logo
বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬

  আবুল বাশার মিরাজ   ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০  

গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননে 'বাউ এআই ভিশন'

দেশে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননের সমস্যা দূরীকরণে খামারিদের জন্য সাশ্রয়ী 'বাউ এআই ভিশন' যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞানী ডা. আইনুল হক। বর্তমানে কৃত্রিম প্রজনন গবাদিপশুর বংশবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। দেশে বিভিন্ন কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি থাকলেও বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি হলো হিমায়িত সিমেন (বীজ) দিয়ে প্রজনন করানো। দেশে এ পদ্ধতি ছাড়া আজ অবধি তেমন কোনো নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার মাঠ পর্যায়ে ওভাবে শুরু হয়নি। ডা. আইনুল হক জানান, ক্লাসে যখন কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি পড়তাম কিংবা ব্যবহারিক করতাম তখন অনেক জটিল মনে হতো। আমি চেয়েছি, এমন কিছু তৈরি করতে, যার কল্যাণে আমরা সেটি চোখে দেখে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াটি হচ্ছে কিনা তা জানতে।

গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননে 'বাউ এআই ভিশন'
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে নানা প্রযুক্তি থাকলেও ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে তা অনেক সময়ই কাজে আসছে না কৃষক কিংবা খামারিদের। দেশে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজননের সমস্যা দূরীকরণে খামারিদের জন্য সাশ্রয়ী 'বাউ এআই ভিশন' যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন ডা. আইনুল হক। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের ছাত্র ডা. আইনুল হক। গবেষণার কাজে একদিন গিয়েছিলেন গাজীপুর জেলার কোনাবাড়ী নামের একটি গ্রামে। একজন গরুর মালিক তার কাছে এলো। সে জানায়, আমার গরুর ৮ বার পাল দিলাম, বাচ্চা তো হয় না বাবা! আগ্রহ ভরে শুনলেন বিস্তারিত ঘটনা। কথা শুনে তিনি বুঝতে পারলেন, কৃত্রিম প্রজনন কর্মীর ভুলের কারণেই এমনটি হয়েছে। আবার এটি কেবল ওই কর্মীরও ভুল নয়, তাও জানান তিনি। কারণ দেশে কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা জানার জন্য মাঠ পর্যায়ে এআই (কৃত্রিম প্রজননে যুক্ত) কর্মীদের কাছে তেমন কোনো উন্নত যন্ত্র নেই। তবে দেশের বড় বড় খামারে দুয়েকটি যন্ত্র ব্যক্তিগতভাবে থাকলেও সেগুলো উচ্চদামে বাহির থেকে কিনে আনা। বাকৃবি ক্যাম্পাসে এসে ভাবতে লাগলেন আইনুল। কি করে এসব খামারিদের জন্য দেশীয় প্রযুক্তিতে একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করা যায়। লেগে গেলেন কাজে। এমন কিছু করতে যাচ্ছেন তাও জানালেন তার সুপারভাইজারকে। পেয়ে গেলেন তারও সম্মতি।

আইনুল বলেন, বর্তমানে কৃত্রিম প্রজনন গবাদি পশুর বংশবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান মাধ্যম। দেশে বিভিন্ন কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি থাকলেও বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি হলো হিমায়িত সিমেন (বীজ) দিয়ে প্রজনন করানো। দেশে এ পদ্ধতি ছাড়া আজ অবধি তেমন কোনো নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার মাঠ পর্যায়ে ওভাবে শুরু হয়নি। তিনি জানান, ক্লাসে যখন কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি পড়তাম কিংবা ব্যবহারিক করতাম তখন অনেক জটিল মনে হতো। বিশেষ করে জরায়ুর মুখ নির্ণয় করা ও গান প্রবেশ করানো। কারণ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি করতে হয় মলাশয়ে হাত দিয়ে। কেবল হাতের অনুভবেই কাজটি বুঝতে হত। চোখে দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। আমি চেয়েছি, এমন কিছু তৈরি করতে, যার কল্যাণে আমরা সেটি চোখে দেখে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াটি হচ্ছে কি না তা জানতে।

বাকৃবির সার্জারি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পর অনেক কিছু জানতে পারেন আইনুল। তার সুপারভাইজার অধ্যাপক ড. নাছরীন সুলতানা জুয়েনার তত্ত্বাবধানে গবেষণা কাজ শুরু হয় তার। গবেষণার কাজে তাকে যেতে হতো দেশের বিভিন্ন উপজেলায়। মূলত খামারিদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের জন্য যেতেন তিনি। কিন্তু খামারিদের কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনতে ভালো লাগত না তার। কিভাবে এ সমস্যাটির সমাধান করা যায় সে চিন্তাভাবনা করতেন আইনুল। আর সেগুলো জানাতেন তার সুপারভাইজারকে। সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য তাকেও বিশেষভাবে ধন্যবাদ দেন আইনুল। তিনি বলেন, ম্যামের একান্ত সহযোগিতা না থাকলে এটি করা আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ড. অধ্যাপক ড. নাছরীন সুলতানা জুয়েনা বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগামের (এনএটিপি) দুই নম্বর ধাপের একটি প্রজেক্টের গবেষণার কাজে তাকে মাঠের কিছু তথ্য সংগ্রহের কাজে পাঠাই। প্রজেক্ট থেকে আমরা জানতে পারি, কৃত্রিম প্রজনন সঠিকভাবে না হওয়ায় আমাদের গরুর বাছুর উৎপাদন কম হতো। বর্তমানে এ সমস্যাটি আর নেই। কারণ যন্ত্রটি এআই কর্মীরা ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যাটি চোখে দেখে সঠিকভাবে কৃত্রিম প্রজনন হচ্ছে কিনা, জানতে পারছেন। এমনকি এটি ভেটেরিনারি ডাক্তারাও ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের রোগ নির্ণয় করতে পারবেন। কেবল গরুতেই নয় অনান্য গবাদিপশু থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রাণীতে এটি ব্যবহারে বিভিন্ন রোগ নির্ণয় করা যাবে। আমরা চাই মাঠ পর্যায়ে এটি ছড়িয়ে দিতে। সেটি করতে পারলে প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধি করার মাধ্যমে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।

আইনুল বলেন, কৃত্রিম প্রজননের অন্যতম সমস্যার মধ্যে একটি হলো, জরায়ুর বডিতে সিমেন সঠিকভাবে দিতে না পারা। আমার মনে হয়েছিল যদি জরায়ুর মুখ বাহির থেকে দেখা যেত তাহলে বিষয়টা অনেক সহজ হতো। আমি ইন্টারনেটে সার্চ করে এরকম কোনো যন্ত্র আছে কি না তা খোঁজার চেষ্টা করলাম। অনেক খুঁজার পর পেয়েও গেলাম। কিন্তু তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখলাম। এটির যে দাম তাতে আমাদের দেশে ব্যবহার অনেক ব্যয়বহুল। মনটা খারাপ হয়ে যায় তখনই। মনস্থির করলাম, কিভাবে কম খরচে আমাদের দেশে এটা তৈরি করা যায়। তখন থেকে শুরু করে দেই কাজ।

কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখলাম আমার যা লাগবে কোনোটাই বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। তখন শুরু হলো বিভিন্ন দেশে ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ। কেউ রাজি হয় না আমার কাজটি করে দিতে। আবার একজন ডাক্তার হয়ে আমার পক্ষেও সম্ভব ছিল না ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি তৈরি করা। তারপরও হাল ছাড়লাম না। অবশেষে একটু আশার বাণীর সন্ধান পেলাম। আমার আগ্রহ আর দেশের উপযোগী (কমদাম) করে তোলার প্রচেষ্টা দেখে তারা আমাকে ক্যামেরা তৈরি করে দিতে রাজি হলো। এরপর আর একটি সমস্যা সামনে হাজির হলো। সেটি হলো শুধু ক্যামেরা হলেই তো হবে না। ক্যামেরা বসানোর জন্য আরো কিছু লাগবে, লাগবে দেখার জন্য স্ক্রিন ও সফটওয়্যার। এগুলো তৈরিতে বাধার সম্মুখীন হয়েছি বারবার। অনেকে আমাকে বলতে লাগল, বাদ দাও এসব। এ দেশে এগুলা বানানো সম্ভব না। পাগলামি করছি বলেও ক্ষ্যাপাতো বন্ধুরা। শেষ পর্যন্ত সবই ব্যবস্থা করে ফেললাম। অনেক পরিশ্রমের পর একটা বাস্তব রূপ দিলাম যন্ত্রটির।

আইনুল বলেন, খুব ভয়ে ছিলাম, এত পরিশ্রম, সময় সব বৃথা যায় কিনা। কিন্তু স্রষ্টা আমাকে নিরাশ করলেন না। তৈরি হলো সাশ্রয়ী খরচে ব্যবহার উপযোগী কৃত্রিম প্রজননে ডিজিটাল ডিভাইস, নাম দিলাম 'বাউ এআই ভিশন'। যন্ত্রটি তৈরি করার পর প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গরুর খামারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলাম। তারপর আবার গেলাম ওই খামারিদের কাছে। যন্ত্রটির সুবিধা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি অনেক কম খরচে তৈরি করা যাবে। একটি যন্ত্র তৈরিতে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ পড়বে। একটি যন্ত্রই দিয়েই বড় একটি গ্রামে সব খামারির চাহিদা মেটানো যাবে। এ ছাড়াও জরায়ুর মুখ মোবাইল স্ক্রিনে দেখে নিশ্চিত হয়ে জরায়ুতে সিমেন দেয়া ও অনেক রোগ নির্ণয়ে ব্যবহার করা যাবে।

আমি চাই যন্ত্রটি মাঠ পর্যায়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ুক। যদি এটি করতে পারি, তবে আমার পরিশ্রম সার্থক হবে। এ জন্য সরকারি- বেসরকারি যে কোনো সংস্থা, কোম্পানি এগিয়ে এলে আমি যন্ত্রটি তৈরিতে তাদের সহযোগিতা করতে পারব।

লেখক: কৃষি সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close

উপরে