logo
সোমবার ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৫

  মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

ব্যাংকিং ব্যবস্থা অথর্নীতি নিয়ে ‘নয়ছয়’ বন্ধ হোক

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী (১৯৮২) অথর্নীতিবিদ জজর্ স্টিগলার প্রথম ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখল’-এর (রেগুলেটরি ক্যাপচার) ধারণাটি প্রবতর্ন করেন। সাধারণভাবে এর অথর্ হলো নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলো কতৃর্ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখল। আগেই বলেছি, জনস্বাথর্ সুরক্ষার জন্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো গঠন করা হয়ে থাকে। কিন্তু জনস্বাথের্র পরিবতের্ যখন এসব সংস্থা যাদের নিয়ন্ত্রণ করার করার কথা ছিল, তাদের স্বাথের্ কাজ করে, বলা হয়ে থাকে, তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখলের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা অথর্নীতি নিয়ে ‘নয়ছয়’ বন্ধ হোক
তিনশ বছরের কিছু আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্ভবের পর থেকে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার নিধার্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের লক্ষ্যমাত্রা নিধার্রণ (টাগেির্টং), সরকারের ব্যাংক এবং ব্যাংকগুলোর ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে অথর্নীতির ওঠানামা সামাল দিয়ে আসছে। সম্প্রতি ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সুদের হার ‘নয় ও ছয়’ হবে ঘোষণা দেয়ায় এবং সাম্প্রতিককালে এই একই সংগঠনের আরও কিছু কাযর্কলাপের ফলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভ‚মিকা ও অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। ‘নয়ছয়’ একটি বাংলা বাগ্ধারা, যার অথর্ হলো অপচয়। কাকতালীয় হলেও তাৎপযর্পূণর্ভাবে বিএবির মুখ থেকে আসা এই ‘নয় ও ছয়’-এর ঘোষণাটি আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে।

আগে বাজার অথর্নীতিতে সরকারই নিয়ন্ত্রকের ভ‚মিকা পালন করত। নিয়ন্ত্রণের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা, একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, জনস্বাথর্, বিশেষত ভোক্তা, গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের স্বাথর্ রক্ষা করা। পরে দেখা গেল যে সরকার এ কাজ সুচারুভাবে করতে পারে না। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া, স্বাথের্র সংঘাত এর অন্যতম কারণ। ফলে বিশ্বব্যাপী স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার উদ্ভব ঘটে। যেমন ব্যাংকিং খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য বাংলাদেশ এনাজির্ রেগুলেটরি কমিশন প্রভৃতি। কিন্তু পরে দেখা গেল যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোও কাযর্কর ভ‚মিকা পালন করতে পারছে না বা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হচ্ছে না।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী (১৯৮২) অথর্নীতিবিদ জজর্ স্টিগলার প্রথম ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখল’-এর (রেগুলেটরি ক্যাপচার) ধারণাটি প্রবতর্ন করেন। সাধারণভাবে এর অথর্ হলো নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলো কতৃর্ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখল। আগেই বলেছি, জনস্বাথর্ সুরক্ষার জন্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো গঠন করা হয়ে থাকে। কিন্তু জনস্বাথের্র পরিবতের্ যখন এসব সংস্থা যাদের নিয়ন্ত্রণ করার করার কথা ছিল, তাদের স্বাথের্ কাজ করে, বলা হয়ে থাকে, তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখলের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। যেমন ধরুন, আমাদের দেশে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রয়েছে। এটা গঠন করা হয়েছে মূলত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বাথর্ সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু তা না করে বিএসইসি যদি কেবল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কিছু কোম্পানি বা কোম্পানিগুলোর স্বাথর্ সংরক্ষণ করে, তাহলে বলা হবে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখলের ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা

উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে ব্যাংকমালিকরা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অথর্ মন্ত্রণালয়, এমনকি সংসদকেও প্রভাবিত করে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত আদায় করতে সমথর্ হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইনের এক সংশোধনীর মাধ্যমে তারা বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পষের্দ একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা ২ থেকে ৪ এবং পরিচালনা পষের্দ সদস্যদের মেয়াদ ৬ থেকে ৯ বছর পযর্ন্ত বৃদ্ধি করতে সমথর্ হন। এরপর তারা ক্যাশ রিজাভর্ রেসিও (সিআরআর) ১ এবং রেপো রেট শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেসরকারি ব্যাংকে জমা করা অথের্র সীমা ২৫ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে সমথর্ হন। ২০১৮-১৯ অথর্বছরের বাজেটে তারা ব্যাংক কোম্পানির জন্য করপোরেট আয়করের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস করে নন-পাবলিকলি ও পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির জন্য যথাক্রমে ৪০ ও ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ নিধার্রণ করাতে সমথর্ হন। সবের্শষ তারা ঋণের ওপর ৯ শতাংশ ও জমার ওপর ৬ শতাংশ সুদ নিধার্রণের প্রস্তাব করেছেন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিএবির ঘোষণা অনুসরণ করেছে।

অসুবিধা কোথায়?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতের করপোরেট ব্যবস্থাপনার সংকট। ব্যাংক কোম্পানি আইনের এক সংশোধনীর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পষের্দ একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা ২ থেকে ৪ এবং পরিচালনা পষের্দ সদস্যদের মেয়াদ ৬ থেকে ৯ বছর পযর্ন্ত বৃদ্ধি করার ফলে করপোরেট ব্যবস্থাপনার সংকট আরও ঘনীভ‚ত হবে। সিআরওর ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নিধার্রণ, রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে হ্রাস ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেসরকারি ব্যাংকে জমা করা অথের্র সীমা ২৫ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার ফলে ঝুঁকিপূণর্ ঋণ প্রদান ও খেলাপি ঋণ উৎসাহিত হবে। ২০১৮-১৯ অথর্বছরের বাজেটে ব্যাংক কোম্পানির জন্য আয়করের হার ৪৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস করে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ নিধার্রণের ফলে দুবর্ল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ব্যাংকগুলোর মাজাের্রর এবং এই খাতে অতিপ্রয়োজনীয় সংস্কারের সম্ভাবনা ব্যাহত হবে। আর সুদের হার কী হবে, তা বিএবি নয়, বাজারই নিধার্রণ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মুদ্রানীতির মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিদের্শনা দিতে পারে।

কেন এমন হলো?

দেশের মুদ্রানীতি নিধার্রণ, পরিচালনা ও ব্যাংকিং খাতকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উল্টো বিএবি তার সাম্প্রতিক কাযর্কলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করছে। অথার্ৎ এ ক্ষেত্রে লেখার শুরুতে উল্লিখিত ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখল’ সম্পন্ন হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে তিনটি কারণে। আমাদের দেশে বিভিন্ন নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠিত হলেও এদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, প্রায়ই এসব সংস্থায় অমেরুদÐী ও জি হুজুর-টাইপের প্রধান নিয়োগ প্রদান করা হয়ে থাকে, যারা নিরপেক্ষভাবে সংস্থা পরিচালনার পরিবতের্ ক্ষমতাসীন ও তাদের ঘনিষ্ঠ মহলের হুকুম তামিলে ব্যস্ত থাকেন। সবোর্পরি দেশের আথির্ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন অথর্মন্ত্রী। তার দৃঢ়তা, দূরদশির্তা ও সরকারপ্রধানের বিশ্বাসভাজনতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূণর্। সাম্প্রতিককালে এ ক্ষেত্রে আমরা ঘাটতি লক্ষ্য করছি। ফলে আথির্ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এতে আথির্ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল, তারাই উল্টো নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। এখন তারা মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি সবকিছুই নিধার্রণ করছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দখল ও তাদের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যথর্তার পরিণতি আমরা জানি। ১৯৯৬ ও ২০১১ সালের শেয়ার মাকের্ট বিপযের্য়র প্রধান কারণ ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা দখল বা বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ব্যথর্তা, যার ফলে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সবর্স্বান্ত হন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যথর্তার কারণেই রিজাভর্ চুরি, ব্যাংক দখল, বেসিক ব্যাংক, ফারমাসর্ ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে; ২০১১ সালে তাদের সৃষ্ট অতিরিক্ত তারল্যের কারণে শেয়ার মাকেের্ট ধস এবং নিয়ন্ত্রণে শৈথিল্যের কারণে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অথর্নীতিতে নয়ছয় কেবল ব্যাংকিং খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ব্যয়, রাজস্ব আয় ব্যবস্থাপনাসহ আরও অনেক ক্ষেত্রেই তা দৃশ্যমান এবং এগুলো ইতোমধ্যেই আমাদের অন্য সব খাতের অজর্নকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বিএবির ওপরে উল্লিখিত কাযর্ক্রমগুলো জাতির জন্য অশনিসংকেত বয়ে এনেছে। সুদের হার কম হোক, সিঙ্গেল ডিজিট হোক, বিনিয়োগ বাড়ুক, এটা আমরা সবাই চাই। তবে তা নিধার্রণের বিষয়ে নিদের্শনা প্রদান বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। এটা বিএবির কাজ নয়। তাই ব্যাংকমালিকদের তাদের এখতিয়ারবহিভর্‚ত কাজকমের্র রাশ টেনে ধরতে হবে। ব্যাংকমালিকরা নিশ্চয়ই ব্যাংকিং খাতসংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামশর্ দিতে পারেন, সরকারের কাছে তাদের দাবি জানাতে পারেন। কিন্তু এ খাতের বিষয়ে তারা একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করতে পারেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য তাদের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং সরকারপ্রধানকে তা করতে হবে এখনই।

লেখক : সাবেক সচিব ও অথর্নীতিবিদ
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে