় করেছেন মাত্র। বর্তমানে যে সংজ্ঞাটি আছে সেটা বিশ্বের অন্যান্য জায়গার তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে হলেও মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল।

কিন্তু তিনি প্রায় পনেরো বছর আগের সংজ্ঞায় ফিরে গেছেন, যা এখন আর পৃথিবীর তেমন কোথাও চালু নেই। সুতরাং এর দ্বারা ফলাফল যা হবে সেটা হল খেলাপি ঋণের অঙ্ক আগামী কোয়ার্টারে কিছুটা কমে যাবে। কিন্তু প্রকৃত খেলাপিরা থেকেই যাবে। মানের দিক থেকে বিবেচনা করলে খেলাপি খেলাপিই থাকবেন, যদিও তা প্রদর্শন করা হবে না। এটি ব্যাংকের স্বচ্ছতাকে দারুণভাবে আঘাত করবে।

কারণ যদি আমরা দেখতে পাই, এটা খেলাপি, তাহলে তার পেছনে দৌড়াদৌড়ি হবে এবং সেটি আদায়ের চেষ্টা করা হবে। যখন এটি কার্পেটের নিচে চলে যাবে অর্থাৎ খেলাপি অপ্রদর্শিত থেকে যাবে, তখন তা নিয়ে কেউ মাথাও ঘামাবে না। এতে করে নতুন খেলাপি ঋণ তৈরি হবে এবং খেলাপি ঋণের বিষয়টি এখনকার চেয়ে ভয়ংকর আকার ধারণ করে নতুন সংকট হিসেবে দেখা দেবে।

দ্বিতীয় যে সার্কুলারটি মাননীয় অর্থমন্ত্রী জারি করেছিলেন, সেটি বর্তমানে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের মধ্যে রয়েছে, যে কারণে এটা সম্পর্কে খুব একটা কমেন্ট করব না। তবে তার মধ্যে কী ছিল, সেটা বলা যেতে পারে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর থেকে অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যত খেলাপি, তাদের কঠিন খেলাপি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়- এরা যে কেউই একটি বিশেষ সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।

সুযোগটা হল, মোট খেলাপি ঋণের মাত্র দুই ভাগ টাকা জমা দিয়ে খেলাপি ব্যক্তি রিসিডিউল করতে পারবেন এবং সেটা হবে দশ বছরের জন্য। এ সময় ওই খেলাপি ব্যক্তিটি ইচ্ছা করলে নতুন ঋণও নিতে পারবেন। আমাদের আশঙ্কাটা এখানেই। দশ বছরের মধ্যেও যদি খেলাপি ঋণ শোধ দিতে পারেন, তাতে তেমন কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের প্রবল আপত্তিটা হল নতুন ঋণ দেয়া সম্বন্ধে। কারণ এখানে আশঙ্কাটি হল, খেলাপি ব্যক্তিরা নতুন ঋণ নিয়ে নতুন ঋণ থেকেই পুরনো ঋণ পরিশোধ করবেন।

অর্থাৎ বাংলায় যেটাকে বলে 'কৈয়ের তেলে কৈ ভাজা'র মতো অবস্থা দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নিয়ে আস্তে আস্তে দশ বছর বা তার আগেই হয়তো পুরনো ঋণ শোধ করে দেবে। সময় শেষে আবার নতুন ঋণের সমস্যাটি সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাবে। সুতরাং খেলাপি ঋণ খেলাপিই থেকে যাবে। এর চেয়ে খারাপ কিছু আর হতে পারে না।

এটাকে সবাই প্রায় খেলাপিবান্ধব বিধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুধু খেলাপিবান্ধবই নয়, যারা নিয়মিতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন, এটি তাদের বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়াবে। যারা নিয়মিতভাবে ঋণ পরিশোধ করেন তাদের সংখ্যা অনেক। যেমন- মোট ব্যাংকের ১০ লাখ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে। তার মধ্যে ৯ লাখ কোটি টাকাই নিয়মিত ঋণ।

বাকি ১ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। এ ৯ লাখ কোটি টাকা ঋণগ্রহীতা যারা, তারা যদি বর্তমান ব্যবস্থায় সঠিকভাবে ঋণ পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে ১ লাখ কোটি টাকার জন্য সরকারের এত দরদ থাকবে কেন? অনেকেই মন্তব্য করছেন, শীর্ষ ঋণখেলাপিরা টাকার জোরে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং তারা সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। বিষয়টি যদি তাই হয়, তাহলে এটি ব্যাংকের জন্য যেমন খারাপ, তেমনি সরকারের জন্যও একটা খারাপ ফল বয়ে আনবে।

বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বাড়ে বলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি দেখায়; এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ঋণের হিসাবটি দেখা হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এত বড় দেখা যাবে না। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ শুধু খেলাপিদের জন্যই নয়, সব ঋণগ্রহীতারই করা হয়। আগেই যেটি বলেছি, ৯ লাখ কোটি টাকা যে নিয়মিত ঋণ সেটাও চক্রবৃদ্ধি হারেই।

সুতরাং ৯ লাখ কোটি টাকা ঋণগ্রহীতারা যদি চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ পরিশোধ করতে পারেন, তাহলে খেলাপি যারা তারা কেন পারবেন না। সুতরাং এ প্রশ্নটি থেকেই যায়। কাজেই খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যে যুক্তিতে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে, সে যুক্তি কোনোভাবেই টেকে না। ঠিক আছে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণের সুদের চক্রবৃদ্ধি হারে যে পরিমাণটি বেড়েছে আমরা সেটি বাদও দিতে পারি। সেটা বাদ দিয়েও খেলাপিরা তাদের ঋণ পরিশোধ করুন। কিন্তু চক্রবৃদ্ধির সেই অজুহাতে তাদের প্রশ্রয় দেয়ার কোনো মানে হয় না।

২০১৫ সালে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের জন্য একটা সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সুযোগটি ছিল নামমাত্র কিছু টাকা জমা দিলেই সেটা পুনঃতফসিল হবে। কিন্তু তাদের কিস্তিতে টাকাটা পরিশোধ করতে হবে। সেখানে দেখা গেছে, ঋণখেলাপিরা সে সুযোগটি নিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু তারা কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করেননি। যারা ২০১৫ সালে করেননি, তারা ২০১৯ সালে সেটি করবেন বলে ভাবার কারণ কী? অর্থাৎ আমাদের বক্তব্য হল, ঋণখেলাপিরা স্বভাবগত ঋণখেলাপি।

বেশিরভাগ ঋণগ্রহীতা খেলাপি নন। তারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন। অল্পসংখ্যক শক্তিশালী স্বভাবগত ঋণখেলাপি; এরাই সমস্যার সৃষ্টি করছেন। কাজেই তাদের প্রশ্রয় দেয়াটা কোনোভাবেই উচিত হবে না। সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক এবারও যদি খেলাপিদের সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে খেয়াল রাখতে হবে, সেই সুযোগের মধ্যে যেন নতুন করে ঋণ নেয়ার বিধানটি না থাকে। যদি দেয়া হয় সেটিই হবে সর্বনাশ।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে