logo
  • Thu, 16 Aug, 2018

  আনোয়ারা আজাদ   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

নারী ও নিবার্চন

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিবার্চনে ট্রাম্পের নারী ভোটারদের রাতের বেলা রাস্তায় যেভাবে নাচানাচি করার ছবি দেখেছি তাতে ভোটের ব্যাপারটা যে শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব পযাের্য়ই থাকে না, পরিষ্কার। আমাদের নিবার্চন নিয়ে বানির্কাট যতই গুরুগম্ভীর প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করুন না কেন আমরা দেখেছি বেচারি হিলারি এত এত ব্যক্তিত্ব আর প্রজ্ঞা মাথায় নিয়েও শেষমেশ হারুপাট্টি! তো জয়গুরু আমেরিকার নিবার্চনের দিকে হঁা করে তাকিয়ে থেকে আমাদের যে শিক্ষা হয়েছে তাতে নিবার্চন নিয়ে বেশি মাথা খঁাটিয়ে তেমন লাভ নেই, একেবারে বোকার হদ্দরা ছাড়া কে না বোঝে!

নারী ও নিবার্চন
খুব জানার আগ্রহ ছিল আমার, নিবার্চন নিয়ে একেবারে রুট লেবেলের নারীদের আগ্রহ বা ভাবনাটা কেমন। যদিও জাতীয় নিবার্চনের দিন টিভিতে বেশ সেজেগুজে মাঠে লাইনে দঁাড়িয়ে থাকার দৃশ্যে খানিকটা বুঝতে পারি তারপরও। কারণ ভোট দেয়ার ব্যাপারটা একরকম আর নিবার্চন নিয়ে আগ্রহের ব্যাপারটা আর এক রকম। মানে রাজনীতি বা দল নিয়ে চিন্তার জগৎটা ওদের কেমন। তো এরকম জানার কোনো বিষয় থাকলে তিন-চারজন হেলপার আমার আছে, যাদের কাছ থেকে বহু তথ্য জোগাড় করি আমি। কখনো ওদের সঙ্গে বের হয়েও যাই। ওদের জীবনযাপন সম্পকের্ প্র্যাকটিকাল ধারণা নিয়ে তারপর লিখতে বসি। তারপরও কত কিছু যে চোখ এড়িয়ে যায়। সব কথা কী বলে? বলে না। পরিস্থিতি বুঝে আন্দাজ করে নিই। কদিন থেকে সিটি নিবার্চন নিয়ে পেপারে পড়ছি, জাতীয় নিবার্চনও চলে আসবে খুব শিগগির, বাংলাদেশের আকাশে-বাতাসে এখন আম-কঁাঠালের গন্ধের মতো নিবার্চনের ম-ম গন্ধ। গন্ধ শুঁকেই অনেকটা আন্দাজ করা যাচ্ছে যদিও ফরমালিনের প্রভাব আছে!

কুসুম বিবিদের (কাল্পনিক নাম) ভোট দিতে যাওয়ার বিষয়টা অনেকটাই উৎসবের মতো। পহেলা বৈশাখের উৎসব, ঈদের উৎসব যেমন অনেকটা তেমনটাই। পহেলা বৈশাখেও এখন কুসুম বিবিরা শাড়ি কিনতে না পারলেও লাল হলুদ চুড়ি কেনে, চুলের ক্লিপ কেনে, যার যার কমের্ক্ষত্র থেকে অন্তত ছুটিটা আদায় করে নেয় (একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা বলছি না)। ঈদ উৎসবে হলে তো কথাই নেই। তেমনি নিবার্চনের উৎসবটা তাদের কতটা প্রভাবিত, কতটা উল্লসিত কিংবা কতটা চিন্তিত করে, জানার সাধ আমার। লেখাপড়া জানা কিংবা উচ্চবিত্ত নারীদের বিষয়টা অনেকটাই অবগত হলেও এই শ্রেণির নারীদের আন্দোলিত হওয়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি অবগত ছিলাম না আমি। হালকা ঠোনা মারা বাতাসের মতো খানিকটা জানা থাকলে তো হবে না বাপু, ঝড়টা বুঝতে হবে। কেন এই শ্রেণির নারীরা দল বেঁধে উৎসব উৎসব আমেজে ভোট কেন্দ্রে যায় রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে। লাইনে দঁাড়িয়ে হেসে হেসে গল্প করে। (আমরা তো মুখ হঁাড়ির মতো করে দঁাড়িয়ে থাকি)! এই নিবার্চন তাদের জীবনকে কতটা বদলে দেবে, কতটা ভালোবাসায় সিক্ত হবে তারা!

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিবার্চনে ট্রাম্পের নারী ভোটারদের রাতের বেলা রাস্তায় যেভাবে নাচানাচি করার ছবি দেখেছি তাতে ভোটের ব্যাপারটা যে শুধু ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব পযাের্য়ই থাকে না, পরিষ্কার। আমাদের নিবার্চন নিয়ে বানির্কাট যতই গুরু গম্ভীর প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করুন না কেন আমরা দেখেছি বেচারি হিলারি এত এত ব্যক্তিত্ব আর প্রজ্ঞা মাথায় নিয়েও শেষমেশ হারুপাট্টি! তো, জয়গুরু আমেরিকার নিবার্চনের দিকে হা করে তাকিয়ে থেকে আমাদের যে শিক্ষা হয়েছে তাতে নিবার্চন নিয়ে বেশি মাথা খঁাটিয়ে তেমন লাভ নেই, একেবারে বোকার হদ্দরা ছাড়া কে না বোঝে! পত্রিকায় পত্রিকায় জরিপ, বিজ্ঞজনদের মুখ গম্ভীর করা পাÐিত্য কোথায় ফুস করে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, দেখে দেখে তো আমাদেরও পাÐিত্য বেড়েছে, নয়কি! (টেবিল চাপড়ে আলোচনা দেখার তেমন সুযোগ অবশ্য হয়নি) তারপরও মন টুকুস টুকুস করতে থাকে, মানুষের মনতো! মনবিষয়ক জটিলতাটা ঈশ্বর কেন যে ঠুসে দিল মগজে, কোনোভাবেই বোধগম্য নয়! না দিলেও পারত, অনেক কিছুই যেমন দেয়নি! গরিব মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার উপায়টা যদি একটু বেশি করে ঠুসে দিত তাহলে ভালো হতো। তা না করে মানুষের ওপরেই ছেড়ে তাকিয়ে আছে!

সবই তার ইচ্ছে। কী আর করা আমাদের। নিষিদ্ধ ফল খেয়ে পাপ করল আদম হাওয়া, এখন সারা জীবন মানবজাতি হেইয়ো হেইয়ো করে সেই জিন বহন করে বেড়াচ্ছি। কে কখন পতিত হবে, কোন ভুল কাজটার জন্য পতিত হবে সেই চিন্তায় দিবারাত্রি ঘুম হারাম! গরিব মানুষই বোধহয় বেশি পাপী, না হলে অন্তত নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ভোটটা অন্তত দিতে পারত। উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত নারীদের হিসেব অন্যরকম। ছাত্রী রাজনীতি, ফ্যামিলি রাজনীতি সবের্শষ স্বামী রাজনীতি দ্বারা তারা প্রভাবিত। সামাজিকীকরণের জটিলতা এড়ানো তাদের পক্ষে বোধ হয় সম্ভব নয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বা অন্যান্য নারী নেতৃত্ব যতই আরপিও মেনে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আন্দোলন করুক না কেন, নিবার্চন কমিশন দলগুলোকে নারীর অংশগ্রহণ তেত্রিশ শতাংশ নিশ্চিত করার শতর্ আরোপ করুক না কেন, কাযর্ত তিন শতাংশও পূরণ করা হয়নি বলে জানা গেছে। সামাজিকভাবে নারীর এগোনোর প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন যতটুকুই হচ্ছে তাও টিকবে বলে মনে হয় না। একটা দেশের অথর্নীতিই বলুন আর গণতন্ত্রই বলুন প্রতিবন্ধকতাগুলো সরাতে না পারলে ভীত দুবর্ল হয়ে পড়বে।

সম্ভবত ২০০৮ সালের জাতীয় নিবার্চনে পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা ছিল বেশি। ২০১৪ সালের নিবার্চনে নারী ভোটারের সংখ্যা কেন কমে গেল সেটাও গবেষণা করার প্রয়োজন হলেও হয়েছে কিনা জানা নেই এই আমার। হয়তো সমন্বয়ের অভাব ছিল কিংবা কোনো পক্ষই আমলে আনেনি বিষয়টা। নিবার্চনে সরাসরি নারীর অংশগ্রহণ, নারী ভোটারের অংশগ্রহণ নয়, কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলোতে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

তো বলছিলাম কুসুম বিবির নিবার্চনী অভিজ্ঞতার কথা, ভাবনার কথা। ভোট এলে গেলে তার কী লাভ! এসব কথা। কেন কুসুম বিবি রেধে বেড়ে খোলা জায়গার ট্যাপের পানিতে গোসল করে পরিপাটি হয়ে ভোটকেন্দ্রে হঁাটি হঁাটি পা পা! কী করবে বেচারি? রাতের বেলা আসে দল দরদি মহাজনরা কুসুমদের ঘরে ঘরে। তারা বোঝায়, কোথায় সিল মারতে হবে, কার নাম দেখে তারপর মারতে হবে ইত্যাদি। দু’একবার চা’টা’ও বানিয়ে খাওয়ায় কুসুমরা, একে তো মহল্লার মহাজন, দুই, হাতে প্যাকেট! প্যাকেটে কী আছে, সবাই জানে। জানে না শুধু কত আছে। ওনারা চলে গেলে তবে না খুলে দেখা যাবে! কখন যাবে, কখন যাবে চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে ওনাদের কথাও ঠিকমতো শোনা হয় না। অনেক সময়ই উল্টাপাল্টা হয়ে যায়। এর নাম শুনতে ওর নাম শোনে। কারণ তার কিছুদিন আগেই অন্য দলের মহাজনরা এসেছিল, তারাও একটি করে প্যাকেট দিয়ে গেছে। প্যাকেটের টাকাও প্রায় শেষের দিকে। তো এরমধ্যে একটা চালাকির কাজ করে কুসুমরা, প্রথম দলের প্যাকেটে কত টাকা ছিল মুখস্থ করে রাখে। যে বেশি দেয় তারটাতেই না সিল মারা উচিত! নইলে বেইমানি হয়ে যায় না? রোজার সময় বস্তা ভরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে গেল। দিয়ে যায়। একেবারে রোজায় যা যা লাগে সব উপকরণ। তারপর ভোটের দিন ভ্যানে করে নিয়ে যায় ভোটকেন্দ্রে। শুধু তোমরা পরিপাটি হয়ে রেডি হয়ে থাইকো, কোনো চিন্তা নেই তোমাগো, আর সিলটা জায়গামতো মাইরো। ভুল করবানা কিন্তু! তো, এসব অগার্নাইজ করার দক্ষতার বিষয়টাতোও কম নয়, টাকা-পয়সা থাকলেই হবে? হবে না। টাকা-পয়সার অভাব নেই কোনো দলেরই, অভাব হয় শুধু জনসংযোগের। যাদের জনসংযোগ যত ভালো, তারা তত সাকসেসফুল। যাদের কমীর্ যত তৎপর তাদের ভোট তত বেশি। এ জায়গাটাতেই আজকাল মা’র খাচ্ছে মানুষ, তৎপর হওয়া! সবের্ক্ষত্রেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তৎপর হতে না পারলে সব জায়গাতেই ফেল! আর নিবার্চনের বিষয়টাতে তো হানড্রেড পারসেন্ট।

তো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কুসুমরাও কমিটমেন্টের ব্যাপারটা খেয়াল রাখে। কিছু না হোক, রোজায় এই যে কিছু ছোলা, সেমাই, চিনি আসে, তার তো মূল্য আছে। আর প্যাকেটের এই বাড়তি টাকা! গেলবার ওই টাকা দিয়ে একটা মোবাইল ফোন কিনেছিল কুসুম। আরও আছে, মিছিল-টিছিলে নিয়ে গেলেও বাড়তি কিছু টাকা আসে। এ সবই নিবার্চনকে কেন্দ্র করেই। তবে সমস্যা ওই ছেলেটাকে নিয়ে। কুসুমের ছেলেটা একটু দুই নাম্বারি করার চেষ্টা করে, মানে নিদির্ষ্ট একটা দলের সাপোটার্র হয়েও অন্য দলের টাকা নিয়ে তাদের ভ্যানে উঠে মাঝ পথে একটা ছুতো করে নেমে সটকে পড়ে কেউ দেখার আগেই। সবাই তো আর সফর আলীর মতো না (কাল্পনিক নাম)। সফর আলী দুই পক্ষ থেকেই টাকা খেয়ে ধরা পড়ার পর এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল। যে এলাকায় গিয়েছিল সেখানেও দুই নাম্বারি করায় ধরা পড়ে ক্রস ফায়ারে জীবন হারাতে হয়। এই দুই নাম্বারিকে নিয়ে দু’দল থেকেই আর রিস্ক নিতে চায়নি। সো, ফায়ার!

কুসুম বিবিরা এই দেশের একটা বিরাট অংশ, যাদের ভোটগুলো খুব সহজে বিকিকিনি হয়, ভোটের ক্ষেত্রে নিজস্ব মতামত বলতে যাদের কোনো অধিকার থাকে না, থাকে শুধু টাকা লেনদেনের আপ-ডাউন দেখার! কুসুমরা ভোট দেয়ার জন্য ভ্যানে করে আসে, কার জন্য আসে, তাকে ভালো করে না জানলেও তার কমর্কাÐ সম্বন্ধে অনেকটা ধারণা নিয়েই আসে। এলাকায় গ্যাস, বিদ্যুতের নিত্য-অভাবের মুখোমুখি হয়েও ভোট মাঠে দীঘর্ লাইনে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দঁাড়িয়ে থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্যাগুলো জিইয়ে রাখলে যে তাদের ভোটগুলো খুব সহজে কেনা যায়, বিষয়টা ওরা ধরতে পারে কিনা আমার জানা হয় না!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

উপরে
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near 'WHERE news_id=5181' at line 3