logo
সোমবার ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৫

  রেজাউল করিম খোকন   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

বিশৃঙ্খলা, দুনীির্ত, অনিয়ম দূর হয়ে ব্যাংকব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হোক শুদ্ধাচার

আমাদের সবার প্রাত্যহিক জীবনযাপনে নৈতিকতা শব্দটি খুবই পরিচিত। ছোটবেলা থেকে আমরা এই শব্দটি শুনে আসছি। গুরুজনের কাছ থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক পযর্ন্ত অসংখ্যবার এই শব্দটি আমাদের নজরে নিয়ে আসা হয়েছে। ইংরেজিতে এর নাম ঊঃযরপং। বিভিন্ন দাশির্নক বিভিন্নভাবে ঊঃযরপং-কে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে ঊঃযরপং-এর পরিপূণর্ ও ঝঢ়বপরভরপ সংজ্ঞা এখনো পাওয়া যায়নি। নৈতিকতার কোনো নিদির্ষ্ট মাপকাঠি বা মানদÐ নেই। নৈতিকতার উৎস হলো বিবেকবোধ। বিবেকবোধ থেকেই নৈতিকতা উৎসারিত হয়। বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হয়েই মানুষ ভালো কাজ করতে, সৎপথে চলতে উৎসাহিত হয়।

বিশৃঙ্খলা, দুনীির্ত, অনিয়ম দূর হয়ে ব্যাংকব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হোক শুদ্ধাচার
ব্যাংকিংব্যবস্থা যে একটি মাত্র বিষয়ের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছিল, সেটি হচ্ছে আস্থা বা বিশ্বাস। অথার্ৎ আদিযুগে, মানুষ নগদ অথর্কড়ি কিংবা সোনাদানা ঘরে জমিয়ে বা লুকিয়ে রাখার চেয়ে গিজার্ বা মন্দিরের সিন্দুকে রাখাকে অধিকতর নিরাপদ মনে করত। কিন্তু আয় বা প্রতিদান ছাড়া এ রকম অলাভজনকভাবে সম্পদ জমিয়ে না রেখে তার বিপরীতে বিশ্বাসের সঙ্গে লাভ বা সুদ আয় শ্রেয়তর বিবেচিত হয়েছিল বলেই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের জন্ম। ব্যাংকিং সেবার ক্রম জটিলতর বিবতর্ন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সংকট ও কেলেঙ্কারি উদঘাটনের পর ব্যাংকিং সেবা ও পেশায় নৈতিকতার প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে উঠে এসেছে। বতর্মান সময়ের প্রেক্ষাপটে আথির্ক খাতে শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নমুখী আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল মৌলিক মানবাধিকার, সামাজিক সাম্য, সুবিচারও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূণর্ একটি কৌশল হিসেবে সরকারের কাছে বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে সরকার একটি অবলম্বন হিসেবে এটি প্রণয়ন করেছে। রাষ্ট্র ও সমাজে কাযর্করভাবে ন্যায় ও সততা প্রতিষ্ঠা এবং সফলতার সঙ্গে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা সরকারের একটি মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব কাজে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং সুবিচার করার বিষয়ে প্রত্যেক ধমের্ই নিদের্শনা রয়েছে। ‘শুদ্ধাচার’ বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকষর্ বোঝায়। ব্যক্তি ও পারিবারিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশৃঙ্খল ও শন্তিপূণর্ জীবন ধারনের জন্য মানুষকে ভালো আচরণ, ভালো রীতিনীতি, ভালো অভ্যাস রপ্ত ও পরিপালন করতে হয়। মানুষের ভালো আচরণ তার জীবনের বিধান ও নৈতিক নীতির অঙ্গ। বতর্মান সরকার শুরু থেকেই ন্যায়পরায়ণ, দুনীির্তমুক্ত ও শুদ্ধাচারী রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানেই শুদ্ধাচার অনুশীলন অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। এটিকে এড়িয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে আথির্ক সেক্টরে শুদ্ধাচার অনুশীলন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আথির্ক সেক্টর একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সেক্টর। এখানে আথির্ক কমর্কাÐ নিয়ে সব বিষয়ে আবতির্ত হয় বিধায় এখানে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, অসাধুতা, অনৈতিকতার চচার্ যে কোনো মূল্যে প্রতিরোধ প্রয়োজন।

‘শুদ্ধাচার’ শব্দের সৃষ্টি শুদ্ধ ও আচার শব্দের সমন্বয়ে। শুদ্ধ বলতে আমরা সহজভাষায় বুঝি সাধু, পবিত্র, খঁাটি, পরিষ্কার, শোধিত, নিভুর্ল, নিদোর্ষ, নিষ্কলুষ ইত্যাদি। একজন মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশের জন্য যখন সমাজ এই শব্দগুলোর ব্যবহার ও প্রয়োগ করে তখনই সেই মানুষ শুদ্ধ মানুষ হিসেবে গণ্য হন। এ জন্য সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর, নৈতিক আদশের্ক চরিত্রে ধারণ ও বাস্তবে রূপায়ণ করতে হবে। সবাইকে শুদ্ধ হওয়ার জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। ব্যক্তি ও পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূণর্ জীবনধারণের জন্য ভালো আচরণ, ভালো রীতিনীতি, ভালো অভ্যাস রপ্ত ও পরিপালন করতে হবে।

রাষ্ট্র ও সমাজ দুনীির্ত দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের রূপকল্প হচ্ছে সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা। আমাদের সবার কাক্সিক্ষত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে হলে রাষ্ট্রের সবর্স্তরে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

এই কঠিন কাজটিকে তৃণমূল পযাের্য় ছড়িয়ে দেয়ার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেনÑ

‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট করাপসন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপসন বন্ধ করা যাবে না।’

১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,

‘সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্ত একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না চরিত্রের পরিবতর্ন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কিনা সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুনীির্ত ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊধ্বের্ থেকে আমাদের সবাইকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’

আমাদের সব উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের আথির্ক খাত। এখানে শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং সবোর্পরি শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের আশা করা যায় না। আথির্ক খাতে শুদ্ধাচারের চচার্ না থাকলে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুনীির্ত বাসা বঁাধে সেখানে। তখন সব সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া চরম হুমকির মধ্যে পড়ে যায়।

আমাদের সবার প্রাত্যহিক জীবনযাপনে নৈতিকতা শব্দটি খুবই পরিচিত। ছোটবেলা থেকে আমরা এই শব্দটি শুনে আসছি। গুরুজনের কাছ থেকে শুরু করে পাঠ্যপুস্তক পযর্ন্ত অসংখ্যবার এই শব্দটি আমাদের নজরে নিয়ে আসা হয়েছে। ইংরেজিতে এর নাম ঊঃযরপং। বিভিন্ন দাশির্নক বিভিন্নভাবে ঊঃযরপং-কে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে ঊঃযরপং-এর পরিপূণর্ ও ঝঢ়বপরভরপ সংজ্ঞা এখনো পাওয়া যায়নি। নৈতিকতার কোনো নিদির্ষ্ট মাপকাঠি বা মানদÐ নেই। নৈতিকতার উৎস হলো বিবেকবোধ। বিবেকবোধ থেকেই নৈতিকতা উৎসারিত হয়। বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হয়েই মানুষ ভালো কাজ করতে, সৎপথে চলতে উৎসাহিত হয়। বিবেকেরও নিদির্ষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। বিবেক হলো, আপনি নিজের জন্য যে ব্যবহার প্রত্যাশা করেন তা অন্যের সঙ্গে করা বা অন্যের জন্য চাওয়া। পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ, পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জিনিসটি পেতে চায়। রং, বণর্, উচ্চতা, চিন্তাশক্তি, গঠন, আকৃতিভেদে মানুষ আলাদা হলেও আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে সব মানুষের চাওয়াই এক। মনের প্রত্যাশার দিক থেকে সবাই সমান। কেউ খারাপ জিনিসটি নিজের জন্য নিতে চায় না। সবাই ভালোটি পেতে চায়। কেউই চায় না তার সঙ্গে কেউ দুবর্্যবহার করুক বা কেউ তার ক্ষতি করুক। নৈতিকতা হলো মানুষের মনের এই নিরন্তর চাওয়া-পাওয়ার নীতি। নৈতিকতার চচার্ আমাদের অন্যের প্রতি যতœশীল, সহমমীর্, দয়ালু ও অন্যের অধিকার বজায় রাখার ও অন্যের ক্ষতি হতে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। নৈতিকতা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করার প্রেরণা জোগায়। নৈতিকতা থেকে উৎসারিত হয় সৎসাহস, দেশপ্রেম সত্যবাদিতা ও দৃঢ় প্রত্যয়। যা একটি শৃঙ্খলাপূণর্, স্থিতিশীল এবং শুদ্ধ সমাজ বিনিমাের্ণর অন্যতম শতর্। নৈতিক নীতি পালনে রাষ্ট্রীয় কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নৈতিকতার চচার্ স্বেচ্ছাধীন। তাই আমরা নৈতিকতাকে নিছক মনের একটি ক্রিয়া বলে মনে করি এবং অপাথির্ব ছাড়া পাথির্ব কোনো লাভ নেই বলে সাধারণভাবে নৈতিকতার চচার্য় উৎসাহিত হয় না বেশিরভাগ মানুষ। কারণ নিমর্ম হলেও একথা সত্যি প্রকৃতিগতভাবে লাভ ছাড়া মানুষ কোনো কাজ করতে চায় না। নৈতিকতার ক্ষেত্রে আবার উল্টো দেখা যায়। নৈতিকতার লঙ্ঘনই অনেক সময় বেশি লাভজনক মনে হতে থাকে। যেমনÑ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ফঁাকি দেয়া, রাষ্ট্রের ও প্রতিষ্ঠানের অথর্ লোপাট করা, অনিয়ম, দুনীির্ত স্বজনপ্রীতি আর অসদাচরণের মাধ্যমে বিত্তবৈভব প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়া অন্যের স্বাথর্ বিবেচনা না করে নিজের স্বাথর্ পূরণের জন্য সবসময় ব্যস্ত থাকা অন্যের ক্ষতিসাধন করা। সমাজে অনাচার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ইত্যাদি। কিন্তু নৈতিকতার পালনে যে আমাদের পাথির্ব অনেক লাভ রয়েছে, তা বুঝতে চেষ্টা করি না। আমরা যদি অনৈতিক ও অসৎ চচার্র জীবনযাপন করি, শুদ্ধাচারকে জীবন থেকে নিবার্সন দিই তাহলে তার প্রভাবে ভবিষ্যৎ জীবন অনিশ্চিত এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারে। অনৈতিক কাজ করে অনাচারের মাধ্যমে পৃথিবীকে অসুন্দর করে রেখে যাই, তাহলে পরবতীর্ প্রজন্মের এর মন্দ প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে বাধ্য। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন কোনোভাবেই সমৃদ্ধি, স্বস্তি সুখ নিশ্চিত করতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য আজকাল সবাই নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছেন। মূলত টেকসই উন্নয়নের জন্য নৈতিকতাকে অবলম্বন করা প্রয়োজন। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে কমর্জীবন সবক্ষেত্রে শুদ্ধাচার চচাের্ক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

গত এক দশকে বাংলাদেশে আথির্ক খাতে সংঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারি অনিয়ম, অথর্ লোপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো সবাইকে হতবাক করেছে যুবক, ডেসটিনি, হলমাকর্, কিংবা বিসমিল্লাহ গ্রæপ প্রভৃতি নাম উচ্চারিত হতেই জনমনে এক ধরনের ঘৃণা অস্বস্তি, অবিভক্তভাব জেগে উঠতে দেখা যায়। ব্যাংক খাতে সংঘটিত এসব অনিয়ম, দুনীির্ত, অথর্ লোপাটের ঘটনাগুলো এক ধরনের ভীতির সঞ্চার করেছে কমর্কতাের্দর মধ্যে। সবাই আজকাল নিজের গা বঁাচাতেই যেন বেশি ব্যস্ত। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বড় বড় ঋণগ্রহীতারা তা ফেরত দিতে চায় না, ব্যাংক কমর্কতার্রা প্রায় ক্ষেত্রে বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গিয়ে পদে পদে হেঁাচট খান, বঁাধার সম্মুখীন হন। এসব কারণে এখন ব্যাংক খাতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিরাজ করছে স্থবিরতা, অনাগ্রহ।

আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভর করে যে ব্যাংকিং ব্যবসার বিস্তৃত ঘটেছে পৃথিবীব্যাপী তা শুদ্ধাচার এবং নৈতিকতার অভাবে অনেকটাই হুমকির মধ্যে পড়ে গেছে। ব্যাংকে প্রতারণা, ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম, দুনীির্ত বাড়ছে। ব্যাংকিংও যে এক ধরনের ব্যবসা, এটা যেমন সত্যি, তেমনি ব্যাংক যে অন্যের আমানত নিয়ে ব্যবসা করে সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক এ কারণে অন্যান্য ব্যবসা-প্রয়াসের চেয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে মানুষ অধিকতর নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করে। ব্যাংকিং কমর্কাÐে তথা ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধতা থাকবে, স্বচ্ছতা থাকবে এটা যে কোনো গ্রাহক মনে মনে প্রত্যাশা করেন। ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে নৈতিকতার কোনো বিরোধ নেই। বরং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধাচার আবশ্যিক ব্যাপার হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যদি ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা অনিয়ম গ্রাস করে তাহলে সেখানে শুদ্ধতা আশা করা যায় না। মূলত নৈতিকতা বিবজির্ত কাজের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকারদের ব্যক্তিগত কমর্কাÐের মধ্যে সীমারেখা নিধার্রণ করা উচিত। প্রথাগত ব্যাংকিংব্যবস্থার মধ্যে কেবল উচ্চবিত্ত মুষ্টিমেয় কিছু গ্রাহকের মধ্যে ঋণসুবিধা সীমিত রাখা, সহায়ক জামানতবিহীন সাধারণ মানুষ এবং দরিদ্রদের জন্য ঋণ গ্রহণের সুযোগ না রাখা, মুনাফা অজের্নর লক্ষ্যে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করে ব্যাংককে বিপদগ্রস্ত করা কিংবা দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো উদ্যোগে ঋণসুবিধা দেয়াÑ এসবকেই ব্যাংকিং খাতের অনৈতিক কমর্কাÐ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আবার ব্যাংক কমর্কতাের্দর ব্যক্তিগত অনৈতিক কমর্ এবং ঊধ্বর্তন কতৃর্পক্ষের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে নিজেরাই অনৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়াÑ এসবের মধ্যে পাথর্ক্য নিণর্য় করা উচিত। ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা নিশ্চিত করার বিষয়টির সুরাহা করা দুঃসাধ্য বলেই হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভনর্র ড. আতিউর রহমান ‘মানবিক ব্যাংকিং’ বলে একটি ধারণা চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। মানবিক ব্যাংকিং বলতে যে কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার অধীনে দান-খয়রাত কিংবা রাজনৈতিক নিদেের্শ আদায় অযোগ্য কৃষিঋণ বিতরণ বোঝায় তা কিন্তু নয়, তার চেয়ে বরং স্বল্প খরচে সাধারণ বঞ্চিত অবহেলিত মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পেঁৗছে দেয়াই যে মানবিক ব্যাংকিং, সেটিই নিশ্চিত করার প্রয়াস এই উদ্যোগ। ব্যাংকিং খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা অনৈতিকতাকে ডেকে আনে। এমনিতে আথির্ক খাতে নিয়োজিত লোকজন সহজাতভাবে অন্যদের চেয়ে কম বা বেশি নীতিপরায়ণ নন। কিন্তু এই খাতের প্রণোদনা কাঠামোটি এমনই যে এটি অনৈতিক আচরণকে কেবল অনুমোদনই করে না, এমনকি মাঝেমধ্যে উৎসাহিতও করে। তবে এটাই স্বতঃসিদ্ধ বা অনিবাযর্ ব্যাপার নয়, চাইলে এটিকে শুদ্ধ করা যায়। নৈতিক আচরণের প্রতি আথির্ক খাতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবতর্ন আনা সম্ভব। তবে এ জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আথির্ক খাত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাÑ এই তিন পক্ষকে স্থির সংকল্পবদ্ধ হয় যে যেকোনো অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অস্বচ্ছতাকে কোনোভাবে প্রশ্রয় দেবে না কেউই।

ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুণীির্ত, নৈতিকতাহীনতা খুব স্বাভাবিকভাবে চলে আসেÑ এরকম কথা বলতে চান অনেকই। ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার বিষয়টিকে পরস্পর বিরোধী বলে যে ধারণা প্রচারিত হচ্ছে, তা দূর করার জন্য ব্যাংকগুলোকে আইনের শাসন বাড়ানোর লক্ষ্যে যে কোনো ধরনের নেতিবাচক কমর্কাÐ পরিচালনার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। কাযর্ক্রমের সব পযাের্য়র স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। স্বল্প মেয়াদে মুনফার লক্ষ্য অজের্নর জন্য যেকোনো ধরনের ঝঁুকি গ্রহণের চেষ্টা পরিহার করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে, ব্যাংক যেমন কোনো খয়রাতি বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়, তেমনি জনগণ তথা সাধারণ আমানতকারীদের আস্থাও বিশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে দেশ, সমাজ ও অথর্নীতিতে অবদান রাখার জন্য নৈতিক ব্যবসা পরিচালনা করাই ব্যাংকের দায়িত্ব। যেখানে শুদ্ধাচারই হবে সব কমর্কাÐের ভিত্তি, যেখানে স্বচ্ছতা থাকবে প্রতিটি স্তরেই। এসব কারণেই অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাংকের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট কঠোর ও নিবিড় হওয়া উচিত।

রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য ও দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, সমতা, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক, অথৈর্নতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে কৌশল হলো সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুনীির্তমুক্ত রাখা এবং দেশের সবর্স্তরে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা। শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকষর্ বোঝায়। এর দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীণর্ মানদÐ, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্যও বোঝানো হয়। ব্যক্তি পযাের্য় এর অথর্ হলো, কতর্ব্যনিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা। ব্যক্তির সমষ্টিতেই প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয় এবং তাদের সম্মিলিত লক্ষ্যই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রতিফলিত হয়। একজন মানুষের নৈতিকতা শিক্ষা শুরু হয় তার পরিবারে এবং শুদ্ধাচার অনুসরণের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূণর্ প্রতিষ্ঠান। তার পরের ধাপে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নৈতিক জীবন গড়ার ক্ষেত্রে এর ভ‚মিকা অপরিসীম। তৃতীয় ধাপে আছে তার কমর্স্থল। শুদ্ধাচার নিভর্র করে প্রতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতার ওপর। ব্যাংক জনগণ, জনগণের অথর্ বা অথের্র সমমূল্য পণ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কমর্কাÐ চালায়, ব্যবসা করে। মানুষ সবসময়েই উচ্চাকাক্সক্ষী এবং অথর্ হলো, একটি স্পশর্কাতর সম্পদ। কাজেই মানসম্মত গ্রাহক সেবা ও বিশ্বাসযোগ্যতা, দুটোই ব্যাংকের জন্য অতীব গুরুত্বপূণর্ বিষয়। এ দুটি বিষয় প্রধানত নিভর্র করে প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিও নৈতিকতার চচার্র ওপর। গ্রাহক সেবার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায় পরায়ণতা, পরিপালন, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা প্রভৃতি মৌলিক আদশর্ ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা বা চচার্ নিশ্চিত করা হলে ব্যাংক তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পেঁৗছতে তেমন কোনো প্রতিক‚লতার মুখোমুখি হবে না। অতএব, ব্যাংকব্যবস্থাপনার শুদ্ধাচার চচার্ ও প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে আন্তরিক এবং নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে।

দুনীির্ত দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বহুবিধ আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু দুনীির্তকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। আশার কথা, দেশে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : ব্যাংকার
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে