logo
সোমবার ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৫

  ড. আরএম দেবনাথ   ২৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০০  

নীতি দুনীির্ত অথর্নীতি

ব্যাংকগুলোকে বাজার অথর্নীতির নিয়ম মেনে চলতে হবে

এখন বাস্তবে বাজারে দেখা যাচ্ছে তিন রকমের পরিস্থিতি। ৬ শতাংশে আমানত সংগ্রহ এবং ৯ শতাংশে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত কেউ কাযর্কর করেছে, কেউ করেছে আধাআধি। কেউ পুরো সিদ্ধান্তই উপেক্ষা করে চলছে, আবার ৩২টি ব্যাংক বড় ঋণ দিতে পারবে না। এরা ঋণ নবায়ন ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, যারা নিয়ম লঙ্ঘন করে সীমার বাইরে গিয়ে ঋণ দিয়েছে তাদের আগে ঋণের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি মোতাবেক সীমার মধ্যে আনতে হবে।

ব্যাংকগুলোকে বাজার অথর্নীতির  নিয়ম মেনে চলতে হবে
যুগান্তরের বড় খবর : ‘আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের দায় : ৩২ ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ বন্ধ’। এ খবর জুলাই মাসের ৬ তারিখের। এর ঠিক পরের দিনের আরেক খবর আরেক কাগজে। সেখানে বলা হয়েছে, ৬ শতাংশ সুদে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকে আমানত রাখতে আগ্রহী নয়। এ দুই খবরের মমার্থর্ খুবই খারাপ। এখন আমানত (ডিপোজিট) দরকার। অথচ আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ‘প্রতিযোগিতা কমিশনের’ আইন ভঙ্গ করে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোনো ব্যাংক ত্রৈমাসিক আমানতে ৬ শতাংশের বেশি সুদ দেবে না।

এক কদম বাড়িয়ে বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের সংগঠন বলেছে, এ যৌথ সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বেশি সুদে ‘ডিপোজিট’ বা আমানত নিলে সেই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চাকরি থাকবে না। শুধু তাই নয়, মালিকদের সংগঠন প্রতিযোগিতার নীতি লঙ্ঘন করে আরও বলেছে, ‘লেন্ডিং রেইট’ হবে ৯ শতাংশ। এই নিয়মও ভাঙা যাবে না।

এখন বাস্তবে বাজারে দেখা যাচ্ছে তিন রকমের পরিস্থিতি। ৬ শতাংশে আমানত সংগ্রহ এবং ৯ শতাংশে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত কেউ কাযর্কর করেছে, কেউ করেছে আধাআধি। কেউ পুরো সিদ্ধান্তই উপেক্ষা করে চলছে, আবার ৩২টি ব্যাংক বড় ঋণ দিতে পারবে না। এরা ঋণ নবায়ন ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, যারা নিয়ম লঙ্ঘন করে সীমার বাইরে গিয়ে ঋণ দিয়েছে তাদের আগে ঋণের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি মোতাবেক সীমার মধ্যে আনতে হবে। আনার পর ঋণ স¤প্রসারণের অথর্ হচ্ছে, যে ৩২টি ব্যাংক সীমা লঙ্ঘন করেছে তাদের হয় ঋণের পরিমাণ কমাতে হবে নতুবা বেশি বেশি আমানত সংগ্রহ করতে হবে। মুশকিল হচ্ছে, ঋণের পরিমাণ কমানো যাবে না। এটি সম্ভব নয়। বহু সময় লাগবে।

ব্যবসায়ীরা যারা ঋণ নিয়েছেন তারা টাকা বসিয়ে রাখেননি। অতএব, পথ খোলা থাকে একটি, আর সেটি হচ্ছে ‘ডিপোজিট’ সংগ্রহ করা। এখানেও সমস্যা। মানুষ ‘আমানত’ নিয়ে বসে নেই যে চাইলেই তারা ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দেবে। ‘আমানত সংগ্রহ’ একটা প্রক্রিয়া, নিয়মিত প্রক্রিয়া। ক্ষণে তা ধরা, ক্ষণে তাছাড়াÑ এরকম করলে আমানত ধরা দেয় না। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ আজ সুদের হারের হিসাব করে। তারা দেখে সুদ কত? কারণ লাখ লাখ লোক সুদের ওপর জীবনধারণ করে।

আর ব্যবসায়ীরা ব্যাংকে টাকা রাখে কখন, যখন দেখে ব্যবসার চেয়ে ব্যাংকে টাকা রাখলে ‘লাভ’ বেশি। এই দুইখানেই এখন সমস্যা। কারণ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। সরকারের হিসাবেই মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৬ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অথর্বছরের তুলনায় ২০১৭-১৮ অথর্বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে ৬ শতাংশ সুদ- এর অথর্ কী? এর অথর্ বিনা সুদে ব্যাংকে টাকা রাখতে হবে। না, ঘটনা আরও খারাপ। সঞ্চয়ী আমানতে সুদের হার হবে ২-৩-৪ শতাংশ। এর অথর্, এ ক্ষেত্রে ব্যাংক আমানতকারীদের কোনো সুদ দেবে না, বরং টাকা ব্যাংকে মূল্যস্ফীতির বিপরীতে কমবে। মারাত্মক কথা। এই অবস্থায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখবে কেন- এ প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

বস্তুত এই সমস্যার শুরু বেশ কিছুদিন আগে, যার রেশ এখনও চলছে। এ সমস্যার মূলে রয়েছে ‘আগ্রাসী ঋণ বিতরণ’ বা ‘অ্যাগ্রেসিভ লেন্ডিং’। আমানতের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১০-১২ শতাংশ এবং তা বেশ কিছুদিন ধরে। অথচ অপরিণামদশীর্ ব্যাংকাররা বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়িয়েছে ১৭-১৮-১৯ শতাংশ হারে। ঋণপত্র খুলেছে মারাত্মক হারে। ‘ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমাসের্র’ মতে, বিশ্বে যে দেশ ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি ঋণপত্র খুলেছে সেই দেশটির নাম হচ্ছে বাংলাদেশ।

আর রফতানি ঋণপত্র সবচেয়ে বেশি পেয়েছে চীন। এই উদার, মহা উদারভাবে ঋণপত্র খোলা; উদার, অতি উদারভাবে ঋণ দেয়ার ফলে ব্যাংকগুলো পড়ে ‘ফান্ড’ সংকটে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ভঙ্গ করে এই ‘দুষ্কমির্ট’ করে। অবিবেচক কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যার আগামাথা কিছুই বুঝল না। চোখের সামনে ধস নামল। অথচ তাকে কেউ জিজ্ঞেস করল না যে সে ব্যথর্, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মানতে সে মহা ব্যথর্। যেন তার কোনো জবাবদিহিতা নেই।

অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সারাদিনই বাণিজ্যিক ব্যাংকের ফঁাকফোকর খেঁাজে। এ অসম্ভব দায়িত্বে অবহেলা, গাফিলতির ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ঋণের ভারে আজ ব্যাংকিং খাত মারাত্মক সংকটের মধ্যে। ৬০টি ব্যাংকের মধ্যে ৩২টিই কোনো ঋণ দিতে পারবে না। কারণ তারা এতদিন ফাউল ব্যাংকিং করে নিজেরা ডুবেছে, এ খাতটিকে বদনামের মধ্যে ফেলেছে। অথচ দেশে এখন বিনিয়োগের দরকার। ব্যবসায়ীদের ঋণ চাহিদা মেটানো দরকার। তা আজ স্থগিত হয়ে পড়েছে। কারণ শেষ পযর্ন্ত মানুষের ‘গাল’ খেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ঋণ যারা বেশি দিয়েছে তাদের ঋণ সীমার মধ্যে আনতে হবে। এখন এটা সম্ভব কীভাবে?

সম্ভব আমানত বা ডিপোজিট বাড়িয়ে। মাঝখানে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। ৪-৫-৬ শতাংশ সুদও দেয়নি। তারা মনে করেছে, এটা তাদের সুদিন। অতএব, ঝেঁটিয়ে ডিপোজিট বিদায় করেছে। মনের খুশিমতো ঋণ দিয়ে একসময় গিয়ে বিপদে পড়েছে। যখন বিপদে পড়েছে, তখনই আবার সুদ বাড়িয়েছে। বাড়াতে বাড়াতে ৮-১০ শতাংশ করেছে। এখন হঠাৎ করে তাদের ‘কতৃর্ত্বময় অবস্থানের’ অপব্যবহার করে সুদের হার করেছে ৬ শতাংশ। তা-ও ত্রৈমাসিক মেয়াদি আমানতে। কিন্তু বাদ সেধেছেন বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা, যারা ব্যাংকের মালিক নন।

মনে রাখা দরকার, ব্যাংকিং খাতের ৮৫-৯০ শতাংশ আমানত বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে বড় বড় ব্যবসায়ীরাও পড়েন। তাদের সবসময় কিছু না কিছু উদ্বৃত্ত থাকে। তারা ৬ শতাংশে ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী নন বলে একটি দৈনিকে খবর ছাপা হয়েছে। তবে কি মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তরা ৬ শতাংশ হারে ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী? নিশ্চয়ই নয়। তারাও চায় এমন একটা সুদ, যা তাদের মূল্যস্ফীতির হার পুষিয়ে কিছু লাভ দেয়। না, দেখা যাচ্ছে এখন তা হচ্ছে না।

ব্যাংক মালিকরা ‘লেন্ডিং রেইট’ কমাতে গিয়ে আমানতকারীদের মাথায় বাড়ি দিলেন। অথচ ২০১৮-১৯ অথর্বছরের বাজেটে ব্যাংক মালিকরা তাদের কপোের্রট ট্যাক্স কমিয়ে নিয়েছেন। সাধারণ কর দাতাদের প্রতি অথর্মন্ত্রী নিদর্য় আচরণ করলেন। মূল্যস্ফীতির বাজারে তিনি কোনো রেয়াত দিলেন না। রেয়াত অন্য ব্যবসায়ীদেরও দিলেন না। দুই-তিন হাজার কোটি টাকার রেয়াত দিলেন ব্যাংক মালিকদের। তারা এই টাকা ‘লেন্ডিং রেইট’ কমানোর কাজে ব্যবহার করতে পারতেন। সরকারকে বলে ‘স্পেশাল বোডর্’ করে ৬০-৭০ হাজার কোটি খেলাপি ঋণের টাকা উদ্ধার করতে পারতেন এবং এই টাকা দিয়ে ঋণের ওপর সুদের হার কমাতে পারতেন। না, তারা তা করলেন না। তারা হাত দিলেন মানুষের সঞ্চয়ে। দেশে সঞ্চয় স্থবির। একে উৎসাহিত করা দরকার।

আমাদের দেশের মানুষ সঞ্চয় করে ভবিষ্যৎ বিপদ-আপদের জন্য। তাদের বুড়ো বাপ-মাকে দেখতে হয়। বেকার ভাইবোনদের দেখতে হয়, গরিব আত্মীয়স্বজন, এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীকেও দেখতে হয়। এর জন্য সঞ্চয় লাগে। এটাই আমাদের সমাজ। বেকার হলে সরকার দেখে না। আমেরিকা এরকম দেশ নয়। সেখানে পরিবার নেই। মেয়ের সেলুনে হেয়ার ড্রেসিং করে মাকে ডলার দিতে হয়। ওই সমাজ আমাদের নয়। তাদের সঞ্চয়ের দরকার নেই। আমাদের আছে। এই সঞ্চয়ের অভ্যাস ব্যাংকাররা গড়ে তুলেছে এতদিন। এখন কী হল, ব্যাংক মালিকরা সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন কেন? তাদের এই অবস্থান পরিণামে ধস নামাবে।

আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক মালিক, পেশাজীবী ব্যাংকারদের বলব লেন্ডিং রেইট কমানোর বিকল্প ব্যবস্থা বের করতে এবং তা তারা ধীরে ধীরে করতে পারেন। এর জন্য একই হারে, একই তারিখে সব ব্যাংককে একযোগে কাজ করতে হবে- এর কোনো মানে নেই। অধিকন্তু দেশে যেহেতু ‘বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন’ বলে একটা কমিশন আছে, সেহেতু তার কাজ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। এই কমিশন সরকারই করেছে।

সরকারও চায় প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ‘বাজার অথর্নীতি’ হোক। বাজার অথর্নীতি মেধা, প্রতিযোগিতা, দক্ষতা ও শ্রমের ফসল। এর বিরুদ্ধে অবস্থান দেশের অমঙ্গল ডেকে আনবে। অতএব, প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোর উচিত আমানতের বাজার স্থিতিশীল রাখা; দরকার হলে মুনাফা একটু কম করে হলেও, যার কথা কিছুদিন আগে মালিক সংগঠনের একজন সাবেক সভাপতি বলেছেন। যতদূর জানি তিনি এখন একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান।

লেখক : অথর্নীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ৎসফবনহধঃয@ুধযড়ড়.পড়স
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সকল ফিচার

রঙ বেরঙ
উনিশ বিশ
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম
নন্দিনী
অাইন ও বিচার
ক্যাম্পাস
হাট্টি মা টিম টিম
তারার মেলা
সাহিত্য
সুস্বাস্থ্য
কৃষি ও সম্ভাবনা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
close

উপরে