logo
  • Wed, 17 Oct, 2018

  আবুল কাসেম ফজলুল হক   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

নিবার্চন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র

ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কেমন? এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত এবং স্বায়ত্তশাসিত। আইনগত দিক দিয়ে সবাির্ধক স্বায়ত্তশাসন এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আছে। গত চার দশক ধরে এগুলোতে স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার হয়েছে, সদ্ব্যবহার হয়নি। স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহারের জন্য কেবল শিক্ষকদের দায়ী করে দশদিক থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ অভিযোগের কিছু কারণ অবশ্যই আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য এই যে, বাইরে থেকে বিপুল সব শক্তি নিজেদের হীনস্বাথের্ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনকে ধ্বংস করে চলেছে।

নিবার্চন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র
আজকের বাংলাদেশ কিংবা ভারতে সৃষ্টিশীল প্রগতিশীল চিন্তার ও কাজের কোনো ধারা নেই। ধারা না থাকলেও চিন্তার ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল প্রগতিশীল ব্যক্তি উদ্যোগ দুই রাষ্ট্রেই আছে। সাধারণভাবে চিন্তা ও কাজের রক্ষণশীল মেজাজ নিয়ে চলছে ভারত। বাংলাদেশ চরম অপব্যবস্থা ও সাবির্ক বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে, ইউরো-মাকির্ন আধিপত্যবাদী শক্তির গ্রাসে চলে গিয়েছে এবং ক্রমাগত আত্মশক্তি হারিয়ে চলছে। আজকের অত্যুন্নত প্রচার মাধ্যম যে ভ‚মিকা পালন করছে, তাতে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ও চিন্তার স্বাধীনতা আগে যেটুকু স্বীকৃত হতো, এখন তাও স্বীকৃত হয় না। পঁুজিবাদী-ভোগবাদী মানসিকতার একচ্ছত্র কতৃর্ত্ব সবর্ত্র। আগে নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারি; এখন চলছে লেখকদের নিজেদেরই ধারা-উপধারার নিয়ন্ত্রণ। প্রচারমাধ্যম এখন মূল নিয়ন্ত্রক। এখনকার নিয়ন্ত্রণ আগের নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও সৃষ্টিবৈরী। সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে না বটে, তবে সরকার প্রগতির সহায়তাও করছে না। বাংলাদেশের যে কোনো গুরুত্বপূণর্ ব্যাপারে চ‚ড়ান্ত নিধার্রক এখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী শক্তিগুলোÑ বাংলাদেশের কোনো শক্তি নয়। বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণি সম্পূণর্রূপে তাদের দ্বারা পরিচালিত এবং তাদের মিত্রশক্তিরূপে ক্রিয়াশীল।

বিশ্ব বাস্তবতা বদলে গেছে। বতর্মান বিশ্বায়নবাদী চিন্তাধারা ও কাযর্ক্রম প্রগতির পরিপন্থী। দুবর্ল দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোতে বিশ্বায়নবাদীরা রাষ্ট্র-বিধ্বংসী ও জাতীয়-সংস্কৃতিবিরোধী কাযর্ক্রম চালাচ্ছে। বিশ্বায়নবাদীরা কায়েম করেছে বিশ্ববিস্তৃত এক জঘন্য রকমের পঁুজিবাদ। গণতন্ত্রকে একান্তভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে ধনিক শ্রেণীতে এবং আবেদনহীন করে দেয়া হয়েছে জনগণের কাছে। সমাজতন্ত্রের প্রতি সৃষ্টি করা হয়েছে বিরূপ মনোভাব। পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে ধমের্কÑ যেখানে যে ধমর্।

বতর্মান বিশ্বব্যবস্থা পরিবতর্ন করে জনগণের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রবতর্ন করতে হবে। সমাজতন্ত্রকে সংশ্লেষিত করে নিতে হবে গণতন্ত্রে। জাতিসংঘকে আন্তজাির্তক ফেডারেল বিশ্ব সরকারে রূপান্তরিত করতে হবে। ফেডারেল বিশ্ব সরকারের আওতায় থাকবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের সরকার। নিজ নিজ সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রত্যেক রাষ্ট্রকে রূপ দিতে হবে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, সমন্বয়ের মধ্যে সমাধান, এই নীতি অবলম্বন করে এগোতে হবে। বৈচিত্র্য ও ঐক্য দুটোতেই প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্ব দিতে হবে। সমন্বয় সমস্বত্ব মিশ্রণের মতো (সবপযধহরপধষ সরীঃঁৎব) কোনো ব্যাপারে নয়; সমন্বয় হলো রাসায়নিক যৌগের (পযবসরপধষ পড়সঢ়ড়ঁহফ) মতো ব্যাপার। আন্তজাির্তকতাবাদের আওতায় জাতীয় সংস্কৃতি ও জাতিরাষ্ট্রকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। আন্তজাির্তকতাবাদ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং বিশ্বমানবতার সবর্মাত্রিক প্রস্ফুটনকে অভীষ্ট করে এগোতে হবে। স্পষ্টত, ইউরো-মাকির্ন আধিপত্যবাদীদের ও তাদের সহযোগীদের চিন্তা থেকে আমাদের চিন্তা ভিন্ন। আমরা যে বিশ্বব্যবস্থা চাই তার রূপ ও প্রকৃতি সম্পূণর্রূপে ভিন্ন।

জনগণের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাধনা ও সংগ্রামের মধ্যে চিন্তার স্বাধীনতার প্রশ্নকেও স্থান দিতে হবে। নিরেট চিন্তার স্বাধীনতার আন্দোলন পরিচালনার প্রয়োজন অল্পই আছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী কমর্সূচি ও কমর্নীতি বিভিন্ন হবে। তবে কিছু বিষয় সব রাষ্ট্রেই অভিন্ন হবে। বাংলাদেশে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য এবং বিশ্বব্যাপী মানবজাতির সাধারণ লক্ষ্য নিণের্য় বিবেকবান চিন্তাশীল প্রগতিঅভিলাষী প্রতিটি মানুষকে আজ সক্রিয় হতে হবে। নিষ্ক্রিয়তা বিপদের কারণ হয়। যারা চিন্তা করে এবং কাজ করে, পৃথিবী তাদেরই।

চিন্তার ও কমের্র এ পথ কুসুমাস্তীণর্ নয়, কণ্টকাকীণর্। নতুন রেনেসঁাস ও নতুন গণজাগরণ সৃষ্টি করা গেলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই টিকবে না। রেনেসঁাস ও গণজাগরণ ছাড়া প্রগতির পথে চলতে গেলে অপশক্তি প্রগতিশীল শক্তির ওপর ঝঁাপিয়ে পড়বে, ঠিক যেমন করে তারা ঝঁাপিয়ে পড়েছে আফগানিস্তান ও ইরাকের ওপর। কিন্তু ইরান আক্রমণ করতে তারা সাহস করছে না।

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং কায়েমি-স্বাথর্বাদী প্রচারমাধ্যম এখন প্রগতির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। চিন্তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি নেই এগুলোতে। অথচ এরা মুক্তবুদ্ধি-মুক্তবুদ্ধি বলে গলা ফাটাচ্ছে।

মুনাফার লোভে পঁুজিপতিরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পঁুজি খাটিয়েছে। বড় পঁুজিপতিরা সেখানে সুদৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে। ছোট পঁুজিপতিরা হুমকির মধ্যে আছে। শিক্ষার ও গবেষণার পরিবেশ সেগুলোতে তৈরি হয়নি। মানবসন্তানের মেধা সেগুলোতে বিড়ম্বিত হয়। মহৎপ্রাণ শিক্ষকের আত্মপ্রকাশ সেগুলোতে অসম্ভব। সেগুলোতে শিক্ষকদের ও ছাত্রদের স্বাভাবিক বিকাশের ন্যূনতম সুযোগ নেই।

ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা কেমন? এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত এবং স্বায়ত্তশাসিত। আইনগত দিক দিয়ে সবাির্ধক স্বায়ত্তশাসন এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আছে। গত চার দশক ধরে এগুলোতে স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার হয়েছে, সদ্ব্যবহার হয়নি। স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহারের জন্য কেবল শিক্ষকদের দায়ী করে দশদিক থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ অভিযোগের কিছু কারণ অবশ্যই আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় সত্য এই যে, বাইরে থেকে বিপুল সব শক্তি নিজেদের হীনস্বাথের্ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনকে ধ্বংস করে চলেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবহার করে আসছে বলির পঁাঠার মতো। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা পালন করেছে যখন যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে তারা এবং তাদের দল। তারপর যখন যারা প্রধান বিরোধী দল হয়েছে তারাও তাদের সাধ্য অনুযায়ী বিরোধী অবস্থানে থেকে পাল্টা অভিযান চালিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রসাতলে নিয়েছে। কথিত সিভিল সোসাইটিগুলো তাদের আপাত ভদ্র চেহারা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক ক্ষতি করেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে মাঝে মধ্যেই কোনো কোনো সংবাদপত্র যেভাবে সংবাদ পরিবেশন করেছে তাও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক বিকাশের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশি-বিদেশি নানা স্বাথাের্ন্বষী মহল তাদের হীনস্বাথর্ হাসিলের জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্রমাগত ব্যবহার করেছে। দৃশ্যমান ঘটনাবলির অন্তরালে অদৃশ্য অনেক গুরুতর ঘটনা আছে। এতসব বিরাট বিরাট শক্তির অপতৎপরতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ শক্তি-ছাত্র শিক্ষকদের শক্তি অসহায় হয়ে পড়াই স্বাভাবিক।

এর চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার নামে যে ধরনের কমর্কাÐে তরুণ শিক্ষকদের বাধ্য করা হচ্ছে, তা একেবারেই মেধাবিধ্বংসী, সৃষ্টিবিরোধী। কঠোর-বিধিবিধান ও নি®প্রাণ প্রথা-পদ্ধতি দিয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ লাভের জন্য, চাকরিতে স্থিতির জন্য এবং পদোন্নতির জন্য যেভাবে গবেষণা করানো হচ্ছে, তাতে গবেষকদের ইচ্ছার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, বিষয় নিবার্চনের স্বাধীনতা, বিচার-বিবেচনার স্বাধীনতা ইত্যাদির সুযোগ অল্পই রাখা হচ্ছে। শিক্ষকদের অবস্থা ভালো না হলে ছাত্রদের অবস্থা ভালো হবে কীভাবে? বাংলাদেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যক্তিত্বের ও সৃষ্টিশক্তির বিকাশের পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাইরে নামকরা সব গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার অবস্থাও একই রকম। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কি বাংলাদেশের স্বাথের্ কাজ করে? আজকের অনেক গবেষণাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ও জনজীবনের স্বাভাবিক বিকাশের সম্পূণর্ পরিপন্থী। অনেক কিছুই চলছে ইউরো-মাকির্ন আধিপত্যবাদী শক্তির মদদে ও তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী। কল্যাণকর গবেষণার জন্য প্রচলিত সব ব্যবস্থার, পদ্ধতির ও প্রক্রিয়ার পরিবতর্ন ঘটাতে হবে।

চিন্তার স্বাধীনতা যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার সেই সৃষ্টিপ্রয়াসী ব্যক্তিদের জন্য বাংলাদেশের আজকের বাস্তবতা নিতান্ত আলোহীন, শীতল, শুষ্ক ও জীবনবৈরী মরুভ‚মির মতো। গবেষণা ও সৃষ্টিশীলতা যাদের স্বভাবের মধ্যে নেই, তারাই সবর্ত্র কতৃর্ত্ব নিয়ে আছেন। প্রকৃত গবেষক নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থেকে কাজ করেন। আত্মবিক্রীত গবেষক কি গবেষক?

কায়েমি স্বাথর্বাদীদের মধ্যে মানবীয় সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে বিশেষ সুফল হবে না। সব বিপযের্য়র পরেও সম্ভাবনা আছে তরুণদের মধ্যে, শিশু-কিশোর-যুবকদের মধ্যে। আর সম্ভাবনা আছে জনগণের মধ্যে, দেশের মাটিতে। মোহমুক্ত, অনাচ্ছন্ন, আত্মনিভর্র মন নিয়ে, দেশের মাটিতে দঁাড়িয়ে, গোটা বিশ্বের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে, শিশু-কিশোর-তরুণদের মধ্যে কাজ আরম্ভ করতে হবে। জনগণের মধ্যে কাজ করতে হবে।

অতীতের গভর্ থেকে বতর্মানকে মুক্ত করে নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে হবে। সুষ্ঠু নিবার্চনের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররূপে-প্রগতিশীল সমৃদ্ধ, সুন্দর, শক্তিশালী রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। এ কাজের মধ্যেই আজ বাংলাদেশে মনুষ্য-জীবনের সাথর্কতা।

লেখক : অধ্যাপক

বাংলা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে