logo
সোমবার ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৫

  আবু সাদেক মো. সোহেল   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

স্বস্তি ফিরে আসুক এ দেশের ব্যাংকিং খাতে

দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, আমদানিকারক এবং অন্য পেশার ঋণগ্রহীতারা যারা প্রয়োজনমতো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেশের শিল্প খাত, সেবা খাত এবং কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়িয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি শতকরা ছয়/সাত শতাংশে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যেজন্য তারা সমাদৃত, তারা কি সবাই ব্যাংকের ঋণ নিয়ম মোতাবেক পরিশোধ করছেন? শতভাগ ঋণ সময়মতো পরিশোধিত হবে, এটা কখনই আশা করা যায় না। কিন্তু ঋণখেলাপির হার শতকরা দুই ভাগ অতিক্রম করা আন্তজাির্তকভাবে কাম্য নয়। ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ভিত্তিক বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০,৩০৭.০০ কোটি টাকা।

স্বস্তি ফিরে আসুক এ দেশের ব্যাংকিং খাতে
ব্যাংক দেশের অথর্নীতিকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূণর্ মাধ্যম। গত প্রায় এক দশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণে সরকারের দূঢ়তার কারণে বাংলাদেশের অথর্নীতি অনেক এগিয়েছে। দেশের ছোট্ট গÐিতে সাতান্নটি তফসিলী ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রারণ, শিল্প উন্নয়ন (ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় শিল্পসহ), আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং কৃষি উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর ঋণ কাযর্ক্রম অনেক বেড়েছে। ফলে, দেশের সাবির্ক অথৈর্নতিক কমর্কাÐে গতিশীলতা বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শতকরা ছয় এবং সাত ভাগে উন্নীত হয়েছে যা গৌরব করার মতো বিষয়। ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনমতো এবং সময়মতো ঋণ চাহিদা পূরণ করে সুষ্ঠুভাবে ব্যবসা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। দেশের ছোট, বড় এবং মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাকে প্রকল্প ঋণ এবং চলতি মূলধন ঋণ সরবরাহ করে দেশের শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে কমর্সংস্থানের সৃষ্টি করছে ব্যাংকগুলো।

দেশের রপ্তানিকারকদের চাহিদা মোতাবেক, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণসহ রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য অথের্র জোগান দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্য ঋণপত্র খোলার মাধ্যমে দেশে দ্রæত নিয়ে আনার জন্যও ব্যাংকগুলো দ্রæততম সময়ে কাযর্কর ব্যবস্থা নিচ্ছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনসহ বিভিন্ন রবি ফসল, গ্রীষ্মকালীন ফসল, কৃষি/সেচ যন্ত্রপাতি, প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন এবং মসলাজাতীয় ফসলাদির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সব ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ঋণ দেয়া হচ্ছে যা অথর্নীতিতে নিয়ে এসেছে স্বস্থির সুবাতাস।

দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক, আমদানিকারক এবং অন্য পেশার ঋণগ্রহীতারা যারা প্রয়োজনমতো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেশের শিল্প খাত, সেবা খাত এবং কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়িয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি শতকরা ছয়/সাত শতাংশে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যেজন্য তারা সমাদৃত, তারা কি সবাই ব্যাংকের ঋণ নিয়ম মোতাবেক পরিশোধ করছেন? শতভাগ ঋণ সময়মতো পরিশোধিত হবে, এটা কখনই আশা করা যায় না। কিন্তু ঋণখেলাপির হার শতকরা দুই ভাগ অতিক্রম করা আন্তজাির্তকভাবে কাম্য নয়। ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ভিত্তিক বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০,৩০৭.০০ কোটি টাকা। গড়ে খেলাপি ঋণের শতকরা হার ১০ দশকি ৬৭ শতাংশ। তা ছাড়া ব্যাংকগুলোর অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৪৫,০০০.০০ কোটি টাকা (ব্যাংকগুলো কতৃর্ক বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মোতাবেক শতভাগ প্রভিশন/আয় হিসাব ডেবিট করে লোন লেজারে সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাব শূন্য করা হয়েছে)। একটু পিছন ফিরে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ যদি পযের্বক্ষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে ২০০৮ সালে ওই ঋণ ছিল ২২,৪৮১.০০ কোটি, ২০১১ সালে ২২,৬৪০ কোটি, ২০১৩ সালে ৪০,৮৫৩.০০ কোটি, ২০১৫ সালে ৫১,৩৭১.০০ কোটি, ২০১৬ সালে ৬২,১৭২.০০ কোটি এবং সেপ্টেম্বর, ২০১৭ পযর্ন্ত ৮০,৩০৭.০০ কোটি টাকা। গত নয় বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ গুণ। সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার শতকরা ২৭ ভাগ হওয়ায় ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ভিত্তিক ৭,৫২,৭৩০.০০ কোটি টাকা বিতারণ করা ঋণের বিপরীতে বেসরকারি, বিদেশি ব্যাংক মিলে গড়ে খেলাপি ঋণের হার দঁাড়িয়েছে শতকরা ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ঋণের প্রবাহ বাড়লে, খেলাপি ঋণের পরিমাণও কিছুটা বাড়তে পারে যদি ঋণের সময়মতো আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো চলতি ঋণ মেয়াদোত্তীণর্ (যদি ঋণ পরিশোধের সবের্শষ তারিখের মধ্যে ঋণটি নবায়ন বা সম্পূণর্রূপে পরিশোধিত না হয়) হওয়ার তিন মাসের মধ্যে ‘নিম্নমান’, ছয় মাসের মধ্যে ‘সন্দেহজনক’ এবং নয় মাসের মধ্যে ‘মন্দ’ মানে শ্রেণিকৃত বা ক্ল্যাসিফাইড হয়ে থাকে। আবার, শ্রেণিকরণের কোনো কাট-অব-ডেটে, কোনো ঋণের তিন মাসের সমপরিমাণ কিস্তি অপরিশোধিত থাকলে সেই ঋণটি ‘নিম্নমান’, ছয় মাসের সমপরিমাণ কিস্তি অপরিশোধিত থাকলে ‘সন্দেহজনক’ এবং নয় মাসের সমপরিমাণ কিস্তি অপরিশোধিত থাকলে ‘মন্দ’ ঋণ হিসেবে শ্রেণিকরণ করতে হয় এবং নিদির্ষ্ট ফরম্যাটে তা বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হয়।

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ভিত্তিক ৮০,৩০৭.০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের খেলাপি গ্রাহক কারা তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলে দেখা যাবে সেই সব খেলাপি গ্রাহকদের মধ্যে কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলের কয়েকটি বড় বড় বিজনেস গ্রæপ, এবং অনেক ছোট-বড় ব্যবসায়ী রয়েছেন। তা ছাড়া দেশের সেরা ঋণ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কেউ কেউ ঋণখেলাপি রয়েছেন। অনেক ছোট ছোট রপ্তানিকারকও এ তালিকায় রয়েছেন। তা ছাড়া রয়েছেন অসংখ্য ছোট-বড় ব্যবসায়ী এবং ব্যক্তি পযাের্য়র ঋণখেলাপি। ঋণপত্র খোলার পর দেশীয় বাজারে তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণে বেশ কয়েকজন আমদানিকারক বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি হয়েছেন। এসব ঋণখেলাপিদের মধ্যে উইলফুল ডিফল্টার যেমন রয়েছে আবার বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেও অনেকে ঋণখেলাপি হয়েছেন। সাধারণভাবে, ঋণ সময়মতো পরিশোধিত না হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে ঋণগ্রহীতাদের সময়মতো ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে না ওঠা। তা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনস অন ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ফর ব্যাংকসের নিদের্শনাবলি না মেনে ভালো গ্রাহক নিবার্চনে ব্যথর্ হওয়া। অনেক শিল্পকারখানা (রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ) প্রয়োজনীয় গ্যাস এবং বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে প্রত্যাশিত পযাের্য় উৎপাদন করতে ব্যথর্ হচ্ছে। ফলে, সেসব শিল্প কারখানার অনুক‚লে মঞ্জুরিকৃত/বিতরণকৃত প্রকল্প ঋণ এবং শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য প্রদত্ত ওয়াকির্ং ক্যাপিটাল ঋণ সময়মতো পরিশোধিত হবে না সেটা অস্বাভাবিক নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ অবকাঠামো গত সমস্যার কারণে শিল্পোদ্যোক্তা যদি নিয়ম মোতাবেক প্রকল্প ঋণের ছয় মাসের সমপরিমাণ ঋণের কিস্তি পরিশোধে এবং ওয়াকির্ং ক্যাপিটাল ঋণ নিদির্ষ্ট সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ঋণটি নিয়মিত করতে ব্যথর্ হন তাহলেও কী সে সব ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সাকুর্লার নং-১৪, তারিখ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২ মোতাবেক খেলাপি ঋণে পরিণত হবে না? উপরোক্ত ঋণ, সিএল ফরম্যাট অনুযায়ী ‘ডাউটফুল’ ঋণে পরিণত হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এ জন্য তো শিল্পোদ্যোক্তা দায়ী নন। এসব অবস্থা বিবেচনা করে গ্রাহকদের জন্য ঋণ শ্রেণিকরণের পৃথক নীতিমালা থাকা বাঞ্ছনীয়।

আবার, চট্টগ্রাম বন্দর সমস্যা এবং চট্টগ্রামসহ অন্য কোনো কোনো স্থানে রাস্তার বেহাল অবস্থা রপ্তানিকারকদের বিপাকে ফেলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় রপ্তানি পণ্য সময়মতো শিপমেন্ট না করার কারণে রপ্তানিকারকের নামে ব্যাংকে একটার পর একটা ফোসর্ড লোন সৃষ্টি হচ্ছে যা ডিমান্ড লোনের অন্তভুর্ক্ত হওয়ায়, ঋণ তিন মাসের মধ্যে পরিশোধিত না হলেই ‘নিম্নমান’ হিসেবে শ্রেণিকৃত হচ্ছে। ছয় মাস পরে ‘ডাউটফুল’ ঋণে পরিণত হওয়ার পর, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা মোতাবেক সেই রপ্তানিকারক ঋণখেলাপি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক তাকে আর কোনো ঋণ সুবিধা দিচ্ছে না। এ কারণে একদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে রপ্তানি কাযর্ক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অজর্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শ্রমিকরাও কাজ হারাচ্ছে।

এখানে, একটি গুরুত্বপূণর্ বিষয় অবশ্যই আলোচনা দাবি রাখে সেটি হচ্ছে ঋণগ্রহীতা নিবার্চনে ব্যাংকগুলো কি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। ওই বিষয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ মাচর্, ২০১৬ তারিখের গাইডলাইনস অন ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) ফর ব্যাংকস এবং বিআরপিডি সাকুর্লার নং-১৭, তারিখ : ৭ অক্টোবর, ২০০৩-এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর বাস্তবায়নের জন্য প্রেরিত ‘সিআরএম গাইডলাইনস’ প্রণিধানযোগ্য। ব্যাংকের ঋণ প্রদানের প্রায় শতকরা নব্বই ভাগ তহবিল আসে জনগণের আমানত থেকে। সে কারণে ব্যাংক থেকে বিতরণকৃত সব ঋণ যাতে সময়মতো ফেরত আসে সে জন্য সবাির্ধক গুরুত্বারূপ করা ব্যাংকের জন্য অপরিহাযর্। বাংলাদেশ ব্যাংকের উপরোক্ত গাইডলাইনসে বলা হয়েছে, ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদানকালে সঠিক গ্রাহক নিবার্চন, গ্রাহকের ব্যবসায়িক অবস্থা, সুনাম, ঋণ পরিশোধে গ্রাহকের সামথর্্য এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে ভালো জামানতের ওপর সবোর্চ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব গ্রাহকের ব্যবসার টানর্ওভার ভালো, বাজারে যথেষ্ট সুনাম রয়েছে, ঋণ পরিশোধে খুবই যতœবান, জামানত নিষ্কণ্টক, মূল্যবান এবং সহজে বিক্রয়যোগ্য সেসব গ্রাহক ভিন্ন অন্য কাউকে ঋণ দেয়ার সুযোগ নেই। গ্রাহক নিবার্চনসহ, ঋণমঞ্জুর, সঠিকভাবে ঋণের দলিলাদি/জামানত গ্রহণ গ্রাহককে হয়রানি না করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাযাির্দ সম্পন্ন করে এবং সঠিক সময়ে ঋণ আদায়ের জন্য সব প্রয়োজনীয় কাযাির্দ নিশ্চিত করা ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট, ব্রাঞ্চ ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট কমর্কতাের্দর সবাির্ধক গুরুত্বপূণর্ বিষয়। সততা ও নিষ্ঠার অভাব রয়েছে এবং যথেষ্ট পেশাগত দক্ষতা নেই এমন জনবলের ব্যাংকে স্থান থাকা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।

সম্প্র্রতি ব্যাংক নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকায়। গত ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ তারিখে একটি দৈনিক পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয় কলামে লেখা হয়েছেÑ ‘রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স পাওয়া উদ্যোক্তা পরিচালকরা মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ব্যাংকটিকে পথে বসানোর ব্যবস্থা করেছেন। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে অক্ষম ব্যাংকটি তার কমর্চারীদের বেতন দেয়ার সামথর্্যও হারিয়ে ফেলেছে।’

লেখক, বুদ্ধিজীবীসহ সব বিজ্ঞজনই স্বীকার করবেন যে ব্যাংক এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার আসল ভিত হচ্ছে তার বিশ্বস্ততা। ১১৫৭ সালে ‘ব্যাংক অব ভেনিস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। তখনও বিশ্বাসের ওপর ভর করেই মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখতো। এখনো সেই বিশ্বাসকে সম্বল করেই কারও হাজার টাকা, কারও লাখ টাকা বা কোটি টাকা ব্যাংকে জমা রাখছেন। মানুষের বিশ্বাস ব্যাংকে জমাকৃত সব টাকা, অন্যান্য মূল্যবান জিনিস সুরক্ষিত থাকবে। মানুষের এই আস্থা যাতে অটুট থাকে সেটা এ দেশসহ সব দেশেই নিশ্চিত করে থাকে সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের মূল কাজ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের আমানত হিসাব সৃষ্টি করে জনগণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি সংস্থা হতে আমানত সংগ্রহ করা। ব্যাংক এ জন্য চলতি আমানত হিসাব ছাড়া অন্যান্য আমানত হিসাবের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন হারে সুদ বা মুনাফা প্রদান করে থাকে। আর আমানতকারীদের তাদের আমানতের ওপর সুদ বা মুনাফা প্রদান করার জন্য ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিদের্শনা অনুযায়ী শতকরা ১৩ শতাংশ হারে ‘এসএলআর’ এবং শতকরা ছয় দশমিক পঁাচ শতাংশ হারে ‘সিআরআর’ সংরক্ষণ করে অবশিষ্ট আমানতের অথর্ বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রপ্তানিকারক এবং ঋণ নীতিমালা মোতাবেক সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের ঋণ ও অগ্রীম হিসেবে প্রদান করে সুদ/মুনাফা অজর্ন করে। আদিকাল থেকে, ব্যাংকিং প্রথা অনুযায়ী সব বাণিজ্যিক ব্যাংকই আমানতকারীদের প্রাত্যাহিক চাহিদা মিটানোর জন্য তার মোট আমানতের শতকরা দুই/তিন ভাগের বেশি নগদ (ক্যাশ) অথর্ ব্যাংকে জাম রাখে না। চাহিদার বেশি নগদ অথর্ রাখলে ব্যাংকের ক্ষতি বিবেচনায় এই প্রথা সব দেশেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এই অবস্থায়, কখনো যদি কোনো নিদির্ষ্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে, ‘ব্যাংকটি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে অক্ষম, ব্যাংকটি, তার কমর্চারীদের বেতন দেয়ার সামথর্্যও হারিয়ে ফেলেছে’Ñ এ ধরনের নেতিবাচক খবর গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে আমানতকারীরা আতঙ্কিত হবে। পরের দিন সেই ব্যাংকের অসংখ্য আমানতকারী আতঙ্কিত হয়ে ব্যাংকে জমাকৃত টাকা উঠানোর জন্য সেই ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় হাজির হবে। এই অস্বাভাবিক অবস্থায় ব্যাংক কী সব আমানতকারীর চেক অনার করতে পারবে? কখনই সম্ভব নয়। এটা শুধু সংকটে পড়া ফারমাসর্ ব্যাংক নয়, ‘এ ক্যাটাগরির ক্যামেলস রেটিং’ পাওয়া খুব ভালো ব্যাংকের পক্ষেও কোনো এক নিদির্ষ্ট দিনে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দশগুণ বেশি টাকা উত্তোলনের চাহিদা মিটানো সম্ভব হয় না, এ কারণে সব ব্যাংকে স্বাভাবিক লেনদেনের জন্য ব্যাংকের ভল্টে ‘টিল মানি’ হিসাবে মোট আমানতের শতকরা দুই/তিন ভাগের বেশি টাকা ব্যাংকের লাভ লোকসান বিবেচনায় সংরক্ষণ করা হয় না। আর কোনো এক সময়ে ব্যাংকের ইমেজ সংকট হলে, সেই ব্যাংকে আমানতকারীরা টাকা জমা রাখতে সাহস পান না। এই অবস্থায়, অতি দ্রæততার সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে সংকটে পড়া সেই ব্যাংককে সব ধরনের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। লেখকের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত তথা অথর্নীতির স্বাথের্ সংবাদ মাধ্যম, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী সবাইকেই এগিয়ে আসা উচিত খেলাপি গ্রাহকদের খেলাপি ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন পন্থায় বাধ্য করার জন্য। সংকটে পড়ে ফামার্স ব্যাংক বা সংকটে পড়া অন্য কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায় হয়ে গেলে, ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণের পরিমাণ দ্রæত কমে যাবে। সে কারণে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়ে যাবে। ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ শতকরা পঁাচ ভাগের নিচে নেমে এলে এবং ব্যাংকটি নন-ফান্ডেড ব্যবসা সবার্ত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বৃদ্ধি করে সন্তোষজনক পরিচালন মুনাফা অজর্ন করতে পারলে, ফারমাসর্ ব্যাংক বা এ ধরনের সংকটে পড়া যে কোনো ব্যাংকের ইমেজ সংকট আস্তে আস্তে দূরীভ‚ত হবে। জনগণের আস্থা ফিরে এলে, ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধি পাবে, তারল্য সংকট কেটে যাবে। জীবন ফিরে পাবে সংকটে পড়া ব্যাংক বা ব্যাংকগুলো। স্বস্তি আসবে এ দেশের ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশের অথৈর্নতিক প্রবৃদ্ধির উচ্চ ধারা আরও বেগবান হবে আগামী দিনগুলোতে, বাড়বে বাংলাদেশের মান মযার্দা।

লেখক : সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলাদেশ কমাচর্ ব্যাংক লিমিটেড খÐকালীন শিক্ষক, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে